সময়: সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬, ৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কিডনি রোগে বাড়ছে মৃত্যু: বিশ্বে নবম ঘাতক এই রোগের উপেক্ষিত প্রাথমিক লক্ষণগুলো যা কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১০:৫০:১২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২২ নভেম্বর ২০২৫
  • / ৩২০ Time View

 

বিশ্বজুড়ে নীরবে কিন্তু দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে কিডনি রোগ। বহু বছর ধরেই চিকিৎসকরা সতর্ক করছিলেন—কিডনি বিকলতার এই ধীর আগ্রাসন একদিন বৈশ্বিক স্বাস্থ্যনীতিকে নাড়িয়ে দেবে। সেই আশঙ্কাই সত্যি করে তুলেছে সাম্প্রতিক বৈশ্বিক গবেষণা। ল্যানসেটে প্রকাশিত ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন (IHME)–এর সর্বশেষ বিশ্লেষণ জানাচ্ছে, ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (সিকেডি) এখন বিশ্বের নবম শীর্ষ ঘাতক। শুধু ২০২৩ সালেই ১.মিলিয়ন বা প্রায় ১৫ লাখ মানুষ এই এক রোগেই প্রাণ হারিয়েছেন।

সংখ্যাটি শুধু উদ্বেগজনকই নয়, বরং প্রমাণ করে কিডনি রোগ আর কোনো নিরবচ্ছিন্ন ‘লাইফস্টাইল ডিজিজ’ নয়—এটি এক নীরব বৈশ্বিক মহামারি।

বিশ্বের ৮০০ মিলিয়ন মানুষ ভুগছেন সিকেডিতে

গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ (GBD) স্টাডি ২০২৩-এর তথ্য বলছে—

  • ২০ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রায় ৭৮৮ মিলিয়ন মানুষ বর্তমানে সিকেডিতে ভুগছেন।
  • ১৯৯০ সালে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ছিল ৩৭৮ মিলিয়ন—অর্থাৎ তিন দশকে রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি
  • বিশ্বব্যাপী মোট প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ১৪.শতাংশ কোনো না কোনো মাত্রার কিডনি বিকলতায় আক্রান্ত।
  • সবচেয়ে বেশি প্রাদুর্ভাব উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য দক্ষিণ এশিয়ায়
  • সংখ্যার দিক থেকে শীর্ষে চীন (১৫২ মিলিয়ন) এবং ভারত (১৩৮ মিলিয়ন)।

এ থেকে বোঝা যায়—ধনী-গরিব সব দেশেই কিডনি রোগ সমানভাবে বাড়ছে। এটি শুধু চিকিৎসার ব্যয় বাড়াচ্ছে না, বরং কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমিয়ে অর্থনীতিকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

হৃদ্‌রোগ মৃত্যুর ১১.শতাংশের পেছনে কিডনির ভূমিকা

কিডনি রোগ শুধু কিডনিকে নয়, সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করে শরীরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকেও।
গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো—

  • বিশ্বে হৃদ্‌রোগজনিত মোট মৃত্যুর অন্তত ১১.শতাংশের কারণ হলো কিডনি কর্মহীনতা।

যখন কিডনি যথাযথভাবে রক্ত ছাঁকতে পারে না, তখন—

  • বিষাক্ত বর্জ্য রক্তে জমতে থাকে,
  • রক্তচাপ বেড়ে যায়,
  • শরীরে পানি জমে যায়,
  • হৃদ্‌যন্ত্র অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়ে,

ফলে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, এমনকি হৃদ্‌যন্ত্রের ব্যর্থতা পর্যন্ত ঘটতে পারে। তাই কিডনি রোগকে কখনোই ‘শুধু কিডনির রোগ’ হিসেবে ভাবা ভুল।

কেন বাড়ছে কিডনি রোগ? বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা

বিশেষজ্ঞরা তিনটি মূল কারণে বিশ্বব্যাপী সিকেডির দ্রুত বিস্তার দেখছেন—

১. ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ অতিরিক্ত ওজন

এই তিনটি মেটাবলিক রোগ দীর্ঘ সময় ধরে কিডনির ক্ষতি করে।
বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় ডায়াবেটিসের ব্যাপক বিস্তার কিডনি রোগ বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় কারণ।

২. আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিডনির কার্যক্ষমতা কমে আসে। বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সমান্তরালে বাড়ছে কিডনি রোগীর সংখ্যাও।

৩. স্বাস্থ্যসেবার অসম প্রাপ্যতা

অনেক দেশে এখনো—

  • নিয়মিত কিডনি চেকআপ,
  • প্রস্রাবের পরীক্ষা,
  • জিএফআর টেস্ট

এসব সুবিধা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। ফলে রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তই হয় না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বলছে—সময়ে চিকিৎসা নিয়মিত পরীক্ষা করলে সিকেডির বড় অংশই প্রতিরোধযোগ্য।

