সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুই হাজার বছরেরও বেশি কারাদণ্ডের মুখে ইস্তান্বুলের মেয়র একরেম ইমামওলু

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৮:৩৩:৫৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ নভেম্বর ২০২৫
  • / ২৩১ Time View

তুরস্কের রাজনীতিতে আবারও তীব্র আলোড়ন তুলেছে ইস্তান্বুলের মেয়র ও বিরোধী নেতা একরেম ইমামওলুর বিরুদ্ধে নতুন দুর্নীতি মামলা। দেশটির প্রসিকিউশন কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে ১৪২টি পৃথক অভিযোগ এনে মোট দুই হাজার বছরেরও বেশি কারাদণ্ডের আবেদন জানিয়েছে। এই অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে, ইমামওলুর সর্বোচ্চ ২,৩৫২ থেকে ২,৪৩০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে—যা আধুনিক তুরস্কের ইতিহাসে নজিরবিহীন।

সরকারি তহবিল অপব্যবহার ঘুষের অভিযোগ

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এবং তুরস্কের আনাদোলু এজেন্সি জানায়, ইমামওলুর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে সরকারি তহবিলের অপব্যবহার, ঘুষ গ্রহণ, জালিয়াতি, অর্থপাচার এবং সরকারি চুক্তিতে অনিয়ম। তুরস্কের প্রধান প্রসিকিউটর আকিন গুরলেক জানান, আট মাসের তদন্তে দেখা গেছে, ইমামওলুসহ মোট ৪০১ জন এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এর মধ্যে ১০৫ জন ইতোমধ্যে আটক রয়েছেন। তারা অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জন ও অর্থপাচারের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে প্রায় ১৬০ বিলিয়ন তুর্কি লিরা (প্রায় ৩.বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ক্ষতি করেছেন।

ইমামওলুর বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার ১২টি, অর্থপাচারের ৭টি এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জালিয়াতির ৭টি অভিযোগ রয়েছে। আনাদোলুর হিসাবে, এসব অভিযোগে তার সাজা দাঁড়াতে পারে ২,৪৩০ বছর পর্যন্ত।

ইমামওলুর রাজনৈতিক অবস্থান জনপ্রিয়তা

বর্তমানে ৫৪ বছর বয়সী একরেম ইমামওলু তুরস্কের প্রধান বিরোধী দল রিপাবলিকান পিপলস পার্টি (সিএইচপি)-এর অন্যতম শীর্ষ নেতা এবং প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত। তিনি ২০১৯ সালে ইস্তান্বুলের মেয়র নির্বাচনে ক্ষমতাসীন একে পার্টির প্রার্থীকে পরাজিত করে জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ২০২৪ সালের এপ্রিলের নির্বাচনে তিনি আবারও বিপুল ব্যবধানে জয়ী হন, যেখানে তিনি এরদোয়ান সমর্থিত প্রার্থীকে প্রায় দশ লাখ ভোটে পরাজিত করেন।

তুরস্কের রাজনীতিতে ইমামওলুর উত্থান অনেক বিশ্লেষকের মতে এরদোয়ান যুগের সম্ভাব্য সমাপ্তির সূচনা হিসেবে দেখা হয়েছিল। তাই বিরোধী শিবিরের দাবি—এই দুর্নীতি মামলা আসলে এক ধরনের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা

ভয় দেখানোর কৌশল

রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা?

বিরোধী দল সিএইচপি অভিযোগ করেছে যে, এই মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রণোদিত। তাদের মতে, এরদোয়ানের জনপ্রিয়তা ক্রমেই কমে যাওয়ায় সরকার এখন প্রতিপক্ষকে দমন করার পথ নিয়েছে। সিএইচপি মুখপাত্র বলেন, “এই মামলা ইস্তান্বুলের জনগণের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ, যারা দুইবার এরদোয়ানের প্রার্থীকে প্রত্যাখ্যান করেছে।”

