সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নৈতিক অবনতি: বাস্তবতা, কারণ ও অভিভাবকদের করণীয়

বিল্লাল হোসেন
  • Update Time : ১১:২৯:৫১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল ২০২৬
  • / ১২১ Time View

বর্তমান সমাজে একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে—স্কুল ও কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক অবক্ষয়। বিষয়টি নিয়ে অনেক দিন ধরেই লেখার ইচ্ছা ছিল। সংবাদপত্র ও লেখালেখির সুবাদে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে—পুলিশ কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ, চেয়ারম্যান, মেম্বার ও কাউন্সিলরদের সঙ্গে—নিয়মিত কথা বলার সুযোগ হয়। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। সেই কারণেই আজ আর না লিখে পারলাম না।

গত কয়েক দিনে দুটি ঘটনা শুনে আমি সত্যিই বিচলিত হয়ে পড়েছি। নবম-দশম শ্রেণিতে পড়া মেয়েরা যদি পরিবারের অজান্তে কোনো ছেলের সঙ্গে পালিয়ে যায়, তাহলে সেই পরিবারের মানসিক, সামাজিক ও পারিবারিক অবস্থার কী ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে—তা সহজেই অনুমেয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, এমন দুটি ঘটনা সম্প্রতি ঘটেছে। প্রশ্ন হচ্ছে—এক্ষেত্রে অভিভাবকদের কোনো করণীয় ছিল না? তারা কি সন্তানের চলাফেরা, বন্ধুবান্ধব, দৈনন্দিন আচরণ সম্পর্কে সচেতন ছিলেন না?

আরেকটি ঘটনার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। গত বছর আমি এক আত্মীয়ের বাসায় গিয়েছিলাম একজন বয়স্ক আত্মীয়কে  দেখতে। সবার খোঁজখবর নেওয়ার পর জানতে চাইলাম—নাতি-নাতনিরা কোথায়? তিনি বললেন, তারা পড়াশোনা করছে। আমি লক্ষ্য করলাম, একটি রুমের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। কৌতূহলবশত দরজায় নক করলাম। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলল। ভেতরে দেখি, শুধু একজন প্রাইভেট টিউটর ও একজন ছাত্রী। বিষয়টি আমাকে অবাক করেছিল। পরে আমি আত্মীয়কে বলেছিলাম—এভাবে দরজা বন্ধ করে পড়ানো ঠিক নয়, এতে যে কোনো সময় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে পারে। আমার কথাটি তখন তাদের ভালো লাগেনি, তা বুঝতে পেরেছিলাম। কিন্তু বিশ্বাস করুন, মাত্র দুই মাসের মধ্যেই সেখানে একটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে যায়।

এই ঘটনাগুলোর মূল কারণ কী? আমরা যদি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখতে পাবো—নৈতিক শিক্ষার অভাব, পারিবারিক নজরদারির ঘাটতি এবং সর্বোপরি ধর্মীয় অনুশাসন থেকে দূরে সরে যাওয়া এর অন্যতম প্রধান কারণ।

আজকের অনেক পরিবারে সন্তানদের কেবল ভালো রেজাল্ট করানোতেই গুরুত্ব দেওয়া হয়, কিন্তু তাদের নৈতিকতা, চরিত্র গঠন, সঠিক-ভুলের পার্থক্য বোঝানোর দিকে তেমন নজর দেওয়া হয় না। প্রযুক্তির সহজলভ্যতা, অবাধ ইন্টারনেট ব্যবহার, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনিয়ন্ত্রিত সময় ব্যয়—এসবও কিশোর-কিশোরীদের মানসিকতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

ইসলামি অনুশাসন মানুষের জীবনকে শৃঙ্খলাবদ্ধ ও সুশৃঙ্খল করে। সেখানে দৃষ্টির হেফাজত, পর্দা, শালীনতা, এবং বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গে সীমারেখা বজায় রাখার সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু আমরা যখন এই শিক্ষাগুলো থেকে দূরে সরে যাই, তখনই সমাজে এমন নৈতিক অবক্ষয় দেখা দেয়।

অভিভাবকদের করণীয় কী?

