বাংলাদেশ কি ‘অ্যান্টি–এস আলম ল’করবে?লুটেরাদের বিরুদ্ধে বিশ্ব যা করেছে,বাংলাদেশ কি তা পারবে?
- Update Time : ০৬:১৯:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬
- / ২৮৫ Time View

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত নিয়ে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—রাষ্ট্র কি শেষ পর্যন্ত ব্যাংক ডাকাতদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, নাকি আইনের ফাঁক রেখে আবারও তাদের ফিরে আসার পথ খুলে দেবে? এস আলম গ্রুপের ইসলামী ব্যাংকসহ একাধিক ব্যাংক দখল, নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ এবং পরে হাজার হাজার কোটি টাকা বের করে নেওয়ার অভিযোগ এখন আর গোপন কিছু নয়। দেশের সাধারণ মানুষ, আমানতকারী, অর্থনীতিবিদ—সবার কাছেই এটি এক ভয়াবহ আর্থিক দুঃস্বপ্নের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
কিন্তু এই সংকট শুধু বাংলাদেশের নয়। পৃথিবীর অনেক দেশেই রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ও দুর্নীতির সুযোগে ব্যাংক দখল কিংবা ব্যাংকের অর্থ লুটের ঘটনা ঘটেছে। পার্থক্য হলো—অনেক দেশ সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে কঠোর আইন করেছে, আর বাংলাদেশ এখনো দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে।
মলদোভার ঘটনাটি তার বড় উদাহরণ। ইলান শোর নামের এক ব্যবসায়ী ধীরে ধীরে তিনটি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মাত্র তিন দিনে প্রায় ১০০ কোটি ডলার বের করে নেন। দেশটির অর্থনীতি কেঁপে ওঠে। সরকার বিশেষ প্রশাসন বসায়, আন্তর্জাতিক তদন্ত হয়, প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত জেলে যান। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মলদোভা কখনো ইলান শোরকে ফিরে আসার সুযোগ দেয়নি। রাষ্ট্র বুঝেছিল, আর্থিক খাতের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করতে হলে অপরাধীদের জন্য “দ্বিতীয় সুযোগ” রাখা যায় না।
ইউক্রেন আরও কঠোর পথ বেছে নেয়। দেশটির বৃহত্তম ব্যাংক প্রিভাতব্যাংক থেকে প্রায় ২০০ কোটি ডলার আত্মসাতের অভিযোগ ওঠার পর সরকার ব্যাংকটি জাতীয়করণ করে। পরে পুরোনো মালিক আদালতের মাধ্যমে ব্যাংক ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করলে ইউক্রেন সরকার সরাসরি আইন পরিবর্তন করে। ২০২০ সালে পাস হয় বহুল আলোচিত “অ্যান্টিকলোমোইস্কি ল”। এই আইনের মূল কথা ছিল—একবার রাষ্ট্র কোনো ব্যাংক উদ্ধার করলে সেটি আর আগের মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না। আদালত যদি পরেও কোনো ত্রুটি খুঁজে পায়, তবুও ব্যাংক ফেরত নয়; সর্বোচ্চ ক্ষতিপূরণ দেওয়া যেতে পারে।
এই আইনের মাধ্যমে ইউক্রেন একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিল—ব্যাংক জনগণের সম্পদ, কোনো গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত খেলাঘর নয়।
বাংলাদেশ এখন ঠিক এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। ২০২৫ সালে ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশ জারি হওয়ার পর অনেকেই আশাবাদী হয়েছিলেন যে, অন্তত এবার রাষ্ট্র ব্যাংকিং খাতকে রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত দখল থেকে মুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। সংকটে পড়া ইসলামি ধারার কয়েকটি ব্যাংক একীভূত করার সিদ্ধান্তও সেই ধারার অংশ ছিল।
কিন্তু পরে যখন এই অধ্যাদেশ আইনে রূপ পেল, তখন বিতর্ক তৈরি হয় নতুন একটি ধারা নিয়ে। আইনের ১৮(ক) ধারায় বলা হয়েছে, আগের মালিকেরা চাইলে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে আবার ব্যাংকের শেয়ার ও নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার আবেদন করতে পারবেন। এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে—যে গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাংক ধ্বংসের অভিযোগ, তাদের জন্য কেন ফিরে আসার দরজা খোলা থাকবে?
এটি শুধু অর্থনৈতিক প্রশ্ন নয়; এটি নৈতিকতার প্রশ্নও। কারণ একজন সাধারণ আমানতকারী যদি ব্যাংকে রাখা নিজের টাকার নিরাপত্তা হারান, তাহলে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপরই মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে যায়। আর আস্থা হারানো ব্যাংকিং ব্যবস্থা কোনো দেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ।
এস আলম ইস্যুতে বাংলাদেশের মানুষ যা দেখেছে, তা ছিল এক অভূতপূর্ব ক্ষমতা-নির্ভর ব্যাংক দখলের কাহিনি। অভিযোগ রয়েছে, রাষ্ট্রীয় প্রভাব, গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তা এবং নিয়ন্ত্রক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে একের পর এক ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়েছিল। পরে সেই ব্যাংকগুলো থেকেই বিপুল পরিমাণ অর্থ বেরিয়ে যায়। যদি এমন অভিযোগের পরও ভবিষ্যতে একই গোষ্ঠী বা তাদের প্রতিনিধিরা আবার ফিরে আসতে পারে, তাহলে ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনের উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।
বিশ্বের সফল উদাহরণগুলো বলছে, ব্যাংক উদ্ধার আইন তখনই কার্যকর হয় যখন সেখানে তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা যায়—
প্রথমত, আমানতকারীর নিরাপত্তা;
দ্বিতীয়ত, অপরাধী গোষ্ঠীর স্থায়ী অপসারণ;
তৃতীয়ত, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা।
বাংলাদেশে এখনো এই তিনটির কোনোটিই পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। বরং আইনেই যদি পুরোনো মালিকদের ফেরার সুযোগ রাখা হয়, তাহলে সেটি ভবিষ্যতের জন্য আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আজ প্রয়োজন একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত—ব্যাংক কি জনগণের, নাকি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর?
ইউক্রেন যেমন “অ্যান্টিকলোমোইস্কি ল” করেছে, বাংলাদেশকেও তেমন একটি কঠোর ও নির্ভুল আইনি কাঠামো তৈরি করতে হবে। সেটির নাম হয়তো আনুষ্ঠানিকভাবে “অ্যান্টি–এস আলম ল” হবে না, কিন্তু এর মূল দর্শন হতে হবে পরিষ্কার—যারা ব্যাংক ধ্বংস করেছে, তারা আর কখনো সেই ব্যাংকের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণে ফিরতে পারবে না।
কারণ ব্যাংক শুধু একটি ব্যবসা নয়। এটি মানুষের কষ্টার্জিত সঞ্চয়ের ভাণ্ডার, দেশের অর্থনীতির রক্তপ্রবাহ এবং রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিক আস্থার অন্যতম ভিত্তি। সেই ভিত্তি রক্ষা করতে হলে আপসের রাজনীতি নয়, প্রয়োজন কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক আইন।














