জাতিসংঘ আগামী শুক্রবার বিলুপ্ত হয়ে গেলে বিশ্বজুড়ে কী ঘটতে পারে -আল–জাজিরা
- Update Time : ১২:০০:৩৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ নভেম্বর ২০২৫
- / ২৪৩ Time View

বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকার পর ১৯৪৫ সালের অক্টোবরে প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘের লক্ষ্য ছিল—বিশ্বে শান্তি, নিরাপত্তা ও সহযোগিতার নতুন অধ্যায় রচনা করা। গত আট দশকে সংস্থাটি আন্তর্জাতিক কূটনীতি, মানবাধিকার, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও শরণার্থী সঙ্কট মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু আজ, যখন গাজায় ইসরায়েলের নির্লজ্জ আগ্রাসন চলমান, তখন জাতিসংঘের অক্ষমতা ও রাজনৈতিক পক্ষপাত নিয়ে প্রশ্ন উঠছে নতুন করে।
অনেকে বলছেন, জাতিসংঘ এখন কার্যত পশ্চিমা শক্তির একটি হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে—যেখানে গ্লোবাল সাউথের স্বার্থ উপেক্ষিত। এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন জাগে—যদি আগামী শুক্রবারই জাতিসংঘ হঠাৎ বিলুপ্ত হয়ে যায়, তবে বিশ্ব কী অবস্থায় পড়বে? কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল–জাজিরা এ নিয়ে বেশ কয়েকজন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলেছে। তাঁদের বিশ্লেষণ বলছে—জাতিসংঘের অনুপস্থিতিতে মানবসভ্যতা এক অভূতপূর্ব অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।

অভিবাসী ও শরণার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রিফিউজি স্টাডিজ সেন্টারের গবেষণা সহযোগী জেফ ক্রিসপ মনে করেন, জাতিসংঘ বিলুপ্ত হলে মানবিক বিপর্যয় অবধারিত। তাঁর ভাষায়, “আপনি যদি শুক্রবার জাতিসংঘ বিলুপ্ত করেন, সোমবারই এটিকে পুনর্গঠনের দাবি উঠবে।”
বিশ্বজুড়ে বর্তমানে ১০ কোটিরও বেশি শরণার্থী, বাস্তুচ্যুত মানুষ ও অনিয়মিত অভিবাসী আছে—যা কোনো একক রাষ্ট্রের পক্ষে সামাল দেওয়া অসম্ভব। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশন (UNHCR) না থাকলে খাদ্য ও আশ্রয়সঙ্কট দ্রুত বিস্তৃত হবে। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রসহ কিছু দাতা দেশ সহায়তা কমিয়েছে, ফলে জাতিসংঘ–সমর্থিত ক্যাম্পগুলোতে খাদ্যনিরাপত্তা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
জাতিসংঘের অভাবে ধনী দেশগুলোতে শরণার্থী প্রবাহ আরও বাড়বে, অথচ দরিদ্ররা আরও বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে আটকে পড়বে। ক্রিসপ সতর্ক করেছেন—“জাতিসংঘ না থাকলে শরণার্থীদের প্রতি আচরণের জন্য কোনো রাষ্ট্রকেই আর জবাবদিহি করতে হবে না।” ফলে একতরফা ও স্বার্থান্বেষী মানবিক মডেল, যেমন ইসরায়েল–মার্কিন ব্যক্তিগত সাহায্য সংস্থা ‘গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন’-এর মতো প্রতিষ্ঠান, নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বেড়ে উঠবে।

আন্তর্জাতিক আইনের ভবিষ্যৎ: ক্ষমতার কাছে নত হবে ন্যায়
সাবেক প্রসিকিউটর ও আইনজীবী জিওফ্রে নাইস মনে করেন, জাতিসংঘ বিলুপ্ত হলেও আন্তর্জাতিক আইন সম্পূর্ণ হারিয়ে যাবে না, কিন্তু তার প্রয়োগ দুর্বল হয়ে পড়বে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (ICC) ক্ষমতা ক্রমশ সীমিত হচ্ছে।
নাইস বলেন, “জাতিসংঘ বিলুপ্ত হওয়া আসলে চলমান এক প্রক্রিয়ারই পরিণতি। এর আগেও মহৎ প্রতিষ্ঠান, যেমন লিগ অব নেশনস, বিলীন হয়েছে।” তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, জাতিসংঘ হারিয়ে গেলে বিশ্ব আবার ওয়েস্টফালিয়ান রাজনীতির যুগে ফিরে যাবে—যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্র নিজের ভূখণ্ডে পরম সার্বভৌমত্ব বজায় রাখবে, এবং আন্তর্জাতিক জবাবদিহির ধারণা কার্যত বিলুপ্ত হবে।
তবে তিনি এটাও বলেন, কিছু এনজিও ও মানবাধিকার সংগঠন যেমন ফিলিস্তিনি সংস্থা আল-হক, তারা জাতীয় আদালত ব্যবহার করে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার চেষ্টা অব্যাহত রাখবে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় শক্তি ও করপোরেট প্রভাবের সামনে এই উদ্যোগগুলো টিকবে কিনা, তা বড় প্রশ্ন।
শান্তিরক্ষার ভূমিকা কে নেবে?
জাতিসংঘের সাবেক সহকারী মহাসচিব রমেশ ঠাকুর বলেন, “একতরফা শান্তিরক্ষা আসলে দখলদারত্ব। এটি বৈধতার প্রশ্নে ব্যর্থ।” আফ্রিকান ইউনিয়ন বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো আঞ্চলিক সংস্থা অনেক সময় শান্তি রক্ষায় ভূমিকা রাখে, কিন্তু তারাও শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘের অনুমোদন খোঁজে—কারণ সেটিই বৈধতার প্রতীক।
ঠাকুরের মতে, জাতিসংঘের অনুপস্থিতিতে শান্তিরক্ষার পুরো ধারণাই ধসে পড়বে। কারণ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ছাড়া কোনো যুদ্ধবিরতি বা শান্তি চুক্তি আন্তর্জাতিকভাবে বৈধতা পাবে না। তিনি বলেন, “আইসিসি বা আইসিজে পুতিন ও নেতানিয়াহুর মতো নেতাদের গ্রেপ্তার করতে পারে না—এটি আন্তর্জাতিক আইনের জন্য এক গভীর পরিহাস।”