সতর্ক হওয়ার কারণ

কিডনি শরীরের—

  • বর্জ্য ছেঁকে বের করে,
  • জলীয় ভারসাম্য রক্ষা করে,
  • রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে,
  • রক্ত তৈরিতে সহায়তা করে,
  • হাড়ের স্বাস্থ্যে ভূমিকা রাখে।

কিন্তু সবচেয়ে বড় বিপদ হলো—কিডনি রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায়ই কোনো লক্ষণ থাকে না
এই নীরবতা রোগটিকে আরও ভয়ানক করে তোলে। অনেকেই যখন লক্ষণ অনুভব করেন, তখন কিডনির অর্ধেকেরও বেশি ক্ষতি হয়ে যায়।

যেসব প্রাথমিক লক্ষণ কখনোই উপেক্ষা করা যাবে না

১. প্রস্রাবের পরিবর্তন

  • প্রস্রাবের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া
  • রাতে বারবার প্রস্রাবের চাপ
  • ফেনাযুক্ত প্রস্রাব
  • লালচে বা রক্তমিশ্রিত প্রস্রাব
    এগুলো কিডনি ক্ষতির প্রাথমিক ও গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত।

২. শরীরের বিভিন্ন স্থানে ফোলা

বিশেষ করে—

  • পা,
  • পায়ের পাতা,
  • চোখের নিচে,
  • হাত

পানি জমার কারণে এসব স্থানে ফোলা দেখা দিলে তা প্রায়ই কিডনি সমস্যার ইঙ্গিত দেয়।

৩. অতিরিক্ত ক্লান্তি মাথা ঝিমঝিম ভাব

কিডনি ঠিকমতো কাজ না করলে শরীরে টক্সিন জমে গিয়ে শক্তি কমে যায়।

  1. ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া, অস্বাভাবিক চুলকানি

রক্তে বর্জ্য জমার কারণে এসব উপসর্গ ঘটে।

৫. বমিভাব, ক্ষুধামন্দা, খাদ্যে অনীহা

এগুলোও কিডনির কার্যক্ষমতা কমার লক্ষণ হতে পারে।

৬. শ্বাস নিতে অসুবিধা, বুকে চাপ অনুভব করা

এগুলো রোগের আরও অগ্রসর পর্যায়ের সংকেত এবং দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।

গুরুত্বপূর্ণ:
এই লক্ষণগুলোকে যেকোনোভাবেই ‘শ্রমের ক্লান্তি’ বা ‘বয়সের প্রভাব’ হিসেবে অবহেলা করা যাবে না।

কী করবেন? প্রতিরোধই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন—এখনই সচেতন না হলে আগামী দশ বছরে সিকেডির ঝুঁকি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।

১. নিয়মিত পরীক্ষা

  • জিএফআর (Estimated GFR)
  • ইউরিন অ্যালবুমিন টেস্ট
  • সিরাম ক্রিয়েটিনিন

প্রতি বছর অন্তত একবার করানো উচিত, বিশেষ করে যদি—

  • আপনার ডায়াবেটিস থাকে,
  • উচ্চ রক্তচাপ থাকে,
  • বয়স ৪০-এর উপরে হয়,
  • পরিবারের কারো কিডনি রোগ থাকে।

২. ডায়াবেটিস উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ

দুই রোগই কিডনিকে সবচেয়ে দ্রুত নষ্ট করে।

৩. ওজন নিয়ন্ত্রণ নিয়মিত ব্যায়াম

স্থূলতার সঙ্গে কিডনি বিকলতার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

৪. লবণ কম খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান

অতিরিক্ত লবণ রক্তচাপ বাড়ায় এবং কিডনির ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

৫. অ্যান্টিবায়োটিক বা ব্যথানাশক ওষুধের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বন্ধ

অনেক ব্যথানাশক কিডনি নষ্ট করে—ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া এ ধরনের ওষুধ কখনোই নেওয়া উচিত নয়।

বিশ্বজুড়ে দ্রুত বাড়তে থাকা কিডনি রোগ এখন স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে বড় নীরব হুমকির একটি। সংখ্যার পরিসংখ্যান দেখলে স্পষ্ট—এ রোগ কাউকে ছাড় দিচ্ছে না। কিন্তু সুখবর হলো—প্রাথমিক লক্ষণগুলো চিহ্নিত করতে পারলে এবং নিয়মিত পরীক্ষা করা হলে কিডনি রোগকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

এখন সময়—

  • সচেতন হওয়া,
  • নিয়মিত স্ক্রিনিং করা,
  • স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন নিশ্চিত করা।

কিডনি রোগ নীরব, কিন্তু এর প্রতিরোধ সম্পূর্ণই আপনার হাতে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

