সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জুলাই যোদ্ধাদের ওপর হামলা: পুলিশের পোশাক বদলালেও কি আচরণ বদলায়নি?

বিল্লাল হোসেন
  • Update Time : ০৭:২৪:৩৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • / ১৭৬ Time View

 

রাজধানীর যমুনার সামনে শহীদ ওসমান হাদির বিচার দাবিতে জুলাই আন্দোলনের যোদ্ধারা শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিলেন। রাষ্ট্রের কাছে ন্যায়বিচার চাওয়া কোনো অপরাধ নয়; এটি সংবিধানস্বীকৃত একটি মৌলিক অধিকার। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিই মুহূর্তের মধ্যে রূপ নেয় সংঘর্ষে। পুলিশের লাঠিচার্জ, ধাওয়া এবং শারীরিক নির্যাতন আবারও নগ্নভাবে প্রমাণ করে দিল—ক্ষমতার মুখ বদলালেও চরিত্র বদলায়নি, শুধু পোশাক পাল্টেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই কর্মসূচিতে নারী, প্রবীণ নাগরিক এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকরাও উপস্থিত ছিলেন। তবুও পুলিশ নির্বিচারে হামলা চালায়, ভেঙে ফেলে ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড, কেড়ে নেয় মোবাইল ফোন, এমনকি নারী সাংবাদিকদের ওপর শারীরিকভাবে চড়াও হওয়ার অভিযোগও উঠে আসে। এসব দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও ক্ষতবিক্ষত আস্থার বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

অনলাইনে অনেকেই মন্তব্য করেছেন—“পুলিশের ইউনিফর্ম বদলেছে, কিন্তু আচরণ এখনো ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়কার মতোই।” এই মন্তব্য নিছক আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়; এটি দীর্ঘদিন ধরে সঞ্চিত অভিজ্ঞতা ও হতাশার প্রতিফলন। প্রশ্ন উঠছে—পুলিশ যদি সত্যিই জনগণের বাহিনী হয়, তবে ন্যায়বিচারের দাবি জানানো নাগরিকদের তারা কেন শত্রু হিসেবে দেখছে?

বাংলাদেশের সংবিধান স্পষ্টভাবে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। একইভাবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদে বলা হয়েছে—রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী কখনোই অযৌক্তিক বা অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নাগরিক অধিকার দমন করতে পারে না। অথচ যমুনার সামনে পুলিশের আচরণ ছিল এসব নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত। এটি শুধু ক্ষমতার অপব্যবহার নয়; এটি সরাসরি সংবিধান ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—একটি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও যদি পুলিশ আগের মতোই দমনমূলক ভূমিকা পালন করে, তাহলে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি কোথায়? ফ্যাসিবাদ কোনো নির্দিষ্ট সরকারের নাম নয়; এটি একটি আচরণ, একটি প্রশাসনিক চর্চা। সেই চর্চা যদি অব্যাহত থাকে, তবে রাষ্ট্রীয় সংস্কার কেবল কাগুজে প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। তারা হবে নাগরিকবান্ধব, ধৈর্যশীল ও আইনসম্মত। প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে সংলাপ হবে প্রথম পদক্ষেপ, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ন্যূনতম শক্তি প্রয়োগ হবে শেষ বিকল্প, আর সর্বোপরি মানবিকতা বজায় থাকবে। পুলিশের কাজ জনগণকে ভয় দেখানো নয়; জনগণের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষা করা।

যমুনার সামনে যারা ন্যায়ের দাবি জানিয়েছিলেন, তারা কেউ রাষ্ট্রের শত্রু নন। তারা শহীদ ওসমান হাদির মতো একজন নাগরিকের জন্য ন্যায়বিচার চেয়েছেন—যা একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সবচেয়ে স্বাভাবিক দাবি। সেই দাবিকে লাঠির জোরে দমন করা মানে রাষ্ট্র নিজেই তার নৈতিক ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা।

এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ী পুলিশ সদস্যদের জবাবদিহি এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হলে পুলিশের ওপর জনগণের আস্থা আরও ক্ষয়ে যাবে। আর আস্থাহীন পুলিশ কখনোই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রকৃত রক্ষক হতে পারে না।

 

একই পরিস্থিতিতে অন্যান্য দেশের পুলিশের আচরণ: বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে?

ন্যায়বিচারের দাবিতে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ—এটি শুধু বাংলাদেশের বাস্তবতা নয়; বিশ্বজুড়েই এটি একটি স্বীকৃত গণতান্ত্রিক চর্চা। প্রশ্ন হলো, একই পরিস্থিতিতে অন্যান্য দেশের পুলিশ কীভাবে আচরণ করে, আর সেই মানদণ্ডে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়?

