সময়: রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চট্টগ্রাম বন্দরে অচলাবস্থা: নেই রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া, নেই নীতিনির্ধারকদের মাথাব্যথা

বিল্লাল হোসেন
  • Update Time : ০৭:৩৫:৫৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • / ১৮৭ Time View

দেশের অর্থনীতির প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর আজ কার্যত স্তব্ধ। ইঞ্জিনের গর্জন নেই, নেই পণ্যবাহী ট্রাকের চিরচেনা জট, নেই শ্রমিকদের ব্যস্ত পদচারণা। বরং পুরো বন্দরজুড়ে নেমে এসেছে এক ভয়াবহ ভূতুড়ে নীরবতা—যা যেন দেশের আমদানি-রপ্তানি ব্যবস্থার অচলাবস্থার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শ্রমিক-কর্মচারীদের টানা কর্মবিরতিতে দেশের প্রধান তিনটি টার্মিনাল জনশূন্য হয়ে পড়েছে।

গত বুধবার সরেজমিনে চট্টগ্রাম বন্দরে গিয়ে দেখা যায়, জেটিতে দাঁড়িয়ে থাকা বিশালাকার গ্যান্ট্রি ক্রেনগুলো আকাশের দিকে মুখ করে স্থির হয়ে আছে—যেন দেশের অর্থনীতির শিরায় রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। টার্মিনালের ভেতরে আধুনিক যন্ত্রপাতি অলস পড়ে আছে, কোনো পণ্য ওঠানামা নেই। জেটিতে থাকা ১৪টি জাহাজ পণ্য খালাস করতে না পেরে আটকা পড়েছে। অথচ স্বাভাবিক সময়ে ২৪ ঘণ্টা সচল থাকত জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি), চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও এনসিটি।

জানা গেছে, গত মঙ্গলবার থেকে নতুন কোনো জাহাজ জেটিতে ভেড়ানো সম্ভব হয়নি। এমনকি যেসব জাহাজ বহির্নোঙরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিল, সেগুলোও বন্দর ত্যাগ করতে পারেনি। আন্দোলনরত শ্রমিকরা বন্দরের প্রতিটি প্রবেশপথে শক্ত অবস্থান নেওয়ায় কোনো শ্রমিক কাজে যোগ দিতে পারেননি। ফলে জেটি থেকে ইয়ার্ড—সর্বত্রই জনমানবশূন্যতা।

স্বাভাবিক সময়ে বন্দরের ৪ নম্বর গেটের সামনে আমদানি-রপ্তানি পণ্যবাহী লরি ও ট্রেইলারের দীর্ঘ সারি চোখে পড়ে। কিন্তু বুধবার গেটের দুই পাশই ছিল তালাবদ্ধ। মাঝে মধ্যে দু-একটি ব্যক্তিগত গাড়ি যাতায়াতের জন্য ছোট দরজা খুললেও পণ্যবাহী কোনো যানবাহনের দেখা মেলেনি। এদিন পর্যন্ত জেটি ও বহির্নোঙরে আটকা পড়েছে মোট ১৪২টি জাহাজ।

এই জাহাজগুলোর একটি বড় অংশে রয়েছে চিনি, ভোজ্যতেল ও ডালের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। আমদানিকারকরা আশঙ্কা করছেন, এভাবে টার্মিনাল অচল থাকলে দেশের সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়বে এবং বাজারে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। সামনে রমজান মাস—এই সময়ে পণ্য সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ আরও বাড়বে।

পরিসংখ্যান আরও ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। বেসরকারি ডিপোগুলোয় গতকাল পর্যন্ত ১০ হাজার ৮১৭ টিইইউস (২০ ফুট দৈর্ঘ্যের কনটেইনার একক) রপ্তানি কনটেইনার আটকা ছিল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশি জাহাজগুলো যদি পণ্য না নিয়েই বন্দর ত্যাগ করতে শুরু করে, তবে তৈরি পোশাক খাতের শত শত কোটি টাকার রপ্তানি আদেশ বাতিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

স্বাভাবিক সময়ে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে প্রতিদিন গড়ে পাঁচ হাজার টিইইউস কনটেইনার খালাস হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে যায়। কিন্তু কর্মবিরতি শুরুর পর সেই চিত্র নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। শনিবার কনটেইনার খালাস নেমে আসে এক হাজার ৭৫০ টিইইউসে। রোববার ও সোমবার তা আরও কমে দাঁড়ায় এক হাজার ৬৮৪ ও এক হাজার ২৩০ টিইইউসে। বুধবার বন্দরে মোট কনটেইনারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৩১২ টিইইউসে।

রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রেও চরম ধাক্কা লেগেছে। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস দেশের মোট রাজস্ব আয়ের একটি বিশাল অংশ জোগান দেয়। প্রতিদিন গড়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা থাকে প্রায় ১৭০ কোটি টাকা। কিন্তু চলমান কর্মবিরতির কারণে দৈনিক রাজস্ব আদায় প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে।

বন্দরের ধারণক্ষমতা যেখানে প্রায় ৫৯ হাজার কনটেইনার, সেখানে বর্তমানে জেটি, টার্মিনাল ও বহির্নোঙরে আটকা পড়েছে ৫২ হাজার ৪৯৬ টিইইউস কনটেইনার। এর মধ্যে খালি কনটেইনারের জট সবচেয়ে ভয়াবহ, যার সংখ্যা একই অঙ্কে পৌঁছেছে। প্রধান তিনটি টার্মিনালের জেটিতে গত মঙ্গলবার থেকে ১৪টি জাহাজ (১০টি কনটেইনারবাহী ও চারটি খোলা পণ্যবাহী) নড়তে পারেনি।

বেসরকারি ডিপো বা অফডকগুলো থেকেও রপ্তানি কার্যক্রম অর্ধেকে নেমে এসেছে। যেখানে প্রতিদিন গড়ে দুই হাজার ৮০০টি রপ্তানি কনটেইনার বন্দরে পাঠানো হতো, সেখানে এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৪০০টিতে। ২১টি বেসরকারি ডিপোতে আটকা রয়েছে ১০ হাজার ৮১৭ টিইইউস রপ্তানি পণ্য এবং সাত হাজার ৯১০ টিইইউস আমদানি পণ্য।

ডিপো মালিক সমিতির (বিকডা) মহাসচিব রুহুল আমিন শিকদার বলেন, টানা ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতির ফলে সংকট দিন দিন গভীর হচ্ছে। সময়মতো রপ্তানি কনটেইনার পাঠাতে না পারলে বিদেশি জাহাজ পণ্য না নিয়েই বন্দর ছাড়বে, যা তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য মারাত্মক সংকট ডেকে আনবে।

এদিকে আন্দোলনের মুখে বন্দর কর্তৃপক্ষ ৩১ জন শ্রমিক-কর্মচারীকে মোংলা ও পায়রা বন্দরে বদলি করলেও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি; বরং আন্দোলন আরও তীব্র হয়েছে। বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। এনসিটি ইজারা বাতিল এবং বদলি করা কর্মচারীদের আদেশ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত টার্মিনালগুলো এভাবেই জনশূন্য থাকবে।”

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই ভয়াবহ অর্থনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যেও কোনো বড় রাজনৈতিক দলের জোরালো বক্তব্য নেই, নেই নীতিনির্ধারকদের দৃশ্যমান উদ্যোগ। দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড যখন থমকে দাঁড়িয়েছে, তখন রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল মহলের এই নীরবতা নতুন করে প্রশ্ন তুলছে—চট্টগ্রাম বন্দর কি কেবল শ্রমিকদের আন্দোলনের জিম্মি, নাকি নীতিগত উদাসীনতারও শিকার?

