সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পাকিস্তান–আফগানিস্তান সীমান্তে উত্তেজনা, মধ্যস্থতায় এগোচ্ছে চীন

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৩:০৪:১৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • / ১২২ Time View
শুক্রবার সকালে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যবর্তী তোরখাম সীমান্তে তালেবান সৈন্যরা, নাঙ্গারহার প্রদেশে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে তোরখাম সীমান্ত ক্রসিংয়ের কাছে তালেবান নিরাপত্তা কর্মীরা পাহারা দিচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

 

পাকিস্তান ও আফগানিস্তান-এর সীমান্তে ক্রমবর্ধমান সংঘাত পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে রূপ নিতে পারে—এমন আশঙ্কা বাড়ছে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। এ পরিস্থিতিতে উত্তেজনা প্রশমনে মধ্যস্থতার উদ্যোগ নিয়েছে চীন। বেইজিং জানিয়েছে, দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধিতে তারা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে সংকট নিরসনে গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে প্রস্তুত। খবর Al Jazeera।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, নিজস্ব কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে ইসলামাবাদ ও কাবুলের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সংলাপ ও আলোচনাকেই সর্বোত্তম পথ বলে মনে করে বেইজিং।

দোহা চুক্তির পরও উত্তেজনা

সাম্প্রতিক সংঘর্ষের পেছনে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা রয়েছে। গত বছরের অক্টোবরে কাতার ও তুরস্ক-এর মধ্যস্থতায় দোহায় বৈঠকের পর দুই দেশ সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। তবে তার আগে সীমান্তজুড়ে টানা এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে প্রাণঘাতী সংঘর্ষ এবং পাকিস্তানের বিমান হামলার ঘটনা ঘটে।

ইসলামাবাদের দাবি, সীমান্তপারের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো পাকিস্তানে হামলা বাড়াচ্ছে এবং সেগুলো দমনে কাবুল কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। অন্যদিকে আফগান তালেবান সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে উল্টো পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তথাকথিত আইএসআইএল–ঘনিষ্ঠ যোদ্ধাদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ তোলে।

হতাহতের পরিসংখ্যান নিয়ে পাল্টাপাল্টি দাবি

সাম্প্রতিক লড়াইয়ে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে দুই পক্ষ ভিন্ন ভিন্ন দাবি করেছে। পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার জানিয়েছেন, ১৩৩ তালেবান যোদ্ধা নিহত এবং দুই শতাধিক আহত হয়েছে। অন্যদিকে আফগান তালেবান সরকারের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ দাবি করেন, তাদের আটজন নিহত ও ১১ জন আহত হয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি পাল্টা হামলায় ৫৫ পাকিস্তানি সেনা নিহত এবং ১৯টি সামরিক পোস্ট দখলের কথাও উল্লেখ করেন। তবে পাকিস্তান জানিয়েছে, তাদের দুই নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছেন।

আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, ডুরান্ড লাইনের বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বড় পরিসরে অভিযান চালানো হয়, যা প্রায় চার ঘণ্টা স্থায়ী ছিল এবং নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনের পর তা বন্ধ করা হয়।

বিমান হামলা সীমান্ত উত্তেজনা

পাকিস্তানের দাবি, সাম্প্রতিক কয়েকটি আত্মঘাতী হামলা ও নিরাপত্তা চৌকিতে আক্রমণের জেরে তারা আফগানিস্তানের ভেতরে বিমান হামলা চালিয়েছে। কাবুল, কান্দাহার ও পাকতিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় হামলার খবর পাওয়া গেছে। আফগানিস্তান বলছে, এসব হামলায় বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে এবং তারা পাল্টা জবাব দিয়েছে।

সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ তোরখাম ক্রসিং-এর কাছেও গোলাগুলি ও গোলাবর্ষণের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।

সামরিক সক্ষমতায় বড় ব্যবধান

সামরিক শক্তির বিচারে দুই দেশের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। পাকিস্তানের সেনাসদস্য সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার; রয়েছে আধুনিক যুদ্ধবিমান, বিপুলসংখ্যক সাঁজোয়া যান এবং পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার। বিপরীতে আফগানিস্তানের বিমান সক্ষমতা সীমিত এবং অধিকাংশ সামরিক সরঞ্জাম পুরোনো।

আন্তর্জাতিক উদ্বেগ

সংঘাত পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। জাতিসংঘ-এর মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি ইরান ও রাশিয়া দ্রুত সীমান্ত হামলা বন্ধ করে সংলাপের মাধ্যমে বিরোধ মেটানোর তাগিদ দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, উত্তেজনা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হতে পারে। ফলে চীনের মধ্যস্থতার উদ্যোগ এখন পরিস্থিতি প্রশমনে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই দেখার বিষয়।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

পাকিস্তান–আফগানিস্তান সীমান্তে উত্তেজনা, মধ্যস্থতায় এগোচ্ছে চীন

Update Time : ০৩:০৪:১৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
শুক্রবার সকালে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যবর্তী তোরখাম সীমান্তে তালেবান সৈন্যরা, নাঙ্গারহার প্রদেশে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে তোরখাম সীমান্ত ক্রসিংয়ের কাছে তালেবান নিরাপত্তা কর্মীরা পাহারা দিচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

 

পাকিস্তান ও আফগানিস্তান-এর সীমান্তে ক্রমবর্ধমান সংঘাত পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে রূপ নিতে পারে—এমন আশঙ্কা বাড়ছে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। এ পরিস্থিতিতে উত্তেজনা প্রশমনে মধ্যস্থতার উদ্যোগ নিয়েছে চীন। বেইজিং জানিয়েছে, দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধিতে তারা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে সংকট নিরসনে গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে প্রস্তুত। খবর Al Jazeera।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, নিজস্ব কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে ইসলামাবাদ ও কাবুলের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সংলাপ ও আলোচনাকেই সর্বোত্তম পথ বলে মনে করে বেইজিং।

দোহা চুক্তির পরও উত্তেজনা

সাম্প্রতিক সংঘর্ষের পেছনে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা রয়েছে। গত বছরের অক্টোবরে কাতার ও তুরস্ক-এর মধ্যস্থতায় দোহায় বৈঠকের পর দুই দেশ সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। তবে তার আগে সীমান্তজুড়ে টানা এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে প্রাণঘাতী সংঘর্ষ এবং পাকিস্তানের বিমান হামলার ঘটনা ঘটে।

ইসলামাবাদের দাবি, সীমান্তপারের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো পাকিস্তানে হামলা বাড়াচ্ছে এবং সেগুলো দমনে কাবুল কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। অন্যদিকে আফগান তালেবান সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে উল্টো পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তথাকথিত আইএসআইএল–ঘনিষ্ঠ যোদ্ধাদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ তোলে।

হতাহতের পরিসংখ্যান নিয়ে পাল্টাপাল্টি দাবি

সাম্প্রতিক লড়াইয়ে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে দুই পক্ষ ভিন্ন ভিন্ন দাবি করেছে। পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার জানিয়েছেন, ১৩৩ তালেবান যোদ্ধা নিহত এবং দুই শতাধিক আহত হয়েছে। অন্যদিকে আফগান তালেবান সরকারের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ দাবি করেন, তাদের আটজন নিহত ও ১১ জন আহত হয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি পাল্টা হামলায় ৫৫ পাকিস্তানি সেনা নিহত এবং ১৯টি সামরিক পোস্ট দখলের কথাও উল্লেখ করেন। তবে পাকিস্তান জানিয়েছে, তাদের দুই নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছেন।

আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, ডুরান্ড লাইনের বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বড় পরিসরে অভিযান চালানো হয়, যা প্রায় চার ঘণ্টা স্থায়ী ছিল এবং নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনের পর তা বন্ধ করা হয়।

বিমান হামলা সীমান্ত উত্তেজনা

পাকিস্তানের দাবি, সাম্প্রতিক কয়েকটি আত্মঘাতী হামলা ও নিরাপত্তা চৌকিতে আক্রমণের জেরে তারা আফগানিস্তানের ভেতরে বিমান হামলা চালিয়েছে। কাবুল, কান্দাহার ও পাকতিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় হামলার খবর পাওয়া গেছে। আফগানিস্তান বলছে, এসব হামলায় বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে এবং তারা পাল্টা জবাব দিয়েছে।

সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ তোরখাম ক্রসিং-এর কাছেও গোলাগুলি ও গোলাবর্ষণের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।

সামরিক সক্ষমতায় বড় ব্যবধান

সামরিক শক্তির বিচারে দুই দেশের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। পাকিস্তানের সেনাসদস্য সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার; রয়েছে আধুনিক যুদ্ধবিমান, বিপুলসংখ্যক সাঁজোয়া যান এবং পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার। বিপরীতে আফগানিস্তানের বিমান সক্ষমতা সীমিত এবং অধিকাংশ সামরিক সরঞ্জাম পুরোনো।

আন্তর্জাতিক উদ্বেগ

সংঘাত পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। জাতিসংঘ-এর মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি ইরান ও রাশিয়া দ্রুত সীমান্ত হামলা বন্ধ করে সংলাপের মাধ্যমে বিরোধ মেটানোর তাগিদ দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, উত্তেজনা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হতে পারে। ফলে চীনের মধ্যস্থতার উদ্যোগ এখন পরিস্থিতি প্রশমনে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই দেখার বিষয়।