সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

না খেয়ে মরবে ভারতের পেঁয়াজ চাষীরা: বাংলাদেশের পর সৌদিও মুখ ফিরিয়ে নিলো!

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০২:৩৭:২২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২৫
  • / ২০৭ Time View

 

এক মাসেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম আকাশছোঁয়া। প্রতিদিন বাজারে গিয়ে সাধারণ মানুষ ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ওপর এই মূল্যবৃদ্ধি যেন গলার কাঁটা। অনেকেই সরকারের নীতি, বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও আমদানি সিদ্ধান্তকে দায়ী করছেন।

অন্যদিকে আশ্চর্যজনকভাবে ভারতের বাজারে পেঁয়াজের দাম পড়েছে একেবারে তলানিতে। সেখানে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা সরকারের বিরুদ্ধেই ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। কারণ, বাংলাদেশ—যে দেশটিকে ভারতের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার বলা হতো—এবার আমদানি বন্ধ রেখেছে। শুধু বাংলাদেশই নয়, সৌদি আরবও এবার ভারতীয় পেঁয়াজের দিকে পিঠ ফিরিয়ে নিয়েছে। ফলে বিপুল পেঁয়াজ মজুত থাকায় ভারতীয় কৃষকদের নেমে এসেছে অভূতপূর্ব বিপর্যয়।

বাংলাদেশে পেঁয়াজে আগুন—তিন সপ্তাহ ধরে স্থির অস্বাভাবিক দাম

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, খুচরা বাজারে গত তিন সপ্তাহ ধরে পেঁয়াজের দাম লেগেই আছে ১০০–১২০ টাকার মধ্যে।

মূল্য অবস্থান:

  • ছোট পেঁয়াজ: ১০০ টাকা/কেজি
  • মাঝারি পেঁয়াজ: ১১০ টাকা/কেজি
  • বড় পেঁয়াজ: ১২০ টাকা/কেজি

রান্নার অন্যতম প্রধান উপকরণ হওয়ায় এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি মানুষকে রীতিমতো নাজেহাল করে তুলেছে।
মুগদা বাজারে পেঁয়াজ কিনতে গিয়ে গৃহকর্মী রাবেকা খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন—
যারা সরকারে আসে, তারা গরিবের কষ্ট বোঝে না। বাজারে ঢুকলেই মনে হয় পেটের ওপর লাথি মারে দাম।”

ভারতে পেঁয়াজের দাম তলানিতে—২৫ থেকে ৩০ টাকা কেজি

ভারতীয় বাজারে পেঁয়াজ এখন অতি সস্তা—বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় চার গুণ কম দাম
কিন্তু কেন?

  • বাংলাদেশ আমদানি বন্ধ রেখেছে
  • সৌদিও মুখ ফিরিয়েছে
  • অন্য রাষ্ট্রগুলো বিকল্প উৎস বেছে নিয়েছে
  • ফলে ভারতীয় বাজারে সরবরাহ বেড়েছে বহুগুণ
  • দাম নেমেছে রেকর্ড কমে

ভারতের কৃষকদের অভিযোগ—সরকারের ভুল নীতিতে তারা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। হাজার হাজার টন পেঁয়াজ খেতে রয়েছে, কিন্তু ক্রেতা নেই।

কঠিন পরিসংখ্যান:

  • ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ভারত বাংলাদেশে রপ্তানি করেছিল ৭.২৪ লাখ টন
  • যা ভারতের মোট পেঁয়াজ রপ্তানির ৪২%
  • ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশ কিনেছে মাত্র ১২,৯০০ টন → রপ্তানি প্রায় বন্ধ

ভারতীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন—
বাংলাদেশ নেই, সৌদি নেই—এবার আমাদের পেঁয়াজ খেতেই পচবে!”

বাংলাদেশ আমদানি বন্ধ রেখেছে কেন?

