সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘ডেথ সেলে’ ইমরান খানের নিঃসঙ্গ বন্দিজীবন

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০২:৪১:০৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ নভেম্বর ২০২৫
  • / ১৮৭ Time View

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পিটিআই প্রধান ইমরান খানকে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে একটি বিশেষ ‘ডেথ সেল’-এ সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ অবস্থায় আটক রাখা হয়েছে—এমন গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন তার ছেলে কাসিম খান। তার ভাষ্য, আদালতের স্পষ্ট অনুমতি থাকা সত্ত্বেও কারা প্রশাসন পরিবার কিংবা আইনজীবীদের সঙ্গে ইমরানের যোগাযোগ সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে, এমনকি তিনি জীবিত আছেন—এ বিষয়ে কোনো প্রমাণও পরিবারকে দেওয়া হচ্ছে না।

অন্ধকার, জানালাবিহীন কক্ষে বন্দি জীবন

লন্ডনে বসবাসরত কাসিম খান দ্য টেলিগ্রাফকে বলেন, তার বাবা দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি কক্ষে বন্দি আছেন যেখানে সূর্যালোক ঢোকে না, জানালা নেই, বায়ু চলাচল অত্যন্ত সীমিত। কক্ষে নিরাপত্তা ক্যামেরা থাকলেও সেখানে মৌলিক মানবাধিকার—ফোনকল, সাক্ষাৎ এবং চিকিৎসকের সাক্ষাৎ—সবই বন্ধ।

কাসিমের ভাষায়,
“দিনে ২২ ঘণ্টা তাকে একটি ডেথ সেলে রাখা হয়। ছয় মাস ধরে পরিবারের সঙ্গে কোনো ফোনকল নেই, কোনো সাক্ষাৎ নেই, চিকিৎসকদের চিকিৎসা সেবাও বন্ধ। এটি সরাসরি মানসিক নির্যাতন। বাবার মনোবল ভাঙার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে।”

পরিবার পিটিআই নেতাদের অবস্থান কর্মসূচি

ইমরান খানের তিন বোন—নুরিন খান, আলীমা খান এবং উজমা খান—এবং পিটিআই নেতৃবৃন্দ কারাগারের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন। তাদের দাবি,

  • ইমরান খানের সুস্থতার প্রমাণ প্রকাশ করতে হবে
  • পরিবারকে সাক্ষাতের অনুমতি দিতে হবে
  • আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন করতে হবে

এ বিষয়ে কারা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার আবেদনও আদালতে দাখিল হয়েছে। পরিবারের দাবি—বারবার আবেদন করা হলেও ইচ্ছাকৃত গড়িমসি করে সেগুলো প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে।

কারাগারের সামনে অবস্থান করতে গেলে পুলিশের সঙ্গে ইমরানের বোনদের ধাক্কাধাক্কির ঘটনাও ঘটে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ইমরান খানের মৃত্যুর গুজব সরকারের প্রতিক্রিয়া

গত সপ্তাহে পাকিস্তানে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, হেফাজতে থাকা অবস্থায় ইমরান খান মারা গেছেন। বিষয়টি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরে পাকিস্তান সরকার এবং পিটিআই—উভয়েই গুজবটি অস্বীকার করে।

কাসিম অবশ্য সতর্ক করে দিয়ে বলেন,
“আমার বাবার নিরাপত্তার পূর্ণ দায়িত্ব পাকিস্তান সরকারের। তাকে যে অমানবিকভাবে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে—এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।”

দুর্নীতি মামলায় ১৪ বছরের দণ্ড, অভিযোগ অস্বীকার

ইমরান খান বর্তমানে ১৪ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। অভিযোগ—তিনি এবং তার স্ত্রী বুশরা বিবি ক্ষমতায় থাকতে আল-কাদির ট্রাস্টের নামে এক রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ঘুষ হিসেবে জমি নিয়েছিলেন।

তবে ইমরান খান এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক প্রতিশোধ বলে দাবি করছেন। কাসিমের ভাষায়,
“যদি দুর্নীতির হিসাব করা হয়, তবে পাকিস্তানের বহু রাজনীতিবিদই জেলে থাকার কথা। কিন্তু বাবাকে টার্গেট করা হয়েছে কারণ তিনি পরিবর্তনের প্রতীক ছিলেন, সামরিক প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা করেছেন এবং লক্ষ মানুষের আশা হয়ে উঠেছিলেন।”

জাতিসংঘের উদ্বেগ এবং আন্তর্জাতিক চাপ

২০২৪ সালের মার্চে জাতিসংঘের ইচ্ছাকৃত আটকবিরোধী কার্যদল (UNWGAD) ইমরান খানের আটককে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও আইনি ভিত্তিহীন’ বলে উল্লেখ করে।

ইমরানের ছেলে কাসিম জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী বিশেষ প্রতিবেদক ড. অ্যালিস এডওয়ার্ডসের কাছে আবেদন জানিয়েছেন, যাতে ইমরান খানের ওপর চলমান ‘অমানবিক ও নিষ্ঠুর আচরণ’ বন্ধে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করা হয়।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