যুক্তরাজ্যে কোনো নাগরিক যদি সরকারি ভবনের সামনে বিচার বা নীতিগত পরিবর্তনের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে, পুলিশের প্রথম দায়িত্ব হয় সংলাপ স্থাপন। মেট্রোপলিটন পুলিশ সাধারণত আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষায় বিশেষ লিয়াজোঁ অফিসার নিয়োগ করে। প্রতিবাদের রুট, সময়সীমা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয় আলোচনার মাধ্যমে। যতক্ষণ আন্দোলন শান্তিপূর্ণ থাকে, ততক্ষণ লাঠিচার্জ বা বলপ্রয়োগ প্রায় অকল্পনীয়—even পার্লামেন্ট স্কয়ারের মতো সংবেদনশীল এলাকাতেও।

জার্মানিতে পুলিশের আচরণ আরও কাঠামোবদ্ধ ও নীতিনির্ভর। সেখানে “প্রপোরশনালিটি প্রিন্সিপল” কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়—অর্থাৎ হুমকির মাত্রার সঙ্গে শক্তি প্রয়োগের মাত্রা সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। নারী, সাংবাদিক বা প্রবীণদের উপস্থিতিতে পুলিশের আচরণ আরও সংযত হয়। অযৌক্তিক বলপ্রয়োগ হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত ও শাস্তির নজির রয়েছে।

ভারতের ক্ষেত্রেও তুলনামূলক আলোচনা প্রাসঙ্গিক। যদিও সেখানে পুলিশের আচরণ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তবুও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনায় অনেক রাজ্যে “ক্রাউড কন্ট্রোল প্রোটোকল” চালু হয়েছে। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে সরাসরি লাঠিচার্জ নয়—প্রথমে সতর্কবার্তা, পরে ব্যারিকেড, এবং সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে সীমিত শক্তি প্রয়োগ। দিল্লির জনপথ কিংবা সংসদ ভবন এলাকায় বহু আন্দোলনে এর বাস্তব প্রয়োগ দেখা গেছে।

কানাডা ও নরওয়ের মতো দেশে পুলিশকে দেখা হয় সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে, ক্ষমতার বাহিনী হিসেবে নয়। পুলিশের ইউনিফর্ম যেমন শান্ত, আচরণও তেমন মানবিক। প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে কথোপকথন ও আস্থা তৈরির প্রবণতা বেশি, ফলে সহিংসতা খুব কমই ঘটে।

এই আন্তর্জাতিক বাস্তবতার আলোকে প্রশ্ন জাগে—বাংলাদেশে কেন এখনো প্রতিবাদ মানেই পুলিশের চোখে ‘শত্রু’? কেন সংলাপের বদলে লাঠি, সহনশীলতার বদলে দমন?

নেটিজেনদের ভাষায়, “সমস্যা পোশাকে নয়, সমস্যা মানসিকতায়।” ফ্যাসিবাদী শাসনামলে গড়ে ওঠা দমনমূলক পুলিশি সংস্কৃতি যদি ভাঙা না যায়, তাহলে সরকার বদলালেও রাষ্ট্রের চরিত্র বদলাবে না। অন্য দেশগুলো প্রমাণ করেছে—পুলিশ চাইলে জনগণের পাশে দাঁড়াতে পারে, ভয় নয় আস্থা তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশের পুলিশ যদি সত্যিই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বাহিনী হতে চায়, তবে তাদের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড থেকে শিক্ষা নিতে হবে। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে অপরাধ নয়, নাগরিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। অন্যথায় যমুনার সামনে জুলাই যোদ্ধাদের ওপর হামলার মতো ঘটনা বারবার ঘটবে—আর প্রতিবারই রাষ্ট্র তার নৈতিক বৈধতা থেকে আরও কিছুটা সরে যাবে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

বিল্লাল হোসেন

বিল্লাল হোসেন, একজন প্রজ্ঞাবান পেশাজীবী, যিনি গণিতের ওপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ, ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ হিসেবে একটি সমৃদ্ধ ও বহুমুখী ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন। তার আর্থিক খাতে যাত্রা তাকে নেতৃত্বের ভূমিকায় নিয়ে গেছে, বিশেষ করে সৌদি আরবের আল-রাজি ব্যাংকিং Inc. এবং ব্যাংক-আল-বিলাদে বিদেশী সম্পর্ক ও করেসপন্ডেন্ট মেইন্টেনেন্স অফিসার হিসেবে। প্রথাগত অর্থনীতির গণ্ডির বাইরে, বিল্লাল একজন প্রখ্যাত লেখক ও বিশ্লেষক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালে মননশীল কলাম ও গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করে। তার দক্ষতা বিস্তৃত বিষয় জুড়ে রয়েছে, যেমন অর্থনীতির জটিলতা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, প্রবাসী শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্ট, রেমিটেন্স, রিজার্ভ এবং অন্যান্য সম্পর্কিত দিক। বিল্লাল তার লেখায় একটি অনন্য বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসেন, যা ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে অর্জিত বাস্তব জ্ঞানকে একত্রিত করে একাডেমিক কঠোরতার সাথে। তার প্রবন্ধগুলো শুধুমাত্র জটিল বিষয়গুলির উপর গভীর বোঝাপড়ার প্রতিফলন নয়, বরং পাঠকদের জন্য জ্ঞানপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা তত্ত্ব ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। বিল্লাল হোসেনের অবদান তার প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করে যে, তিনি আমাদের আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বের জটিলতাগুলি উন্মোচন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের একটি বিস্তৃত এবং আরও সূক্ষ্ম বোঝাপড়ার দিকে মূল্যবান অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।

জুলাই যোদ্ধাদের ওপর হামলা: পুলিশের পোশাক বদলালেও কি আচরণ বদলায়নি?

Update Time : ০৭:২৪:৩৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

 

রাজধানীর যমুনার সামনে শহীদ ওসমান হাদির বিচার দাবিতে জুলাই আন্দোলনের যোদ্ধারা শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিলেন। রাষ্ট্রের কাছে ন্যায়বিচার চাওয়া কোনো অপরাধ নয়; এটি সংবিধানস্বীকৃত একটি মৌলিক অধিকার। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিই মুহূর্তের মধ্যে রূপ নেয় সংঘর্ষে। পুলিশের লাঠিচার্জ, ধাওয়া এবং শারীরিক নির্যাতন আবারও নগ্নভাবে প্রমাণ করে দিল—ক্ষমতার মুখ বদলালেও চরিত্র বদলায়নি, শুধু পোশাক পাল্টেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই কর্মসূচিতে নারী, প্রবীণ নাগরিক এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকরাও উপস্থিত ছিলেন। তবুও পুলিশ নির্বিচারে হামলা চালায়, ভেঙে ফেলে ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড, কেড়ে নেয় মোবাইল ফোন, এমনকি নারী সাংবাদিকদের ওপর শারীরিকভাবে চড়াও হওয়ার অভিযোগও উঠে আসে। এসব দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও ক্ষতবিক্ষত আস্থার বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

অনলাইনে অনেকেই মন্তব্য করেছেন—“পুলিশের ইউনিফর্ম বদলেছে, কিন্তু আচরণ এখনো ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়কার মতোই।” এই মন্তব্য নিছক আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়; এটি দীর্ঘদিন ধরে সঞ্চিত অভিজ্ঞতা ও হতাশার প্রতিফলন। প্রশ্ন উঠছে—পুলিশ যদি সত্যিই জনগণের বাহিনী হয়, তবে ন্যায়বিচারের দাবি জানানো নাগরিকদের তারা কেন শত্রু হিসেবে দেখছে?

বাংলাদেশের সংবিধান স্পষ্টভাবে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। একইভাবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদে বলা হয়েছে—রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী কখনোই অযৌক্তিক বা অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নাগরিক অধিকার দমন করতে পারে না। অথচ যমুনার সামনে পুলিশের আচরণ ছিল এসব নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত। এটি শুধু ক্ষমতার অপব্যবহার নয়; এটি সরাসরি সংবিধান ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—একটি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও যদি পুলিশ আগের মতোই দমনমূলক ভূমিকা পালন করে, তাহলে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি কোথায়? ফ্যাসিবাদ কোনো নির্দিষ্ট সরকারের নাম নয়; এটি একটি আচরণ, একটি প্রশাসনিক চর্চা। সেই চর্চা যদি অব্যাহত থাকে, তবে রাষ্ট্রীয় সংস্কার কেবল কাগুজে প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। তারা হবে নাগরিকবান্ধব, ধৈর্যশীল ও আইনসম্মত। প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে সংলাপ হবে প্রথম পদক্ষেপ, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ন্যূনতম শক্তি প্রয়োগ হবে শেষ বিকল্প, আর সর্বোপরি মানবিকতা বজায় থাকবে। পুলিশের কাজ জনগণকে ভয় দেখানো নয়; জনগণের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষা করা।

যমুনার সামনে যারা ন্যায়ের দাবি জানিয়েছিলেন, তারা কেউ রাষ্ট্রের শত্রু নন। তারা শহীদ ওসমান হাদির মতো একজন নাগরিকের জন্য ন্যায়বিচার চেয়েছেন—যা একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সবচেয়ে স্বাভাবিক দাবি। সেই দাবিকে লাঠির জোরে দমন করা মানে রাষ্ট্র নিজেই তার নৈতিক ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা।

এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ী পুলিশ সদস্যদের জবাবদিহি এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হলে পুলিশের ওপর জনগণের আস্থা আরও ক্ষয়ে যাবে। আর আস্থাহীন পুলিশ কখনোই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রকৃত রক্ষক হতে পারে না।

 

একই পরিস্থিতিতে অন্যান্য দেশের পুলিশের আচরণ: বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে?

