স্বৈরতন্ত্রের পথে পাকিস্তান: সেনাপ্রধান পেলেন আজীবন দায়মুক্তি
- Update Time : ১১:৪৭:১৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ নভেম্বর ২০২৫
- / ২০১ Time View

পাকিস্তানের সংসদ দেশটির সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে নতুন ক্ষমতা দেওয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছে। একই সঙ্গে তাকে গ্রেপ্তার এবং বিচার থেকে আজীবন দায়মুক্তিও দেওয়া হয়েছে। সমালোচকরা বলছেন, এই পদক্ষেপ পাকিস্তানের স্বৈরশাসনের পথকে আরও প্রশস্ত করছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার এই আইনটি স্বাক্ষরের মাধ্যমে পাকিস্তানের সংবিধানের ২৭তম সংশোধনীতে পরিণত হয়েছে। এই সংশোধনীর মাধ্যমে দেশের শীর্ষ আদালতগুলোর পরিচালনা প্রণালীতেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে।
যারা এই পরিবর্তনের পক্ষে বলছেন, তাদের মতে, এটি সশস্ত্র বাহিনীকে প্রশাসনিক কাঠামো দেবে এবং একই সঙ্গে আদালতে মামলা নিষ্পত্তির জট কমাতে সাহায্য করবে। পারমাণবিক শক্তিধারী পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। কখনও তারা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেছে, আবার কখনও পর্দার আড়ালে প্রভাব বিস্তার করেছে।
পাকিস্তানের ইতিহাসে, জেনারেল পারভেজ মোশাররফ এবং জেনারেল জিয়া-উল-হকের মতো সামরিক নেতাদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ দেশটিকে বারবার রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। বিশ্লেষকরা বেসামরিক ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যকে ‘হাইব্রিড শাসন ব্যবস্থা’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তবে এখন অনেকেই মনে করছেন, নতুন সংশোধনী সেই ভারসাম্যকে সেনাবাহীর পক্ষে ঝুঁকিয়ে দিয়েছে।
ওয়াশিংটনের উইলসন সেন্টারের সাউথ এশিয়া ইনস্টিটিউটের পরিচালক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, “আমার কাছে, এই সংশোধনী সবচেয়ে শক্তিশালী ইঙ্গিত।” তিনি উল্লেখ করেছেন, পাকিস্তান আর হাইব্রিড সিস্টেমে নেই, বরং এখন এটি পোস্ট-হাইব্রিড অবস্থার মধ্যে আছে, যেখানে বেসামরিক ও সামরিক সম্পর্ক ভারসাম্যহীন।
নতুন সংবিধান অনুযায়ী, ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মুনির পাকিস্তানের নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীরও তত্ত্বাবধান করবেন। তার ফিল্ড মার্শাল পদবি ও মর্যাদা আজীবনের জন্য প্রযোজ্য হবে এবং প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে রাষ্ট্রপতি তাকে অবসর গ্রহণের পরও দায়িত্ব প্রদান করতে পারবেন। ফলে, ধারণা করা হচ্ছে, মুনির আজীবন গুরুত্বপূর্ণ জনপরিসরে কোনো না কোনো ভূমিকা রাখবেন।
সরকারি সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস অব পাকিস্তান জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফের মতে, এই পরিবর্তনের মাধ্যমে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আধুনিক যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারবে, যা দেশটির বৃহত্তর সংস্কার এজেন্ডার অংশ। তবে সমালোচকরা এটিকে সেনাবাহীর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর হিসেবে দেখছেন।
“সামরিক ও বেসামরিক বাহিনীর মধ্যে কোনো ভারসাম্য নেই,” বলেন সাংবাদিক এবং পাকিস্তানের মানবাধিকার কমিশনের সহ-সভাপতি মুনিজা জাহাঙ্গীর। তিনি বলেন, সেনাবাহীর প্রতি ক্ষমতার ভারসাম্য আরও ঝুঁকিয়ে দেওয়া হয়েছে, এমন সময়ে যখন তাদের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়োজন ছিল।
বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা হ্রাস
একটি বিতর্কিত ক্ষেত্র হলো আদালত ও বিচার বিভাগ। সংশোধনীর অধীনে নতুন ফেডারেল সাংবিধানিক আদালত (FCC) গঠন করা হবে, যা সাংবিধানিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। আদালতের প্রধান বিচারপতি ও অন্যান্য বিচারক রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত করবেন।
মুনিজা জাহাঙ্গীর বলেন, “এটি ন্যায্য বিচারের অধিকারের প্রকৃতি চিরতরে পরিবর্তন করেছে। শুধু বিচারক নিয়োগ নয়, সাংবিধানিক বেঞ্চের গঠনেও নির্বাহী বিভাগের প্রভাব বেড়েছে। যখন রাষ্ট্র বেঞ্চের গঠন নির্ধারণ করছে, তখন মামলাকারী ন্যায্য বিচার আশা করতে পারেন কি?”