‘ডেথ সেলে’ ইমরান খানের নিঃসঙ্গ বন্দিজীবন

Update Time : ০২:৪১:০৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ নভেম্বর ২০২৫

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পিটিআই প্রধান ইমরান খানকে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে একটি বিশেষ ‘ডেথ সেল’-এ সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ অবস্থায় আটক রাখা হয়েছে—এমন গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন তার ছেলে কাসিম খান। তার ভাষ্য, আদালতের স্পষ্ট অনুমতি থাকা সত্ত্বেও কারা প্রশাসন পরিবার কিংবা আইনজীবীদের সঙ্গে ইমরানের যোগাযোগ সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে, এমনকি তিনি জীবিত আছেন—এ বিষয়ে কোনো প্রমাণও পরিবারকে দেওয়া হচ্ছে না।

অন্ধকার, জানালাবিহীন কক্ষে বন্দি জীবন

লন্ডনে বসবাসরত কাসিম খান দ্য টেলিগ্রাফকে বলেন, তার বাবা দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি কক্ষে বন্দি আছেন যেখানে সূর্যালোক ঢোকে না, জানালা নেই, বায়ু চলাচল অত্যন্ত সীমিত। কক্ষে নিরাপত্তা ক্যামেরা থাকলেও সেখানে মৌলিক মানবাধিকার—ফোনকল, সাক্ষাৎ এবং চিকিৎসকের সাক্ষাৎ—সবই বন্ধ।

কাসিমের ভাষায়,
“দিনে ২২ ঘণ্টা তাকে একটি ডেথ সেলে রাখা হয়। ছয় মাস ধরে পরিবারের সঙ্গে কোনো ফোনকল নেই, কোনো সাক্ষাৎ নেই, চিকিৎসকদের চিকিৎসা সেবাও বন্ধ। এটি সরাসরি মানসিক নির্যাতন। বাবার মনোবল ভাঙার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে।”

পরিবার পিটিআই নেতাদের অবস্থান কর্মসূচি

ইমরান খানের তিন বোন—নুরিন খান, আলীমা খান এবং উজমা খান—এবং পিটিআই নেতৃবৃন্দ কারাগারের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন। তাদের দাবি,

  • ইমরান খানের সুস্থতার প্রমাণ প্রকাশ করতে হবে
  • পরিবারকে সাক্ষাতের অনুমতি দিতে হবে
  • আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন করতে হবে

এ বিষয়ে কারা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার আবেদনও আদালতে দাখিল হয়েছে। পরিবারের দাবি—বারবার আবেদন করা হলেও ইচ্ছাকৃত গড়িমসি করে সেগুলো প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে।

কারাগারের সামনে অবস্থান করতে গেলে পুলিশের সঙ্গে ইমরানের বোনদের ধাক্কাধাক্কির ঘটনাও ঘটে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ইমরান খানের মৃত্যুর গুজব সরকারের প্রতিক্রিয়া

গত সপ্তাহে পাকিস্তানে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, হেফাজতে থাকা অবস্থায় ইমরান খান মারা গেছেন। বিষয়টি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরে পাকিস্তান সরকার এবং পিটিআই—উভয়েই গুজবটি অস্বীকার করে।

কাসিম অবশ্য সতর্ক করে দিয়ে বলেন,
“আমার বাবার নিরাপত্তার পূর্ণ দায়িত্ব পাকিস্তান সরকারের। তাকে যে অমানবিকভাবে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে—এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।”

দুর্নীতি মামলায় ১৪ বছরের দণ্ড, অভিযোগ অস্বীকার

ইমরান খান বর্তমানে ১৪ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। অভিযোগ—তিনি এবং তার স্ত্রী বুশরা বিবি ক্ষমতায় থাকতে আল-কাদির ট্রাস্টের নামে এক রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ঘুষ হিসেবে জমি নিয়েছিলেন।

তবে ইমরান খান এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক প্রতিশোধ বলে দাবি করছেন। কাসিমের ভাষায়,
“যদি দুর্নীতির হিসাব করা হয়, তবে পাকিস্তানের বহু রাজনীতিবিদই জেলে থাকার কথা। কিন্তু বাবাকে টার্গেট করা হয়েছে কারণ তিনি পরিবর্তনের প্রতীক ছিলেন, সামরিক প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা করেছেন এবং লক্ষ মানুষের আশা হয়ে উঠেছিলেন।”

জাতিসংঘের উদ্বেগ এবং আন্তর্জাতিক চাপ

২০২৪ সালের মার্চে জাতিসংঘের ইচ্ছাকৃত আটকবিরোধী কার্যদল (UNWGAD) ইমরান খানের আটককে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও আইনি ভিত্তিহীন’ বলে উল্লেখ করে।

ইমরানের ছেলে কাসিম জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী বিশেষ প্রতিবেদক ড. অ্যালিস এডওয়ার্ডসের কাছে আবেদন জানিয়েছেন, যাতে ইমরান খানের ওপর চলমান ‘অমানবিক ও নিষ্ঠুর আচরণ’ বন্ধে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করা হয়।