কিডনি রোগে বাড়ছে মৃত্যু: বিশ্বে নবম ঘাতক এই রোগের উপেক্ষিত প্রাথমিক লক্ষণগুলো যা কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়

Update Time : ১০:৫০:১২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২২ নভেম্বর ২০২৫

 

বিশ্বজুড়ে নীরবে কিন্তু দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে কিডনি রোগ। বহু বছর ধরেই চিকিৎসকরা সতর্ক করছিলেন—কিডনি বিকলতার এই ধীর আগ্রাসন একদিন বৈশ্বিক স্বাস্থ্যনীতিকে নাড়িয়ে দেবে। সেই আশঙ্কাই সত্যি করে তুলেছে সাম্প্রতিক বৈশ্বিক গবেষণা। ল্যানসেটে প্রকাশিত ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন (IHME)–এর সর্বশেষ বিশ্লেষণ জানাচ্ছে, ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (সিকেডি) এখন বিশ্বের নবম শীর্ষ ঘাতক। শুধু ২০২৩ সালেই ১.মিলিয়ন বা প্রায় ১৫ লাখ মানুষ এই এক রোগেই প্রাণ হারিয়েছেন।

সংখ্যাটি শুধু উদ্বেগজনকই নয়, বরং প্রমাণ করে কিডনি রোগ আর কোনো নিরবচ্ছিন্ন ‘লাইফস্টাইল ডিজিজ’ নয়—এটি এক নীরব বৈশ্বিক মহামারি।

বিশ্বের ৮০০ মিলিয়ন মানুষ ভুগছেন সিকেডিতে

গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ (GBD) স্টাডি ২০২৩-এর তথ্য বলছে—

  • ২০ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রায় ৭৮৮ মিলিয়ন মানুষ বর্তমানে সিকেডিতে ভুগছেন।
  • ১৯৯০ সালে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ছিল ৩৭৮ মিলিয়ন—অর্থাৎ তিন দশকে রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি
  • বিশ্বব্যাপী মোট প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ১৪.শতাংশ কোনো না কোনো মাত্রার কিডনি বিকলতায় আক্রান্ত।
  • সবচেয়ে বেশি প্রাদুর্ভাব উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য দক্ষিণ এশিয়ায়
  • সংখ্যার দিক থেকে শীর্ষে চীন (১৫২ মিলিয়ন) এবং ভারত (১৩৮ মিলিয়ন)।

এ থেকে বোঝা যায়—ধনী-গরিব সব দেশেই কিডনি রোগ সমানভাবে বাড়ছে। এটি শুধু চিকিৎসার ব্যয় বাড়াচ্ছে না, বরং কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমিয়ে অর্থনীতিকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

হৃদ্‌রোগ মৃত্যুর ১১.শতাংশের পেছনে কিডনির ভূমিকা

কিডনি রোগ শুধু কিডনিকে নয়, সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করে শরীরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকেও।
গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো—

  • বিশ্বে হৃদ্‌রোগজনিত মোট মৃত্যুর অন্তত ১১.শতাংশের কারণ হলো কিডনি কর্মহীনতা।

যখন কিডনি যথাযথভাবে রক্ত ছাঁকতে পারে না, তখন—

  • বিষাক্ত বর্জ্য রক্তে জমতে থাকে,
  • রক্তচাপ বেড়ে যায়,
  • শরীরে পানি জমে যায়,
  • হৃদ্‌যন্ত্র অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়ে,

ফলে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, এমনকি হৃদ্‌যন্ত্রের ব্যর্থতা পর্যন্ত ঘটতে পারে। তাই কিডনি রোগকে কখনোই ‘শুধু কিডনির রোগ’ হিসেবে ভাবা ভুল।

কেন বাড়ছে কিডনি রোগ? বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা

বিশেষজ্ঞরা তিনটি মূল কারণে বিশ্বব্যাপী সিকেডির দ্রুত বিস্তার দেখছেন—

১. ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ অতিরিক্ত ওজন

এই তিনটি মেটাবলিক রোগ দীর্ঘ সময় ধরে কিডনির ক্ষতি করে।
বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় ডায়াবেটিসের ব্যাপক বিস্তার কিডনি রোগ বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় কারণ।

২. আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিডনির কার্যক্ষমতা কমে আসে। বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সমান্তরালে বাড়ছে কিডনি রোগীর সংখ্যাও।

৩. স্বাস্থ্যসেবার অসম প্রাপ্যতা

অনেক দেশে এখনো—

  • নিয়মিত কিডনি চেকআপ,
  • প্রস্রাবের পরীক্ষা,
  • জিএফআর টেস্ট

এসব সুবিধা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। ফলে রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তই হয় না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বলছে—সময়ে চিকিৎসা নিয়মিত পরীক্ষা করলে সিকেডির বড় অংশই প্রতিরোধযোগ্য।