সাংবাদিক ও বিশ্লেষক আরিফা নূরও মনে করেন, বিচার বিভাগ এখন নির্বাহী বিভাগের অধীনে এবং স্বাধীনভাবে কাজ করার কোনো সুযোগ নেই। পূর্বে সুপ্রিম কোর্ট সাংবিধানিক মামলা শুনত এবং সিদ্ধান্ত দিত, যা ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলার জট কমাত। নতুন ব্যবস্থা এই দুটি কার্যক্রম আলাদা করছে।
কিন্তু কারো মতে, এটি কার্যকর প্রক্রিয়ার পরিবর্তনের নামান্তর নয়। সুপ্রিম কোর্টের করাচি-ভিত্তিক আইনজীবী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “বেসামরিক বিচার ব্যবস্থা দ্রুততর করার ক্ষেত্রে এই পদক্ষেপ বাস্তবসম্মত নয়।”
সংশোধনী স্বাক্ষরের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতি পদত্যাগ করেছেন। বিচারপতি আতহার মিনাল্লাহ লিখেছেন, “যে সংবিধান রক্ষা করার শপথ নিয়েছিলাম, তা আর নেই।” বিচারপতি মনসুর আলী শাহ বলেন, “২৭তম সংশোধনী সুপ্রিম কোর্টকে টুকরো টুকরো করেছে এবং বিচার বিভাগকে সরকারের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে।”
প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেন, পদত্যাগের মাধ্যমে বিচারপতিরা বুঝতে পেরেছেন যে সংবিধানের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার চেষ্টা হচ্ছে।
এখন বিচারকদের বিনা সম্মতিতে স্থানান্তর করা যেতে পারে। যদি তা মানা না হয়, তারা বিচারিক কমিশনে আপিল করতে পারবেন, তবে অবৈধ প্রমাণিত হলে অবসর নিতে হবে। সমর্থকরা বলছেন, এর মাধ্যমে দেশের সকল আদালতে কর্মী নিয়োগ নিশ্চিত হবে, কিন্তু সমালোচকরা মনে করেন, এটি হুমকির হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার হতে পারে।
সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “একজন বিচারককে অন্য প্রদেশে স্থানান্তর করা হলে তার ওপর সরকার মান্য করার চাপ তৈরি হবে, যা পাকিস্তানের ভারসাম্য নষ্ট করবে।”
কুগেলম্যানও মন্তব্য করেছেন, এটি সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য ভালো লক্ষণ নয় এবং এটি কর্তৃত্ববাদের দিকে ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়। সর্বশেষ ২৭তম সংশোধনী ২৬তম সংশোধনীর উপর ভিত্তি করে তৈরি, যেখানে সংসদ পাকিস্তানের শীর্ষ বিচারক নির্বাচন করার ক্ষমতা পেয়েছিল। ইতোমধ্যেই ২৮তম সংশোধনী নিয়ে জল্পনাও শুরু হয়েছে।
















