ঋণের ফাঁদে রাষ্ট্র: দায়ভার কার কাঁধে যাচ্ছে?
- Update Time : ১২:২০:২২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / ১৫৯ Time View

বাংলাদেশের অর্থনীতির আকাশে এখন আর বিচ্ছিন্ন মেঘ নয়, বরং ঘন কালো মেঘের সমাবেশ। টানা ছয় মাস ধরে রপ্তানি আয় নিম্নমুখী, জানুয়ারি মাসে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সংকট, টাকার অবমূল্যায়ন এবং তথাকথিত ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের ক্ষয়—সব মিলিয়ে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি এক গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে প্রবেশ করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরকারের লাগাতার ঋণ গ্রহণের প্রবণতা, যা এখন আর উন্নয়নের সহায়ক নয়, বরং অর্থনৈতিক ঝুঁকির প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক মিলিত সরকারি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় ২২ ট্রিলিয়ন টাকারও বেশি। মাত্র দেড় দশক আগেও যেখানে এই ঋণ ছিল তুলনামূলকভাবে সীমিত, সেখানে আজ তা একটি নিয়ন্ত্রণহীন পাহাড়ে রূপ নিয়েছে। অপরিকল্পিত মেগা প্রকল্প, দুর্বল রাজস্ব কাঠামো এবং বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর অতিনির্ভরশীলতাই এই ঋণস্ফীতির মূল চালিকাশক্তি।
অর্থনীতির ধ্রুপদী তত্ত্ব অনুযায়ী, সরকারি ঋণ কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়; এটি ভবিষ্যতের করব্যবস্থার পূর্বাভাস। ডেভিড রিকার্ডোর ‘রিকার্ডিয়ান ইকুইভ্যালেন্স’ ধারণা অনুযায়ী, আজকের ঋণ মানেই আগামী দিনের নাগরিকদের ওপর বাড়তি করের বোঝা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর অর্থ হলো—বর্তমান প্রজন্মের ভোগের বিনিময়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ক্রয়ক্ষমতা বন্ধক রাখা। আজকের উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি কার্যত সেই ঋণেরই আগাম মূল্য, যাকে অর্থনীতিবিদরা ‘অদৃশ্য কর’ বলে আখ্যা দেন।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি ‘ঋণের ফাঁদ’ তত্ত্ব দিয়েও ব্যাখ্যা করা যায়। যখন একটি রাষ্ট্র নতুন করে ঋণ নেয় পুরোনো ঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধের জন্য, তখন সে একটি আত্মঘাতী চক্রে প্রবেশ করে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে সরকারের নেওয়া বিপুল ঋণের বড় অংশই ব্যয় হচ্ছে আগের দায় শোধে। অর্থবছরের প্রথম ভাগেই বিদেশি ঋণ পরিশোধ দুই বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়া এবং সামনে গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ার বাস্তবতা শ্রীলঙ্কার দেউলিয়া হওয়ার স্মৃতি নতুন করে উসকে দেয়।
শ্রীলঙ্কার মতো বাংলাদেশও একসময় উচ্চাভিলাষী অবকাঠামো প্রকল্পে ঝুঁকে পড়ে, কিন্তু রাজস্ব বাড়াতে ব্যর্থ হয়। পার্থক্য এই যে, বাংলাদেশ এখনো সেই চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছায়নি। কিন্তু টানা রপ্তানি পতন, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং বাড়তে থাকা ঋণপরিশোধের চাপ একসঙ্গে রাষ্ট্রীয় দেউলিয়াত্বের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। আর প্রতিবারের মতো এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ।
সমাজবিজ্ঞানের আলোকে এই ঋণব্যবস্থাকে ‘কাঠামোগত সহিংসতা’ হিসেবে দেখা যায়। যখন রাষ্ট্র তার মোট আয়ের এক-পঞ্চমাংশের বেশি কেবল সুদ পরিশোধে ব্যয় করে, তখন শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো মৌলিক খাতগুলো স্বাভাবিকভাবেই সংকুচিত হয়। সাম্প্রতিক বাজেটে সুদ পরিশোধের ব্যয় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দকে ছাড়িয়ে যাওয়াই তার প্রমাণ। নরওয়েজীয় সমাজবিজ্ঞানী ইয়োহান গালতুংয়ের ভাষায়, এটি এমন এক সহিংসতা যেখানে কোনো অস্ত্র নেই, কিন্তু মানুষের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হয়।