বিশ্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বিপর্যয়
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জাতিসংঘের একটি প্রধান অঙ্গ, যা বিলুপ্ত হলে বৈশ্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। সংস্থার সাবেক প্রধান বিজ্ঞানী ড. সৌম্য স্বামীনাথন বলেন, “ডব্লিউএইচও না থাকলে নিম্ন আয়ের দেশগুলো ওষুধ ও টিকা অনুমোদনের সক্ষমতা হারাবে। মানুষ হয় চিকিৎসাবিহীন থাকবে, নয়তো অনিরাপদ চিকিৎসা পাবে।”
তিনি সতর্ক করেছেন, কোভিড-১৯ মহামারির সময় যেমন WHO গরিব দেশগুলোকে টিকা দিতে এগিয়ে এসেছিল, তেমনি ভবিষ্যতের মহামারিতেও এর ভূমিকা অপরিহার্য। সংস্থাটি ৫০ বছর ধরে ইনফ্লুয়েঞ্জা ও অন্যান্য ভাইরাস নজরদারি করছে। এটি না থাকলে প্রাদুর্ভাবের আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।
বৈশ্বিক সহায়তা ব্যবস্থার শূন্যতা
নর্থ ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেমস টমাস মনে করেন, জাতিসংঘ ও এর সহযোগী সংস্থাগুলো কেবল ত্রাণই দেয় না, বরং বিশ্বব্যাপী উন্নয়নের এক পরিকাঠামো গড়ে তুলেছে। তিনি বলেন, “জাতিসংঘ বিলুপ্ত হলে আমরা বুঝব, এ ধরনের প্রতিষ্ঠান কত গভীরভাবে আমাদের সভ্যতার সঙ্গে গেঁথে গেছে।”
তবে টমাস এটাও মনে করেন, জাতিসংঘসহ পশ্চিমা সহায়তা সংস্থাগুলোর মধ্যে এখনো উপনিবেশিক মানসিকতা রয়ে গেছে। গ্লোবাল নর্থ এখনো দক্ষিণের দেশগুলোর ওপর তাদের উন্নয়ন মডেল চাপিয়ে দেয়। তিনি বলেন, “জাতিসংঘ না থাকলে হয়তো সাহায্য আরও বৈচিত্র্যময় হবে, কিন্তু তা হবে খণ্ডিত, অনিশ্চিত ও অস্থির।”
জাতিসংঘ নিখুঁত নয়—এটি বারবার ব্যর্থ হয়েছে, কখনো পক্ষপাতদুষ্ট থেকেছে। তবু এটি ছাড়া বর্তমান বিশ্বের কোনো বিকল্প কাঠামো নেই। আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার, বৈশ্বিক স্বাস্থ্য, শরণার্থী সুরক্ষা—সব ক্ষেত্রেই জাতিসংঘই আজও মূল চালিকাশক্তি।
যদি জাতিসংঘ আগামী শুক্রবার সত্যিই বিলুপ্ত হয়ে যায়, তবে পৃথিবী এক বিশৃঙ্খল, স্বার্থনির্ভর, শক্তিশালী রাষ্ট্রের প্রাধান্যভিত্তিক ব্যবস্থায় ফিরে যাবে—যেখানে দুর্বলদের জন্য থাকবে না কোনো সুরক্ষা, কোনো ন্যায়বিচার, কোনো কণ্ঠস্বর।
মানবসভ্যতার ইতিহাস বলছে—বিশ্বকে একত্রে ধরে রাখার কোনো না কোনো কাঠামো আমরা শেষ পর্যন্ত আবার গড়ে তুলব। প্রশ্ন কেবল এই—ততদিনে কত মানুষ, কত রাষ্ট্র, কত প্রজন্মের আশা মুছে যাবে?
















