শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার শঙ্কা: রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকে পদ না থাকলেও ৭২১৫ জনের পদোন্নতি
- Update Time : ১০:১৪:০৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৫
- / ১৯৪ Time View

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে নজিরবিহীন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রাষ্ট্রায়ত্ত প্রধান চারটি ব্যাংকে প্রায় ১০ হাজার কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৭,২১৫ জনই সুপার নিউমারারি ভিত্তিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, অর্থাৎ ব্যাংকের নির্ধারিত পদের বাইরে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের পদোন্নতি ব্যাংকগুলোর অর্গানোগ্রাম ভেঙে দেওয়ার মতো ঘটনা সৃষ্টি করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই গণপদোন্নতির ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার শঙ্কা বাড়ছে।
সুপার নিউমারারি পদোন্নতির ধরণ
সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকে মহাব্যবস্থাপক (জিএম), উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম), সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম), সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার (এসপিও), প্রিন্সিপাল অফিসার (পিও) ও সিনিয়র অফিসার (এসও) পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য হলো, ১,০৬৭ জন কর্মকর্তাকে এসপিও থেকে এজিএম পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এজিএম পদ পাওয়া কর্মকর্তারা ব্যাংকের কাছ থেকে ৩০ লাখ টাকা সুদমুক্ত ঋণ এবং প্রতি মাসে ৪২ হাজার টাকা রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা পান। ফলে এই পদোন্নতিগুলো শুধু ব্যক্তিগত সুবিধা বাড়িয়েছে তাই নয়, ব্যাংকের ব্যয়ও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের পদোন্নতি ব্যয় বৃদ্ধি এবং দায়বদ্ধতার অভাব ব্যাংকের সার্বিক কার্যক্রমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বিশৃঙ্খলার শঙ্কা
ব্যাংক খাতের ইতিহাসে এত বড় পরিসরে পদোন্নতির ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। এর ফলে ব্যাংকগুলোতে অতিরিক্ত পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তাদের জন্য ব্যক্তিগত কক্ষ, চেয়ার-টেবিল বরাদ্দ দিতেই ব্যাংকগুলো হিমশিম খাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যাংকিং খাতে ইতোমধ্যেই খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতির সমস্যা রয়েছে। দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৫০ শতাংশ খেলাপি ঋণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই খেলাপি ঋণের পরিমাণ ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
এই অবস্থায় অতিরিক্ত পদোন্নতির কারণে ব্যাংকের ব্যয় প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা বাড়বে। সেই সঙ্গে দক্ষ জনবল ব্যবস্থাপনা ও কর্মক্ষমতা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। ব্যাংকিং সেক্টরে এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়তে পারে, যা অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া ফেলবে।
কীভাবে শুরু হলো গণপদোন্নতি
প্রথমে সোনালী ব্যাংক ২৩ ডিসেম্বর ২,১৯২ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়। এরপর অগ্রণী ব্যাংকের কর্মকর্তারা পদোন্নতির দাবিতে পরিচালকদের ঘেরাও করেন এবং ২৪ ডিসেম্বর রেকর্ড ৩,০৭৭ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে রূপালী ও জনতা ব্যাংকেও গণপদোন্নতি দেওয়া হয়। চার ব্যাংক মিলে প্রায় ১০ হাজার কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই গণপদোন্নতির পেছনে রাজনৈতিক চাপও কাজ করেছে। বিশেষত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এ ধরনের পদোন্নতি দেওয়া অনেকটা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের মতো। তবে এর মাধ্যমে ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত দেশের ব্যাংক খাতে মোট জনবল ছিল ২ লাখ ৮ হাজার। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় বাণিজ্যিক ব্যাংকে ৪৯,১৮৩ জন কর্মরত ছিলেন। আর সরকারি মালিকানাধীন বিশেষায়িত তিন ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন ১৩,২০৪ জন।
পরিসংখ্যান বলছে, গত ২০ দিনে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে প্রতি চারজন কর্মীর মধ্যে একজন পদোন্নতি পেয়েছেন। এর ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় একটি অস্বাভাবিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে।
সুপার নিউমারারি পদোন্নতির কারণ
সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বলেছেন, দীর্ঘদিন পদোন্নতিবঞ্চিত থাকায় কর্মকর্তারা হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। তাই ব্যাংক উন্নয়নের জন্য সুপার নিউমারারি পদোন্নতি জরুরি হয়ে পড়েছিল।
তবে ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পদোন্নতি ব্যাংকিং শৃঙ্খলার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুপার নিউমারারি পদোন্নতি দিয়ে সংকট সমাধানের চেষ্টা করা হলেও এর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে কর্মক্ষমতা ও দক্ষতা মূল্যায়নের বিষয়টি উপেক্ষিত হচ্ছে।
কী হবে পরবর্তী পরিস্থিতি?
গণপদোন্নতির ধাক্কা এখন অন্যান্য ব্যাংকেও লাগছে। বেসিক ব্যাংক, কৃষি ব্যাংক, রাকাবসহ বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তারাও এখন পদোন্নতির দাবি জানাচ্ছেন। এ ধরনের পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারলে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আরও বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পদোন্নতির ক্ষেত্রে যোগ্যতা, দক্ষতা এবং কর্মক্ষমতার বিষয়গুলো বিবেচনা করা উচিত। কেবলমাত্র রাজনৈতিক চাপ বা কর্মচারীদের অসন্তোষ নিরসনের জন্য পদোন্নতি দেওয়া হলে তা ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সরকারের উচিত দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংককে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রয়োজন হলে একটি স্বতন্ত্র কমিশন গঠন করে পদোন্নতির প্রভাব বিশ্লেষণ করা উচিত।
সুত্রঃ বনিক বার্তা