সরকার বলছে—
“দেশে পেঁয়াজের সংকট নেই। কৃষকদের স্বার্থে আমদানি বন্ধ রাখতেই হয়েছে।”

কৃষি উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানালেন—

  • কিছু আমদানিকারী আমদানির অনুমতির জন্য চাপ প্রয়োগ করেছে
  • এমনকি আদালতে গিয়েও চাপ সৃষ্টি করেছে
  • তবু কৃষকের স্বার্থে সরকার আমদানির অনুমোদন দেয়নি

তিনি আরও জানান—
নতুন গ্রীষ্মকালীন জাতের পেঁয়াজ বাজারে আসছে, মুড়িকাটাও এসেছে। তাই দাম বাড়ার কারণ নেই।”

তাহলে বাংলাদেশে দাম বাড়ছে কেন? বিশ্লেষকদের মতামত

বিশ্লেষকদের মতে, দাম বাড়ার মূল কারণগুলো:

১. মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেট

উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত একাধিক ধাপ—প্রতিটি ধাপে অযৌক্তিক লাভ তুলে নিচ্ছেন মজুতদাররা।

২. পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধার অভাব

পেঁয়াজ সংরক্ষণ না থাকায় একসময় বাজারে সংকট তৈরি হয়।

৩. মৌসুম শুরুর আগের চাপ

অক্টোবর–ডিসেম্বর সময়টায় পেঁয়াজের দাম বাড়ার প্রবণতা আজীবনই আছে।

৪. বৃষ্টি প্রাকৃতিক ক্ষতি

বৃষ্টিতে একাংশ নষ্ট হয়েছে, ফলে সরবরাহ কমেছে।

৫. আমদানি বন্ধ

এ বছর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে।

ভারতের বিপর্যয়—বাংলাদেশের অস্থিরতা

এখন একটি বাস্তবতা স্পষ্ট:

  • বাংলাদেশ আমদানি বন্ধ রাখায় ভারতীয় পেঁয়াজের দাম পড়ছে
  • কিন্তু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজার সিন্ডিকেটের কারণে স্থিতিশীল হচ্ছে না

বিশেষজ্ঞদের মতে—
যদি সরকার বছরের শেষ দিকের মৌসুমি সংকট মোকাবিলায় স্থায়ী সমাধান না নেয়, পেঁয়াজের অস্থিরতা প্রতিবছরই ফিরে আসবে।”

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

না খেয়ে মরবে ভারতের পেঁয়াজ চাষীরা: বাংলাদেশের পর সৌদিও মুখ ফিরিয়ে নিলো!

Update Time : ০২:৩৭:২২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২৫

 

এক মাসেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম আকাশছোঁয়া। প্রতিদিন বাজারে গিয়ে সাধারণ মানুষ ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ওপর এই মূল্যবৃদ্ধি যেন গলার কাঁটা। অনেকেই সরকারের নীতি, বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও আমদানি সিদ্ধান্তকে দায়ী করছেন।

অন্যদিকে আশ্চর্যজনকভাবে ভারতের বাজারে পেঁয়াজের দাম পড়েছে একেবারে তলানিতে। সেখানে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা সরকারের বিরুদ্ধেই ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। কারণ, বাংলাদেশ—যে দেশটিকে ভারতের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার বলা হতো—এবার আমদানি বন্ধ রেখেছে। শুধু বাংলাদেশই নয়, সৌদি আরবও এবার ভারতীয় পেঁয়াজের দিকে পিঠ ফিরিয়ে নিয়েছে। ফলে বিপুল পেঁয়াজ মজুত থাকায় ভারতীয় কৃষকদের নেমে এসেছে অভূতপূর্ব বিপর্যয়।

বাংলাদেশে পেঁয়াজে আগুন—তিন সপ্তাহ ধরে স্থির অস্বাভাবিক দাম

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, খুচরা বাজারে গত তিন সপ্তাহ ধরে পেঁয়াজের দাম লেগেই আছে ১০০–১২০ টাকার মধ্যে।

মূল্য অবস্থান:

  • ছোট পেঁয়াজ: ১০০ টাকা/কেজি
  • মাঝারি পেঁয়াজ: ১১০ টাকা/কেজি
  • বড় পেঁয়াজ: ১২০ টাকা/কেজি

রান্নার অন্যতম প্রধান উপকরণ হওয়ায় এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি মানুষকে রীতিমতো নাজেহাল করে তুলেছে।
মুগদা বাজারে পেঁয়াজ কিনতে গিয়ে গৃহকর্মী রাবেকা খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন—
যারা সরকারে আসে, তারা গরিবের কষ্ট বোঝে না। বাজারে ঢুকলেই মনে হয় পেটের ওপর লাথি মারে দাম।”

ভারতে পেঁয়াজের দাম তলানিতে—২৫ থেকে ৩০ টাকা কেজি

ভারতীয় বাজারে পেঁয়াজ এখন অতি সস্তা—বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় চার গুণ কম দাম
কিন্তু কেন?

  • বাংলাদেশ আমদানি বন্ধ রেখেছে
  • সৌদিও মুখ ফিরিয়েছে
  • অন্য রাষ্ট্রগুলো বিকল্প উৎস বেছে নিয়েছে
  • ফলে ভারতীয় বাজারে সরবরাহ বেড়েছে বহুগুণ
  • দাম নেমেছে রেকর্ড কমে

ভারতের কৃষকদের অভিযোগ—সরকারের ভুল নীতিতে তারা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। হাজার হাজার টন পেঁয়াজ খেতে রয়েছে, কিন্তু ক্রেতা নেই।

কঠিন পরিসংখ্যান:

  • ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ভারত বাংলাদেশে রপ্তানি করেছিল ৭.২৪ লাখ টন
  • যা ভারতের মোট পেঁয়াজ রপ্তানির ৪২%
  • ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশ কিনেছে মাত্র ১২,৯০০ টন → রপ্তানি প্রায় বন্ধ

ভারতীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন—
বাংলাদেশ নেই, সৌদি নেই—এবার আমাদের পেঁয়াজ খেতেই পচবে!”

বাংলাদেশ আমদানি বন্ধ রেখেছে কেন?

সরকার বলছে—
“দেশে পেঁয়াজের সংকট নেই। কৃষকদের স্বার্থে আমদানি বন্ধ রাখতেই হয়েছে।”

কৃষি উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানালেন—

  • কিছু আমদানিকারী আমদানির অনুমতির জন্য চাপ প্রয়োগ করেছে
  • এমনকি আদালতে গিয়েও চাপ সৃষ্টি করেছে
  • তবু কৃষকের স্বার্থে সরকার আমদানির অনুমোদন দেয়নি

তিনি আরও জানান—
নতুন গ্রীষ্মকালীন জাতের পেঁয়াজ বাজারে আসছে, মুড়িকাটাও এসেছে। তাই দাম বাড়ার কারণ নেই।”

তাহলে বাংলাদেশে দাম বাড়ছে কেন? বিশ্লেষকদের মতামত

বিশ্লেষকদের মতে, দাম বাড়ার মূল কারণগুলো:

১. মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেট

উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত একাধিক ধাপ—প্রতিটি ধাপে অযৌক্তিক লাভ তুলে নিচ্ছেন মজুতদাররা।

২. পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধার অভাব

পেঁয়াজ সংরক্ষণ না থাকায় একসময় বাজারে সংকট তৈরি হয়।

৩. মৌসুম শুরুর আগের চাপ

অক্টোবর–ডিসেম্বর সময়টায় পেঁয়াজের দাম বাড়ার প্রবণতা আজীবনই আছে।

৪. বৃষ্টি প্রাকৃতিক ক্ষতি

বৃষ্টিতে একাংশ নষ্ট হয়েছে, ফলে সরবরাহ কমেছে।

৫. আমদানি বন্ধ

এ বছর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে।

ভারতের বিপর্যয়—বাংলাদেশের অস্থিরতা

এখন একটি বাস্তবতা স্পষ্ট:

  • বাংলাদেশ আমদানি বন্ধ রাখায় ভারতীয় পেঁয়াজের দাম পড়ছে
  • কিন্তু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজার সিন্ডিকেটের কারণে স্থিতিশীল হচ্ছে না

বিশেষজ্ঞদের মতে—
যদি সরকার বছরের শেষ দিকের মৌসুমি সংকট মোকাবিলায় স্থায়ী সমাধান না নেয়, পেঁয়াজের অস্থিরতা প্রতিবছরই ফিরে আসবে।”