প্রথমত, সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। যাতে তারা কোনো কিছু লুকিয়ে না রেখে খোলামেলা বলতে পারে।

দ্বিতীয়ত, সন্তানের চলাফেরা, বন্ধু নির্বাচন, অনলাইন কার্যক্রম—সবকিছুর ওপর সচেতন নজর রাখতে হবে, তবে তা যেন অতিরিক্ত কঠোর না হয়ে যায়।

তৃতীয়ত, ঘরে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। শুধু বইয়ের পড়াশোনা নয়, চরিত্র গঠনই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।

চতুর্থত, প্রাইভেট পড়াশোনার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হবে। একান্ত প্রয়োজন না হলে দরজা বন্ধ করে পড়ার পরিবেশ তৈরি করা উচিত নয়।

পঞ্চমত, সন্তানদের সময় দিতে হবে। তাদের মানসিক অবস্থা বুঝতে হবে। অনেক সময় অবহেলা থেকেই তারা ভুল পথে পা বাড়ায়।

সবশেষে বলতে চাই, এই সমস্যাকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। একটি পরিবার, একটি সমাজ—এমনকি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার তরুণ প্রজন্মের ওপর। তাই এখনই সময় সচেতন হওয়ার, দায়িত্বশীল হওয়ার এবং নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধে ফিরে আসার।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

বিল্লাল হোসেন

বিল্লাল হোসেন, একজন প্রজ্ঞাবান পেশাজীবী, যিনি গণিতের ওপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ, ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ হিসেবে একটি সমৃদ্ধ ও বহুমুখী ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন। তার আর্থিক খাতে যাত্রা তাকে নেতৃত্বের ভূমিকায় নিয়ে গেছে, বিশেষ করে সৌদি আরবের আল-রাজি ব্যাংকিং Inc. এবং ব্যাংক-আল-বিলাদে বিদেশী সম্পর্ক ও করেসপন্ডেন্ট মেইন্টেনেন্স অফিসার হিসেবে। প্রথাগত অর্থনীতির গণ্ডির বাইরে, বিল্লাল একজন প্রখ্যাত লেখক ও বিশ্লেষক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালে মননশীল কলাম ও গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করে। তার দক্ষতা বিস্তৃত বিষয় জুড়ে রয়েছে, যেমন অর্থনীতির জটিলতা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, প্রবাসী শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্ট, রেমিটেন্স, রিজার্ভ এবং অন্যান্য সম্পর্কিত দিক। বিল্লাল তার লেখায় একটি অনন্য বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসেন, যা ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে অর্জিত বাস্তব জ্ঞানকে একত্রিত করে একাডেমিক কঠোরতার সাথে। তার প্রবন্ধগুলো শুধুমাত্র জটিল বিষয়গুলির উপর গভীর বোঝাপড়ার প্রতিফলন নয়, বরং পাঠকদের জন্য জ্ঞানপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা তত্ত্ব ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। বিল্লাল হোসেনের অবদান তার প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করে যে, তিনি আমাদের আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বের জটিলতাগুলি উন্মোচন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের একটি বিস্তৃত এবং আরও সূক্ষ্ম বোঝাপড়ার দিকে মূল্যবান অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।

স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নৈতিক অবনতি: বাস্তবতা, কারণ ও অভিভাবকদের করণীয়

Update Time : ১১:২৯:৫১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল ২০২৬

বর্তমান সমাজে একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে—স্কুল ও কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক অবক্ষয়। বিষয়টি নিয়ে অনেক দিন ধরেই লেখার ইচ্ছা ছিল। সংবাদপত্র ও লেখালেখির সুবাদে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে—পুলিশ কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ, চেয়ারম্যান, মেম্বার ও কাউন্সিলরদের সঙ্গে—নিয়মিত কথা বলার সুযোগ হয়। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। সেই কারণেই আজ আর না লিখে পারলাম না।

গত কয়েক দিনে দুটি ঘটনা শুনে আমি সত্যিই বিচলিত হয়ে পড়েছি। নবম-দশম শ্রেণিতে পড়া মেয়েরা যদি পরিবারের অজান্তে কোনো ছেলের সঙ্গে পালিয়ে যায়, তাহলে সেই পরিবারের মানসিক, সামাজিক ও পারিবারিক অবস্থার কী ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে—তা সহজেই অনুমেয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, এমন দুটি ঘটনা সম্প্রতি ঘটেছে। প্রশ্ন হচ্ছে—এক্ষেত্রে অভিভাবকদের কোনো করণীয় ছিল না? তারা কি সন্তানের চলাফেরা, বন্ধুবান্ধব, দৈনন্দিন আচরণ সম্পর্কে সচেতন ছিলেন না?

আরেকটি ঘটনার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। গত বছর আমি এক আত্মীয়ের বাসায় গিয়েছিলাম একজন বয়স্ক আত্মীয়কে  দেখতে। সবার খোঁজখবর নেওয়ার পর জানতে চাইলাম—নাতি-নাতনিরা কোথায়? তিনি বললেন, তারা পড়াশোনা করছে। আমি লক্ষ্য করলাম, একটি রুমের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। কৌতূহলবশত দরজায় নক করলাম। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলল। ভেতরে দেখি, শুধু একজন প্রাইভেট টিউটর ও একজন ছাত্রী। বিষয়টি আমাকে অবাক করেছিল। পরে আমি আত্মীয়কে বলেছিলাম—এভাবে দরজা বন্ধ করে পড়ানো ঠিক নয়, এতে যে কোনো সময় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে পারে। আমার কথাটি তখন তাদের ভালো লাগেনি, তা বুঝতে পেরেছিলাম। কিন্তু বিশ্বাস করুন, মাত্র দুই মাসের মধ্যেই সেখানে একটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে যায়।

এই ঘটনাগুলোর মূল কারণ কী? আমরা যদি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখতে পাবো—নৈতিক শিক্ষার অভাব, পারিবারিক নজরদারির ঘাটতি এবং সর্বোপরি ধর্মীয় অনুশাসন থেকে দূরে সরে যাওয়া এর অন্যতম প্রধান কারণ।

আজকের অনেক পরিবারে সন্তানদের কেবল ভালো রেজাল্ট করানোতেই গুরুত্ব দেওয়া হয়, কিন্তু তাদের নৈতিকতা, চরিত্র গঠন, সঠিক-ভুলের পার্থক্য বোঝানোর দিকে তেমন নজর দেওয়া হয় না। প্রযুক্তির সহজলভ্যতা, অবাধ ইন্টারনেট ব্যবহার, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনিয়ন্ত্রিত সময় ব্যয়—এসবও কিশোর-কিশোরীদের মানসিকতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

ইসলামি অনুশাসন মানুষের জীবনকে শৃঙ্খলাবদ্ধ ও সুশৃঙ্খল করে। সেখানে দৃষ্টির হেফাজত, পর্দা, শালীনতা, এবং বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গে সীমারেখা বজায় রাখার সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু আমরা যখন এই শিক্ষাগুলো থেকে দূরে সরে যাই, তখনই সমাজে এমন নৈতিক অবক্ষয় দেখা দেয়।

অভিভাবকদের করণীয় কী?

প্রথমত, সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। যাতে তারা কোনো কিছু লুকিয়ে না রেখে খোলামেলা বলতে পারে।

দ্বিতীয়ত, সন্তানের চলাফেরা, বন্ধু নির্বাচন, অনলাইন কার্যক্রম—সবকিছুর ওপর সচেতন নজর রাখতে হবে, তবে তা যেন অতিরিক্ত কঠোর না হয়ে যায়।

তৃতীয়ত, ঘরে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। শুধু বইয়ের পড়াশোনা নয়, চরিত্র গঠনই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।

চতুর্থত, প্রাইভেট পড়াশোনার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হবে। একান্ত প্রয়োজন না হলে দরজা বন্ধ করে পড়ার পরিবেশ তৈরি করা উচিত নয়।

পঞ্চমত, সন্তানদের সময় দিতে হবে। তাদের মানসিক অবস্থা বুঝতে হবে। অনেক সময় অবহেলা থেকেই তারা ভুল পথে পা বাড়ায়।

সবশেষে বলতে চাই, এই সমস্যাকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। একটি পরিবার, একটি সমাজ—এমনকি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার তরুণ প্রজন্মের ওপর। তাই এখনই সময় সচেতন হওয়ার, দায়িত্বশীল হওয়ার এবং নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধে ফিরে আসার।