ন্যায়বিচারের দাবিতে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ—এটি শুধু বাংলাদেশের বাস্তবতা নয়; বিশ্বজুড়েই এটি একটি স্বীকৃত গণতান্ত্রিক চর্চা। প্রশ্ন হলো, একই পরিস্থিতিতে অন্যান্য দেশের পুলিশ কীভাবে আচরণ করে, আর সেই মানদণ্ডে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়?

যুক্তরাজ্যে কোনো নাগরিক যদি সরকারি ভবনের সামনে বিচার বা নীতিগত পরিবর্তনের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে, পুলিশের প্রথম দায়িত্ব হয় সংলাপ স্থাপন। মেট্রোপলিটন পুলিশ সাধারণত আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষায় বিশেষ লিয়াজোঁ অফিসার নিয়োগ করে। প্রতিবাদের রুট, সময়সীমা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয় আলোচনার মাধ্যমে। যতক্ষণ আন্দোলন শান্তিপূর্ণ থাকে, ততক্ষণ লাঠিচার্জ বা বলপ্রয়োগ প্রায় অকল্পনীয়—even পার্লামেন্ট স্কয়ারের মতো সংবেদনশীল এলাকাতেও।

জার্মানিতে পুলিশের আচরণ আরও কাঠামোবদ্ধ ও নীতিনির্ভর। সেখানে “প্রপোরশনালিটি প্রিন্সিপল” কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়—অর্থাৎ হুমকির মাত্রার সঙ্গে শক্তি প্রয়োগের মাত্রা সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। নারী, সাংবাদিক বা প্রবীণদের উপস্থিতিতে পুলিশের আচরণ আরও সংযত হয়। অযৌক্তিক বলপ্রয়োগ হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত ও শাস্তির নজির রয়েছে।

ভারতের ক্ষেত্রেও তুলনামূলক আলোচনা প্রাসঙ্গিক। যদিও সেখানে পুলিশের আচরণ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তবুও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনায় অনেক রাজ্যে “ক্রাউড কন্ট্রোল প্রোটোকল” চালু হয়েছে। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে সরাসরি লাঠিচার্জ নয়—প্রথমে সতর্কবার্তা, পরে ব্যারিকেড, এবং সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে সীমিত শক্তি প্রয়োগ। দিল্লির জনপথ কিংবা সংসদ ভবন এলাকায় বহু আন্দোলনে এর বাস্তব প্রয়োগ দেখা গেছে।

কানাডা ও নরওয়ের মতো দেশে পুলিশকে দেখা হয় সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে, ক্ষমতার বাহিনী হিসেবে নয়। পুলিশের ইউনিফর্ম যেমন শান্ত, আচরণও তেমন মানবিক। প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে কথোপকথন ও আস্থা তৈরির প্রবণতা বেশি, ফলে সহিংসতা খুব কমই ঘটে।

এই আন্তর্জাতিক বাস্তবতার আলোকে প্রশ্ন জাগে—বাংলাদেশে কেন এখনো প্রতিবাদ মানেই পুলিশের চোখে ‘শত্রু’? কেন সংলাপের বদলে লাঠি, সহনশীলতার বদলে দমন?

নেটিজেনদের ভাষায়, “সমস্যা পোশাকে নয়, সমস্যা মানসিকতায়।” ফ্যাসিবাদী শাসনামলে গড়ে ওঠা দমনমূলক পুলিশি সংস্কৃতি যদি ভাঙা না যায়, তাহলে সরকার বদলালেও রাষ্ট্রের চরিত্র বদলাবে না। অন্য দেশগুলো প্রমাণ করেছে—পুলিশ চাইলে জনগণের পাশে দাঁড়াতে পারে, ভয় নয় আস্থা তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশের পুলিশ যদি সত্যিই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বাহিনী হতে চায়, তবে তাদের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড থেকে শিক্ষা নিতে হবে। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে অপরাধ নয়, নাগরিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। অন্যথায় যমুনার সামনে জুলাই যোদ্ধাদের ওপর হামলার মতো ঘটনা বারবার ঘটবে—আর প্রতিবারই রাষ্ট্র তার নৈতিক বৈধতা থেকে আরও কিছুটা সরে যাবে।