এই প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক বৈষম্যকে আরও তীব্র করে তোলে। দরিদ্র জনগোষ্ঠী শিক্ষা ও চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়, ফলে প্রজন্মান্তরে দারিদ্র্যের চক্র অব্যাহত থাকে। দার্শনিক জন রলসের ‘প্রজন্মগত ন্যায়বিচার’ ধারণা অনুযায়ী, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর আজকের সিদ্ধান্তের বোঝা চাপানো নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য। অথচ বাংলাদেশের প্রতিটি নবজাতক আজ জন্ম নিচ্ছে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের সরকারি ঋণের দায় মাথায় নিয়ে।
রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার সামাজিক চুক্তির দৃষ্টিকোণ থেকেও এই পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। নাগরিকরা কর দেয় রাষ্ট্রের সেবা পাওয়ার আশায়। কিন্তু যখন কর-জিডিপি অনুপাত স্থবির থেকে যায়, ধনীদের কার্যকরভাবে করের আওতায় আনা হয় না এবং ভ্যাটের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়ানো হয়, তখন সেই চুক্তি ভেঙে পড়ে। উপরন্তু সরকার যখন ব্যাংক খাত থেকে বিপুল ঋণ নেয়, তখন ‘ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট’-এর কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ সংকুচিত হয়।
এর ফল হলো—নতুন শিল্প স্থাপন কমে যায়, কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি থেমে যায় এবং উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হন। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ বাড়ে, সাধারণ আমানতকারীদের সঞ্চয় ঝুঁকিতে পড়ে। রাষ্ট্র যখন নিজের ব্যর্থতা আড়াল করতে জনগণের আমানতকে ঋণের উৎস হিসেবে ব্যবহার করে, তখন তা আর উন্নয়ন নয়, বরং পরোক্ষ শোষণের নামান্তর।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও এই বাস্তবতার সাক্ষ্য দেয়। যুক্তরাষ্ট্র বিপুল ঋণ নিয়েও টিকে আছে তার মুদ্রার বৈশ্বিক প্রভাব ও উৎপাদন শক্তির কারণে, যদিও সেখানেও মূল্যস্ফীতি ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা বাড়ছে। চীনে অতিরিক্ত ঋণ রিয়েল এস্টেট সংকট ও যুব বেকারত্ব বাড়িয়েছে। আর গ্রিসের ক্ষেত্রে ঋণের বোঝা দেশটিকে কঠোর মিতব্যয়ী নীতির অধীনে ঠেলে দিয়েছিল, যার সামাজিক মূল্য ছিল ভয়াবহ।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এসব উদাহরণ সতর্কবার্তা। রপ্তানি আয় কমে যাওয়া এবং ঋণের সুদ বাড়তে থাকা—এই দুইয়ের চাপে যদি দেশ তার অর্থনৈতিক স্বাধীনতা হারায়, তবে তা কেবল আর্থিক নয়, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বেরও সংকট।
নির্ভরশীলতা তত্ত্ব অনুযায়ী, বিদেশি ঋণের শর্ত যখন ঋণদাতা দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়, তখন তা নব্য উপনিবেশিক কাঠামো তৈরি করে। অনেক মেগা প্রকল্পে ঋণের অর্থ আবার ঠিকাদারি ও সরঞ্জামের মাধ্যমে ঋণদাতা দেশেই ফিরে যায়। বাংলাদেশের জন্য থেকে যায় শুধু সুদের দায়। যদি এসব প্রকল্পের অর্থনৈতিক প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত না হয়, তবে সেগুলো ভবিষ্যতের জন্য ‘শ্বেতহস্তী’ হয়ে উঠবে।
এই সংকট থেকে উত্তরণ সহজ নয়। নতুন ঋণ নিয়ে পুরোনো দায় মেটানো কোনো সমাধান নয়। প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক কাঠামোর গভীর সংস্কার। রাজস্ব ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, দুর্নীতি দমন, প্রকল্প ব্যয়ের স্বচ্ছতা এবং উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ ছাড়া ঋণনির্ভর উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। অন্যথায় এই ঋণ কেবল একটি ক্ষুদ্র সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর সম্পদ বাড়াবে এবং রাষ্ট্র পরিণত হবে অলিগার্কির হাতিয়ার হিসেবে।
শোষণমুক্ত সমাজের যে স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশের জন্ম, লাগামহীন ঋণপ্রবৃদ্ধি সেই আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত। এখন সময় এসেছে প্রতিটি ঋণের নৈতিকতা ও কার্যকারিতা প্রশ্ন করার। জনগণের সম্পদ জনগণের কল্যাণে ব্যবহারের নিশ্চয়তা না দিলে উন্নয়নের গল্প কেবল সংখ্যার খেলাই থেকে যাবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমরা এই ঋণের ভয়াল চক্র ভাঙার সাহস দেখাতে পারি কি না, তার ওপরই।