ইমামওলু নিজেও আদালতে দেওয়া এক বিবৃতিতে সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “এটি কোনো দুর্নীতির মামলা নয়, এটি গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে মামলা। আমি জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়েছি বলেই আমাকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।”

আটক দমন অভিযান

ইমামওলুকে গত মার্চে গ্রেপ্তার করা হয়, যার পর তুরস্কজুড়ে বিক্ষোভ পুলিশের দমন অভিযান শুরু হয়। শত শত বিরোধী নেতা ও সমর্থককে গ্রেপ্তার করা হয়। বর্তমানে তিনি ইস্তান্বুলের মারমারা কারাগারে প্রাক-বিচারিক আটক অবস্থায় রয়েছেন।

অন্যান্য অভিযোগ রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ

দুর্নীতি মামলার পাশাপাশি ইমামওলুর বিরুদ্ধে আরও কিছু অভিযোগ আনা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে গুপ্তচরবৃত্তি, জাল সনদ ব্যবহার অবৈধ সম্পদ অর্জন। তার বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিও বাতিল করা হয়েছে, ফলে বর্তমান আইন অনুযায়ী তিনি ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইমামওলুর জনপ্রিয়তা ও প্রভাব এরদোয়ানের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। ফলে, এই মামলার রায় তুরস্কের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। অনেকে আশঙ্কা করছেন, যদি ইমামওলুকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়, তবে এটি তুরস্কের গণতন্ত্র বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতার ওপর এক বড় আঘাত হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হবে।

তবে এরদোয়ানপন্থি মহল দাবি করছে, “আইনের চোখে সবাই সমান” — এবং কেউই রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহারের দায় থেকে রেহাই পেতে পারে না। কিন্তু ইস্তান্বুলের রাস্তায় এখনও স্লোগান ধ্বনিত হচ্ছে:
ইমামওলু মানে প্রতিরোধ, ইমামওলু মানে জনগণের আশা।”

এই মামলা তাই কেবল একটি ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়—বরং তুরস্কের গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে চলমান এক ঐতিহাসিক লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

দুই হাজার বছরেরও বেশি কারাদণ্ডের মুখে ইস্তান্বুলের মেয়র একরেম ইমামওলু

Update Time : ০৮:৩৩:৫৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ নভেম্বর ২০২৫

তুরস্কের রাজনীতিতে আবারও তীব্র আলোড়ন তুলেছে ইস্তান্বুলের মেয়র ও বিরোধী নেতা একরেম ইমামওলুর বিরুদ্ধে নতুন দুর্নীতি মামলা। দেশটির প্রসিকিউশন কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে ১৪২টি পৃথক অভিযোগ এনে মোট দুই হাজার বছরেরও বেশি কারাদণ্ডের আবেদন জানিয়েছে। এই অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে, ইমামওলুর সর্বোচ্চ ২,৩৫২ থেকে ২,৪৩০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে—যা আধুনিক তুরস্কের ইতিহাসে নজিরবিহীন।

সরকারি তহবিল অপব্যবহার ঘুষের অভিযোগ

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এবং তুরস্কের আনাদোলু এজেন্সি জানায়, ইমামওলুর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে সরকারি তহবিলের অপব্যবহার, ঘুষ গ্রহণ, জালিয়াতি, অর্থপাচার এবং সরকারি চুক্তিতে অনিয়ম। তুরস্কের প্রধান প্রসিকিউটর আকিন গুরলেক জানান, আট মাসের তদন্তে দেখা গেছে, ইমামওলুসহ মোট ৪০১ জন এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এর মধ্যে ১০৫ জন ইতোমধ্যে আটক রয়েছেন। তারা অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জন ও অর্থপাচারের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে প্রায় ১৬০ বিলিয়ন তুর্কি লিরা (প্রায় ৩.বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ক্ষতি করেছেন।

ইমামওলুর বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার ১২টি, অর্থপাচারের ৭টি এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জালিয়াতির ৭টি অভিযোগ রয়েছে। আনাদোলুর হিসাবে, এসব অভিযোগে তার সাজা দাঁড়াতে পারে ২,৪৩০ বছর পর্যন্ত।

