ঋণ খেলাপিদের বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচার করতে হবে
- Update Time : ০৫:৪৯:৫৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ মে ২০২৫
- / ৩১৪ Time View

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে এক গভীর সংকটে পতিত হয়েছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে খেলাপি ঋণের বিপজ্জনক বৃদ্ধি। রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি উভয় ব্যাংকেই লক্ষ-কোটি টাকার ঋণ অনাদায়ী রয়ে যাচ্ছে, যার ফলে দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হচ্ছে এবং সাধারণ জনগণের আমানতের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে।
এই প্রেক্ষাপটে দেশের অন্যতম খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ ও জাতীয় অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম খেলাপিদের বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তার মতে, প্রচলিত আইনি কাঠামো ও বিচারপ্রক্রিয়া যথেষ্ট নয়, বরং এ সমস্যার সমাধানে দ্রুত, কার্যকর ও নিরপেক্ষ বিচারিক ব্যবস্থা প্রয়োজন, যা শুধুমাত্র বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমেই সম্ভব।

খেলাপি ঋণের ভয়াবহ চিত্র
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১.৬৩ লক্ষ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ১১.৪%। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত খেলাপির পরিমাণ আরও বেশি, যেটি ‘ছদ্ম ঋণ পুনঃতফসিল ও রাইট–অফ‘ প্রক্রিয়ার কারণে প্রকাশ পাচ্ছে না।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে:
- একাধিক বৃহৎ ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বছরের পর বছর ঋণ ফেরত না দিয়েও নতুন ঋণ পাচ্ছে।
- রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং দুর্নীতির কারণে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না।
- মামলাগুলো বছরের পর বছর আদালতে ঝুলে থাকে, ফলে ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা প্রায় শূন্যে নেমে আসে।
ড. মইনুল ইসলামের সুপারিশ: ট্রাইব্যুনাল, শাস্তি ও জামিনে কঠোরতা
ড. মইনুল ইসলামের মতে, সাধারণ আদালতের মাধ্যমে ঋণ আদায় কখনোই কার্যকর নয়। তার প্রস্তাব অনুযায়ী:
১. বিশেষ ট্রাইব্যুনাল
- একটি স্বাধীন, অরাজনৈতিক এবং উচ্চতর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে যেখানে শুধুমাত্র ঋণ খেলাপিদের বিচার হবে।
- এসব ট্রাইব্যুনালের বিচারকরা অর্থনৈতিক অপরাধ বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হবেন।
- প্রাথমিকভাবে প্রতিটি বিভাগীয় শহরে একটি করে ট্রাইব্যুনাল গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে।
২. সম্পত্তি জব্দ ও কারাদণ্ড
- যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ ফেরত দিচ্ছে না, তাদের বিরুদ্ধে সম্পত্তি জব্দ, ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং কারাদণ্ডের ব্যবস্থা নিতে হবে।
- এই ব্যবস্থা গৃহীত হলে খেলাপিরা আইনের কঠোরতা উপলব্ধি করবে এবং ঋণ পরিশোধে বাধ্য হবে।
৩. জামিনে কঠোরতা
- মামলার দীর্ঘসূত্রতা ঠেকাতে জামিন পাওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর শর্ত আরোপ করতে হবে।
- অন্তত ঋণের ৪০–৫০% পরিশোধ না করলে জামিন না দেওয়ার বিধান চালু করতে হবে।
- এর ফলে খেলাপিরা মামলাকে টানাবেন না বরং ঋণ মেটানোর আগ্রহী হবেন।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও উদাহরণ
বিশ্বব্যাপী অনেক দেশেই ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে বিশেষ আইন ও আদালত চালু আছে, যা বাংলাদেশে অনুসরণ করা যেতে পারে।
- ভারত:
২০১৬ সালে ভারতে চালু হয় ইনসালভেন্সি অ্যান্ড ব্যাংকরাপ্সি কোড (IBC), যার মাধ্যমে ১৮০ দিনের মধ্যে ঋণ সমস্যার নিষ্পত্তির বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এর ফলে মাত্র ৫ বছরে ভারতের খেলাপি ঋণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।
- মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর:
এই দেশগুলোতে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে দ্রুত ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে ব্যক্তিগত ও কর্পোরেট সম্পত্তি নিলাম করে ঋণ আদায় করা হয়। এতে ঋণ গ্রহণের আগে গ্রাহক অনেক বেশি সচেতন থাকেন।
- দক্ষিণ কোরিয়া:
সাউথ কোরিয়ায় খেলাপি হলে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক লেনদেন, সম্পত্তি হস্তান্তর এমনকি বিদেশ ভ্রমণের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
বাস্তবায়নের পথে চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রস্তাব বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে:
- রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব
- প্রভাবশালীদের চাপ ও হস্তক্ষেপ
- দুর্নীতি ও অনিয়ম
তবে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকারকে নিতে হবে সংবিধানসম্মত আইন সংস্কার উদ্যোগ। এক্ষেত্রে প্রয়োজন:
- বিচারিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা
- আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থাকে শক্তিশালী করা
- প্রশাসনের মধ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাত আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ অনাদায়ী থাকলে উন্নয়ন কার্যক্রমও ধাক্কা খাবে। তাই এখনই সময় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের। ড. মইনুল ইসলামের বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রস্তাব শুধুই একটি আইনি সংস্কার নয়, এটি একটি নীতিগত ও নৈতিক অবস্থান যা দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সরকার ও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ যদি এই প্রস্তাবনায় গুরুত্ব দেয়, তাহলে শুধু খেলাপি ঋণ নয়, পুরো ব্যাংকিং খাতেই ফিরে আসবে আস্থা, জবাবদিহিতা এবং আর্থিক শৃঙ্খলা।
©billal Hossain