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

বিল্লাল হোসেন

বিল্লাল হোসেন, একজন প্রজ্ঞাবান পেশাজীবী, যিনি গণিতের ওপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ, ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ হিসেবে একটি সমৃদ্ধ ও বহুমুখী ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন। তার আর্থিক খাতে যাত্রা তাকে নেতৃত্বের ভূমিকায় নিয়ে গেছে, বিশেষ করে সৌদি আরবের আল-রাজি ব্যাংকিং Inc. এবং ব্যাংক-আল-বিলাদে বিদেশী সম্পর্ক ও করেসপন্ডেন্ট মেইন্টেনেন্স অফিসার হিসেবে। প্রথাগত অর্থনীতির গণ্ডির বাইরে, বিল্লাল একজন প্রখ্যাত লেখক ও বিশ্লেষক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালে মননশীল কলাম ও গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করে। তার দক্ষতা বিস্তৃত বিষয় জুড়ে রয়েছে, যেমন অর্থনীতির জটিলতা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, প্রবাসী শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্ট, রেমিটেন্স, রিজার্ভ এবং অন্যান্য সম্পর্কিত দিক। বিল্লাল তার লেখায় একটি অনন্য বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসেন, যা ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে অর্জিত বাস্তব জ্ঞানকে একত্রিত করে একাডেমিক কঠোরতার সাথে। তার প্রবন্ধগুলো শুধুমাত্র জটিল বিষয়গুলির উপর গভীর বোঝাপড়ার প্রতিফলন নয়, বরং পাঠকদের জন্য জ্ঞানপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা তত্ত্ব ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। বিল্লাল হোসেনের অবদান তার প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করে যে, তিনি আমাদের আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বের জটিলতাগুলি উন্মোচন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের একটি বিস্তৃত এবং আরও সূক্ষ্ম বোঝাপড়ার দিকে মূল্যবান অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।

চট্টগ্রাম বন্দরে অচলাবস্থা: নেই রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া, নেই নীতিনির্ধারকদের মাথাব্যথা

Update Time : ০৭:৩৫:৫৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

দেশের অর্থনীতির প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর আজ কার্যত স্তব্ধ। ইঞ্জিনের গর্জন নেই, নেই পণ্যবাহী ট্রাকের চিরচেনা জট, নেই শ্রমিকদের ব্যস্ত পদচারণা। বরং পুরো বন্দরজুড়ে নেমে এসেছে এক ভয়াবহ ভূতুড়ে নীরবতা—যা যেন দেশের আমদানি-রপ্তানি ব্যবস্থার অচলাবস্থার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শ্রমিক-কর্মচারীদের টানা কর্মবিরতিতে দেশের প্রধান তিনটি টার্মিনাল জনশূন্য হয়ে পড়েছে।

গত বুধবার সরেজমিনে চট্টগ্রাম বন্দরে গিয়ে দেখা যায়, জেটিতে দাঁড়িয়ে থাকা বিশালাকার গ্যান্ট্রি ক্রেনগুলো আকাশের দিকে মুখ করে স্থির হয়ে আছে—যেন দেশের অর্থনীতির শিরায় রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। টার্মিনালের ভেতরে আধুনিক যন্ত্রপাতি অলস পড়ে আছে, কোনো পণ্য ওঠানামা নেই। জেটিতে থাকা ১৪টি জাহাজ পণ্য খালাস করতে না পেরে আটকা পড়েছে। অথচ স্বাভাবিক সময়ে ২৪ ঘণ্টা সচল থাকত জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি), চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও এনসিটি।

জানা গেছে, গত মঙ্গলবার থেকে নতুন কোনো জাহাজ জেটিতে ভেড়ানো সম্ভব হয়নি। এমনকি যেসব জাহাজ বহির্নোঙরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিল, সেগুলোও বন্দর ত্যাগ করতে পারেনি। আন্দোলনরত শ্রমিকরা বন্দরের প্রতিটি প্রবেশপথে শক্ত অবস্থান নেওয়ায় কোনো শ্রমিক কাজে যোগ দিতে পারেননি। ফলে জেটি থেকে ইয়ার্ড—সর্বত্রই জনমানবশূন্যতা।

স্বাভাবিক সময়ে বন্দরের ৪ নম্বর গেটের সামনে আমদানি-রপ্তানি পণ্যবাহী লরি ও ট্রেইলারের দীর্ঘ সারি চোখে পড়ে। কিন্তু বুধবার গেটের দুই পাশই ছিল তালাবদ্ধ। মাঝে মধ্যে দু-একটি ব্যক্তিগত গাড়ি যাতায়াতের জন্য ছোট দরজা খুললেও পণ্যবাহী কোনো যানবাহনের দেখা মেলেনি। এদিন পর্যন্ত জেটি ও বহির্নোঙরে আটকা পড়েছে মোট ১৪২টি জাহাজ।

এই জাহাজগুলোর একটি বড় অংশে রয়েছে চিনি, ভোজ্যতেল ও ডালের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। আমদানিকারকরা আশঙ্কা করছেন, এভাবে টার্মিনাল অচল থাকলে দেশের সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়বে এবং বাজারে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। সামনে রমজান মাস—এই সময়ে পণ্য সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ আরও বাড়বে।