ইমামওলুর রাজনৈতিক অবস্থান জনপ্রিয়তা

বর্তমানে ৫৪ বছর বয়সী একরেম ইমামওলু তুরস্কের প্রধান বিরোধী দল রিপাবলিকান পিপলস পার্টি (সিএইচপি)-এর অন্যতম শীর্ষ নেতা এবং প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত। তিনি ২০১৯ সালে ইস্তান্বুলের মেয়র নির্বাচনে ক্ষমতাসীন একে পার্টির প্রার্থীকে পরাজিত করে জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ২০২৪ সালের এপ্রিলের নির্বাচনে তিনি আবারও বিপুল ব্যবধানে জয়ী হন, যেখানে তিনি এরদোয়ান সমর্থিত প্রার্থীকে প্রায় দশ লাখ ভোটে পরাজিত করেন।

তুরস্কের রাজনীতিতে ইমামওলুর উত্থান অনেক বিশ্লেষকের মতে এরদোয়ান যুগের সম্ভাব্য সমাপ্তির সূচনা হিসেবে দেখা হয়েছিল। তাই বিরোধী শিবিরের দাবি—এই দুর্নীতি মামলা আসলে এক ধরনের রাজনৈতিক

প্রতিহিংসা ভয় দেখানোর কৌশল

রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা?

বিরোধী দল সিএইচপি অভিযোগ করেছে যে, এই মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রণোদিত। তাদের মতে, এরদোয়ানের জনপ্রিয়তা ক্রমেই কমে যাওয়ায় সরকার এখন প্রতিপক্ষকে দমন করার পথ নিয়েছে। সিএইচপি মুখপাত্র বলেন, “এই মামলা ইস্তান্বুলের জনগণের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ, যারা দুইবার এরদোয়ানের প্রার্থীকে প্রত্যাখ্যান করেছে।”

ইমামওলু নিজেও আদালতে দেওয়া এক বিবৃতিতে সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “এটি কোনো দুর্নীতির মামলা নয়, এটি গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে মামলা। আমি জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়েছি বলেই আমাকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।”

আটক দমন অভিযান

ইমামওলুকে গত মার্চে গ্রেপ্তার করা হয়, যার পর তুরস্কজুড়ে বিক্ষোভ পুলিশের দমন অভিযান শুরু হয়। শত শত বিরোধী নেতা ও সমর্থককে গ্রেপ্তার করা হয়। বর্তমানে তিনি ইস্তান্বুলের মারমারা কারাগারে প্রাক-বিচারিক আটক অবস্থায় রয়েছেন।

অন্যান্য অভিযোগ রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ

দুর্নীতি মামলার পাশাপাশি ইমামওলুর বিরুদ্ধে আরও কিছু অভিযোগ আনা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে গুপ্তচরবৃত্তি, জাল সনদ ব্যবহার অবৈধ সম্পদ অর্জন। তার বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিও বাতিল করা হয়েছে, ফলে বর্তমান আইন অনুযায়ী তিনি ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইমামওলুর জনপ্রিয়তা ও প্রভাব এরদোয়ানের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। ফলে, এই মামলার রায় তুরস্কের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। অনেকে আশঙ্কা করছেন, যদি ইমামওলুকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়, তবে এটি তুরস্কের গণতন্ত্র বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতার ওপর এক বড় আঘাত হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হবে।

তবে এরদোয়ানপন্থি মহল দাবি করছে, “আইনের চোখে সবাই সমান” — এবং কেউই রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহারের দায় থেকে রেহাই পেতে পারে না। কিন্তু ইস্তান্বুলের রাস্তায় এখনও স্লোগান ধ্বনিত হচ্ছে:
ইমামওলু মানে প্রতিরোধ, ইমামওলু মানে জনগণের আশা।”

এই মামলা তাই কেবল একটি ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়—বরং তুরস্কের গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে চলমান এক ঐতিহাসিক লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছে।