আস্থার সংকট, মূল্যস্ফীতি ও ঋণের চাপ: নতুন সরকারের সামনে কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতা
- Update Time : ০৩:০১:২৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / ২৪৪ Time View

নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দায়িত্ব নেওয়া নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে চাপগ্রস্ত ও মন্থর অর্থনীতি। গত দেড় বছরে প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে, বেসরকারি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি, কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়েছে এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। ফলে অর্থনীতিতে গতি ফেরানোর পাশাপাশি জনগণ ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠন—এই দুই লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করতে হবে সরকারকে।
সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বিভিন্ন সময়ে উল্লেখ করেছেন, অর্থনীতি একধরনের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার পথে আনার চেষ্টা হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতন কিছুটা ঠেকানো গেছে, প্রবাসী আয় বেড়েছে এবং ডলারের বাজারে চাপ কিছুটা কমেছে। তবে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি—এ কথাও তিনি স্বীকার করেছেন। তাঁর পরামর্শ ছিল—রাজস্ব আহরণ বাড়ানো ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং ব্যাংক খাতে শুরু হওয়া সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে।
আস্থা ও বিনিয়োগ পুনর্গঠন
ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট-এর নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তফা কে. মুজেরী মনে করেন, অর্থনীতির প্রধান সংকট এখন আস্থার ঘাটতি। গত ১৭-১৮ মাসে বিনিয়োগের গতি কমেছে, মূল্যস্ফীতি উচ্চমাত্রায় রয়েছে এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা প্রকট হয়েছে। তাঁর মতে, সব সমস্যা একসঙ্গে সমাধান করা সম্ভব নয়; বরং খাতভিত্তিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে ধাপে ধাপে সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে—বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে জোর দিতে হবে।
একইভাবে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-এর গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, নতুন সরকারের প্রথম কাজ হবে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনে দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনঃস্থাপন। সুদহার ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এনে একটি পূর্বানুমানযোগ্য নীতিপরিবেশ তৈরি না হলে বিনিয়োগ বাড়বে না। পাশাপাশি রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের অসামঞ্জস্য কমিয়ে ঋণের চাপ নিয়ন্ত্রণে আনাও জরুরি।
ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন (বিইএফ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)-এর নেতারা বলছেন, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ ও আইনশৃঙ্খলার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা না গেলে বিনিয়োগের গতি বাড়ানো কঠিন হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো এবং নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি।
মূল্যস্ফীতির দীর্ঘস্থায়ী চাপ
দেশে টানা কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। সাময়িকভাবে কিছুটা কমলেও তা সহনীয় পর্যায়ে নামেনি। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি আবারও বেড়েছে। রমজানকেন্দ্রিক পণ্যের চাহিদা বাড়ায় বাজারে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। যদিও ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকায় আমদানিকারকেরা তুলনামূলক সহজ শর্তে ঋণপত্র খুলতে পারছেন, তবু বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর নজরদারি ছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে।
ঋণের বোঝা ও রাজস্ব ঘাটতি
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ১৪ মাসে মোট দেশি-বিদেশি ঋণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। উন্নয়ন ব্যয় কমানো সত্ত্বেও রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়া, পূর্বের ঋণ পরিশোধের চাপ এবং পরিচালন ব্যয় কমাতে না পারা—এসব কারণে ঋণনির্ভরতা কমেনি। একই সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি দেখা গেছে, যা বাজেট বাস্তবায়নকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
এডিপি বাস্তবায়নে মন্থর গতি
চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়-এর বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের তথ্য বলছে, উন্নয়ন ব্যয়ে মন্থরতা সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। উন্নয়ন প্রকল্পে গতি না এলে কর্মসংস্থান ও অভ্যন্তরীণ চাহিদাও দুর্বল থাকবে।
ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাত
অর্থনীতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক খাত ব্যাংকিং ব্যবস্থা। কয়েকটি দুর্বল ব্যাংক একীভূত করা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও খেলাপি ঋণের পরিমাণ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, খেলাপি ঋণ কমানো, পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বায়ত্তশাসন শক্তিশালী করা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা আসবে না। ব্যাংক কোম্পানি আইন ও অর্থঋণ আদালত আইনে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন হয়নি—এগুলো নতুন সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকতে হবে।
সামনে পথচলা
নতুন সরকারের জন্য বাস্তবতা কঠিন হলেও সম্ভাবনাও রয়েছে। প্রবাসী আয় বৃদ্ধি, রপ্তানিতে স্থিতিশীলতা এবং নীতিগত সংস্কারের সুযোগ—এসবকে কাজে লাগাতে পারলে অর্থনীতিতে গতি ফিরতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট অগ্রাধিকার নির্ধারণ, ধারাবাহিক নীতিপরিবেশ, রাজস্ব সংস্কার, ব্যাংকিং খাতে কঠোর জবাবদিহি এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর তদারকি।
অর্থনীতির স্থবিরতা কাটিয়ে টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে হলে শুধু পরিসংখ্যানগত উন্নতি নয়—মানুষের আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ এবং বাজারে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। আস্থা পুনর্গঠনই হবে নতুন সরকারের সাফল্যের প্রধান সূচক।














