সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ব্যাংক রেজল্যুশন আইন: সংস্কারের নামে লুটেরাদের পুনর্বাসন?

বিল্লাল হোসেন
  • Update Time : ০৫:৪১:৫৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬
  • / ১৭০ Time View

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার ভার বহন করে চলেছে। এই প্রেক্ষাপটে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন ২০২৬’ প্রণয়নকে অনেকেই আশার আলো হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সমালোচনা বলছে—এই আইন কি সত্যিই সংস্কারের পথ খুলছে, নাকি বরং পুরোনো লুটপাটের সংস্কৃতিকে বৈধতা দিচ্ছে?

এই প্রশ্নটিই সামনে এনেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সরাসরি অভিযোগ করেছেন, নতুন আইনে এমন কিছু ধারা যুক্ত করা হয়েছে, যা ব্যাংক খাতে দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার পরিবর্তে তাদের পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করছে।

ব্যাংক খাতে সংকট নতুন কিছু নয়। বছরের পর বছর ধরে খেলাপি ঋণ, রাজনৈতিক প্রভাব, অদক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং স্বচ্ছতার অভাব এই খাতকে দুর্বল করে তুলেছে। এমন বাস্তবতায় একটি কার্যকর রেজল্যুশন আইন হওয়া উচিত ছিল—যেখানে দায়ীদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে। কিন্তু যদি সেই আইনই দায়ীদের জন্য ‘পুনরাগমনের দরজা’ খুলে দেয়, তবে সেটি সংস্কার নয়, বরং সংকটকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার শামিল।

টিআইবি’র বক্তব্য অনুযায়ী, আগের অধ্যাদেশে দায়ীরা অর্থ ফেরত দিলেও মালিকানায় ফেরার সুযোগ ছিল না—যা নৈতিক ও সুশাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে যৌক্তিক। কিন্তু নতুন আইনে সেই সীমাবদ্ধতা তুলে দেওয়ার মাধ্যমে এক ধরনের বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়েছে। এতে একটি বার্তা স্পষ্টভাবে উঠে আসে—আপনি যদি লুটপাট করেন, তবুও ভবিষ্যতে আবার ফিরে আসার সুযোগ থাকবে।

এ ধরনের আইন ব্যাংকিং খাতের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ এটি নৈতিক ঝুঁকি (moral hazard) বাড়ায়—যেখানে অনিয়মের পরিণতি ভয়াবহ না হয়ে বরং সহনীয় হয়ে ওঠে। ফলে সুশাসনের পরিবর্তে দায়মুক্তির সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হতে পারে।

অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি উদ্বেগজনক। ব্যাংকিং খাত একটি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। এই খাত দুর্বল হলে বিনিয়োগ কমে যায়, ব্যবসায়িক আস্থা হ্রাস পায় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। তাই ব্যাংক খাতে সংস্কার মানে শুধু আইন প্রণয়ন নয়—বরং কার্যকর প্রয়োগ, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা।

সরকারের যুক্তি হতে পারে—দুর্বল ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে এবং আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় এই ধরনের ব্যবস্থা প্রয়োজন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য কি দায়ীদের পুনর্বাসনই একমাত্র পথ? বরং বিকল্প পথ হতে পারে—স্বাধীন তদারকি, পেশাদার ব্যবস্থাপনা, এবং কঠোর আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে খাতকে পুনর্গঠন করা।

এ মুহূর্তে সবচেয়ে প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট বার্তা: ব্যাংক খাতে দুর্নীতির কোনো স্থান নেই। যারা এই খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, তাদের পুনর্বাসন নয়—বরং বিচারের মুখোমুখি করা জরুরি। অন্যথায়, নতুন আইন পুরোনো সমস্যার নতুন মোড়ক হয়ে দাঁড়াবে।

অতএব, সরকারকে এই আইন পুনর্বিবেচনা করা উচিত। শুধুমাত্র স্থিতিশীলতার অজুহাতে যদি দায়ীদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় সংকট ডেকে আনবে। জনগণের আমানত, অর্থনীতির ভবিষ্যৎ এবং সুশাসনের প্রশ্নে কোনো আপস করা চলবে না।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

বিল্লাল হোসেন

বিল্লাল হোসেন, একজন প্রজ্ঞাবান পেশাজীবী, যিনি গণিতের ওপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ, ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ হিসেবে একটি সমৃদ্ধ ও বহুমুখী ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন। তার আর্থিক খাতে যাত্রা তাকে নেতৃত্বের ভূমিকায় নিয়ে গেছে, বিশেষ করে সৌদি আরবের আল-রাজি ব্যাংকিং Inc. এবং ব্যাংক-আল-বিলাদে বিদেশী সম্পর্ক ও করেসপন্ডেন্ট মেইন্টেনেন্স অফিসার হিসেবে। প্রথাগত অর্থনীতির গণ্ডির বাইরে, বিল্লাল একজন প্রখ্যাত লেখক ও বিশ্লেষক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালে মননশীল কলাম ও গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করে। তার দক্ষতা বিস্তৃত বিষয় জুড়ে রয়েছে, যেমন অর্থনীতির জটিলতা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, প্রবাসী শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্ট, রেমিটেন্স, রিজার্ভ এবং অন্যান্য সম্পর্কিত দিক। বিল্লাল তার লেখায় একটি অনন্য বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসেন, যা ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে অর্জিত বাস্তব জ্ঞানকে একত্রিত করে একাডেমিক কঠোরতার সাথে। তার প্রবন্ধগুলো শুধুমাত্র জটিল বিষয়গুলির উপর গভীর বোঝাপড়ার প্রতিফলন নয়, বরং পাঠকদের জন্য জ্ঞানপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা তত্ত্ব ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। বিল্লাল হোসেনের অবদান তার প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করে যে, তিনি আমাদের আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বের জটিলতাগুলি উন্মোচন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের একটি বিস্তৃত এবং আরও সূক্ষ্ম বোঝাপড়ার দিকে মূল্যবান অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।

ব্যাংক রেজল্যুশন আইন: সংস্কারের নামে লুটেরাদের পুনর্বাসন?

Update Time : ০৫:৪১:৫৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার ভার বহন করে চলেছে। এই প্রেক্ষাপটে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন ২০২৬’ প্রণয়নকে অনেকেই আশার আলো হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সমালোচনা বলছে—এই আইন কি সত্যিই সংস্কারের পথ খুলছে, নাকি বরং পুরোনো লুটপাটের সংস্কৃতিকে বৈধতা দিচ্ছে?

এই প্রশ্নটিই সামনে এনেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সরাসরি অভিযোগ করেছেন, নতুন আইনে এমন কিছু ধারা যুক্ত করা হয়েছে, যা ব্যাংক খাতে দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার পরিবর্তে তাদের পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করছে।

ব্যাংক খাতে সংকট নতুন কিছু নয়। বছরের পর বছর ধরে খেলাপি ঋণ, রাজনৈতিক প্রভাব, অদক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং স্বচ্ছতার অভাব এই খাতকে দুর্বল করে তুলেছে। এমন বাস্তবতায় একটি কার্যকর রেজল্যুশন আইন হওয়া উচিত ছিল—যেখানে দায়ীদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে। কিন্তু যদি সেই আইনই দায়ীদের জন্য ‘পুনরাগমনের দরজা’ খুলে দেয়, তবে সেটি সংস্কার নয়, বরং সংকটকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার শামিল।

টিআইবি’র বক্তব্য অনুযায়ী, আগের অধ্যাদেশে দায়ীরা অর্থ ফেরত দিলেও মালিকানায় ফেরার সুযোগ ছিল না—যা নৈতিক ও সুশাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে যৌক্তিক। কিন্তু নতুন আইনে সেই সীমাবদ্ধতা তুলে দেওয়ার মাধ্যমে এক ধরনের বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়েছে। এতে একটি বার্তা স্পষ্টভাবে উঠে আসে—আপনি যদি লুটপাট করেন, তবুও ভবিষ্যতে আবার ফিরে আসার সুযোগ থাকবে।

এ ধরনের আইন ব্যাংকিং খাতের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ এটি নৈতিক ঝুঁকি (moral hazard) বাড়ায়—যেখানে অনিয়মের পরিণতি ভয়াবহ না হয়ে বরং সহনীয় হয়ে ওঠে। ফলে সুশাসনের পরিবর্তে দায়মুক্তির সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হতে পারে।

অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি উদ্বেগজনক। ব্যাংকিং খাত একটি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। এই খাত দুর্বল হলে বিনিয়োগ কমে যায়, ব্যবসায়িক আস্থা হ্রাস পায় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। তাই ব্যাংক খাতে সংস্কার মানে শুধু আইন প্রণয়ন নয়—বরং কার্যকর প্রয়োগ, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা।

সরকারের যুক্তি হতে পারে—দুর্বল ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে এবং আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় এই ধরনের ব্যবস্থা প্রয়োজন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য কি দায়ীদের পুনর্বাসনই একমাত্র পথ? বরং বিকল্প পথ হতে পারে—স্বাধীন তদারকি, পেশাদার ব্যবস্থাপনা, এবং কঠোর আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে খাতকে পুনর্গঠন করা।

এ মুহূর্তে সবচেয়ে প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট বার্তা: ব্যাংক খাতে দুর্নীতির কোনো স্থান নেই। যারা এই খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, তাদের পুনর্বাসন নয়—বরং বিচারের মুখোমুখি করা জরুরি। অন্যথায়, নতুন আইন পুরোনো সমস্যার নতুন মোড়ক হয়ে দাঁড়াবে।

অতএব, সরকারকে এই আইন পুনর্বিবেচনা করা উচিত। শুধুমাত্র স্থিতিশীলতার অজুহাতে যদি দায়ীদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় সংকট ডেকে আনবে। জনগণের আমানত, অর্থনীতির ভবিষ্যৎ এবং সুশাসনের প্রশ্নে কোনো আপস করা চলবে না।