পরিসংখ্যান আরও ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। বেসরকারি ডিপোগুলোয় গতকাল পর্যন্ত ১০ হাজার ৮১৭ টিইইউস (২০ ফুট দৈর্ঘ্যের কনটেইনার একক) রপ্তানি কনটেইনার আটকা ছিল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশি জাহাজগুলো যদি পণ্য না নিয়েই বন্দর ত্যাগ করতে শুরু করে, তবে তৈরি পোশাক খাতের শত শত কোটি টাকার রপ্তানি আদেশ বাতিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

স্বাভাবিক সময়ে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে প্রতিদিন গড়ে পাঁচ হাজার টিইইউস কনটেইনার খালাস হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে যায়। কিন্তু কর্মবিরতি শুরুর পর সেই চিত্র নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। শনিবার কনটেইনার খালাস নেমে আসে এক হাজার ৭৫০ টিইইউসে। রোববার ও সোমবার তা আরও কমে দাঁড়ায় এক হাজার ৬৮৪ ও এক হাজার ২৩০ টিইইউসে। বুধবার বন্দরে মোট কনটেইনারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৩১২ টিইইউসে।

রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রেও চরম ধাক্কা লেগেছে। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস দেশের মোট রাজস্ব আয়ের একটি বিশাল অংশ জোগান দেয়। প্রতিদিন গড়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা থাকে প্রায় ১৭০ কোটি টাকা। কিন্তু চলমান কর্মবিরতির কারণে দৈনিক রাজস্ব আদায় প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে।

বন্দরের ধারণক্ষমতা যেখানে প্রায় ৫৯ হাজার কনটেইনার, সেখানে বর্তমানে জেটি, টার্মিনাল ও বহির্নোঙরে আটকা পড়েছে ৫২ হাজার ৪৯৬ টিইইউস কনটেইনার। এর মধ্যে খালি কনটেইনারের জট সবচেয়ে ভয়াবহ, যার সংখ্যা একই অঙ্কে পৌঁছেছে। প্রধান তিনটি টার্মিনালের জেটিতে গত মঙ্গলবার থেকে ১৪টি জাহাজ (১০টি কনটেইনারবাহী ও চারটি খোলা পণ্যবাহী) নড়তে পারেনি।

বেসরকারি ডিপো বা অফডকগুলো থেকেও রপ্তানি কার্যক্রম অর্ধেকে নেমে এসেছে। যেখানে প্রতিদিন গড়ে দুই হাজার ৮০০টি রপ্তানি কনটেইনার বন্দরে পাঠানো হতো, সেখানে এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৪০০টিতে। ২১টি বেসরকারি ডিপোতে আটকা রয়েছে ১০ হাজার ৮১৭ টিইইউস রপ্তানি পণ্য এবং সাত হাজার ৯১০ টিইইউস আমদানি পণ্য।

ডিপো মালিক সমিতির (বিকডা) মহাসচিব রুহুল আমিন শিকদার বলেন, টানা ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতির ফলে সংকট দিন দিন গভীর হচ্ছে। সময়মতো রপ্তানি কনটেইনার পাঠাতে না পারলে বিদেশি জাহাজ পণ্য না নিয়েই বন্দর ছাড়বে, যা তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য মারাত্মক সংকট ডেকে আনবে।

এদিকে আন্দোলনের মুখে বন্দর কর্তৃপক্ষ ৩১ জন শ্রমিক-কর্মচারীকে মোংলা ও পায়রা বন্দরে বদলি করলেও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি; বরং আন্দোলন আরও তীব্র হয়েছে। বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। এনসিটি ইজারা বাতিল এবং বদলি করা কর্মচারীদের আদেশ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত টার্মিনালগুলো এভাবেই জনশূন্য থাকবে।”

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই ভয়াবহ অর্থনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যেও কোনো বড় রাজনৈতিক দলের জোরালো বক্তব্য নেই, নেই নীতিনির্ধারকদের দৃশ্যমান উদ্যোগ। দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড যখন থমকে দাঁড়িয়েছে, তখন রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল মহলের এই নীরবতা নতুন করে প্রশ্ন তুলছে—চট্টগ্রাম বন্দর কি কেবল শ্রমিকদের আন্দোলনের জিম্মি, নাকি নীতিগত উদাসীনতারও শিকার?