সতর্ক হওয়ার কারণ

কিডনি শরীরের—

  • বর্জ্য ছেঁকে বের করে,
  • জলীয় ভারসাম্য রক্ষা করে,
  • রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে,
  • রক্ত তৈরিতে সহায়তা করে,
  • হাড়ের স্বাস্থ্যে ভূমিকা রাখে।

কিন্তু সবচেয়ে বড় বিপদ হলো—কিডনি রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায়ই কোনো লক্ষণ থাকে না
এই নীরবতা রোগটিকে আরও ভয়ানক করে তোলে। অনেকেই যখন লক্ষণ অনুভব করেন, তখন কিডনির অর্ধেকেরও বেশি ক্ষতি হয়ে যায়।

যেসব প্রাথমিক লক্ষণ কখনোই উপেক্ষা করা যাবে না

১. প্রস্রাবের পরিবর্তন

  • প্রস্রাবের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া
  • রাতে বারবার প্রস্রাবের চাপ
  • ফেনাযুক্ত প্রস্রাব
  • লালচে বা রক্তমিশ্রিত প্রস্রাব
    এগুলো কিডনি ক্ষতির প্রাথমিক ও গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত।

২. শরীরের বিভিন্ন স্থানে ফোলা

বিশেষ করে—

  • পা,
  • পায়ের পাতা,
  • চোখের নিচে,
  • হাত

পানি জমার কারণে এসব স্থানে ফোলা দেখা দিলে তা প্রায়ই কিডনি সমস্যার ইঙ্গিত দেয়।

৩. অতিরিক্ত ক্লান্তি মাথা ঝিমঝিম ভাব

কিডনি ঠিকমতো কাজ না করলে শরীরে টক্সিন জমে গিয়ে শক্তি কমে যায়।

  1. ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া, অস্বাভাবিক চুলকানি

রক্তে বর্জ্য জমার কারণে এসব উপসর্গ ঘটে।

৫. বমিভাব, ক্ষুধামন্দা, খাদ্যে অনীহা

এগুলোও কিডনির কার্যক্ষমতা কমার লক্ষণ হতে পারে।

৬. শ্বাস নিতে অসুবিধা, বুকে চাপ অনুভব করা

এগুলো রোগের আরও অগ্রসর পর্যায়ের সংকেত এবং দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।

গুরুত্বপূর্ণ:
এই লক্ষণগুলোকে যেকোনোভাবেই ‘শ্রমের ক্লান্তি’ বা ‘বয়সের প্রভাব’ হিসেবে অবহেলা করা যাবে না।

কী করবেন? প্রতিরোধই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন—এখনই সচেতন না হলে আগামী দশ বছরে সিকেডির ঝুঁকি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।

১. নিয়মিত পরীক্ষা

  • জিএফআর (Estimated GFR)
  • ইউরিন অ্যালবুমিন টেস্ট
  • সিরাম ক্রিয়েটিনিন

প্রতি বছর অন্তত একবার করানো উচিত, বিশেষ করে যদি—

  • আপনার ডায়াবেটিস থাকে,
  • উচ্চ রক্তচাপ থাকে,
  • বয়স ৪০-এর উপরে হয়,
  • পরিবারের কারো কিডনি রোগ থাকে।

২. ডায়াবেটিস উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ

দুই রোগই কিডনিকে সবচেয়ে দ্রুত নষ্ট করে।

৩. ওজন নিয়ন্ত্রণ নিয়মিত ব্যায়াম

স্থূলতার সঙ্গে কিডনি বিকলতার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

৪. লবণ কম খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান

অতিরিক্ত লবণ রক্তচাপ বাড়ায় এবং কিডনির ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

৫. অ্যান্টিবায়োটিক বা ব্যথানাশক ওষুধের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বন্ধ

অনেক ব্যথানাশক কিডনি নষ্ট করে—ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া এ ধরনের ওষুধ কখনোই নেওয়া উচিত নয়।

বিশ্বজুড়ে দ্রুত বাড়তে থাকা কিডনি রোগ এখন স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে বড় নীরব হুমকির একটি। সংখ্যার পরিসংখ্যান দেখলে স্পষ্ট—এ রোগ কাউকে ছাড় দিচ্ছে না। কিন্তু সুখবর হলো—প্রাথমিক লক্ষণগুলো চিহ্নিত করতে পারলে এবং নিয়মিত পরীক্ষা করা হলে কিডনি রোগকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

এখন সময়—

  • সচেতন হওয়া,
  • নিয়মিত স্ক্রিনিং করা,
  • স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন নিশ্চিত করা।

কিডনি রোগ নীরব, কিন্তু এর প্রতিরোধ সম্পূর্ণই আপনার হাতে।