সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Justice Delayed is Justice Denied শহীদ ওসমান হাদি ও ন্যায়বিচারের দীর্ঘশ্বাস

বিল্লাল হোসেন
  • Update Time : ১১:৩৯:০০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬
  • / ১৮৫ Time View

 

“Justice delayed is justice denied”—ন্যায়বিচার বিলম্বিত হলে তা আর ন্যায়বিচার থাকে না; তা হয়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় অবহেলা, ক্ষমতার নিষ্ঠুরতা এবং ভুক্তভোগীদের প্রতি নির্মম তামাশা। আজ বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার দিকে তাকালে এই কথাটিই সবচেয়ে বেশি সত্য বলে মনে হয়। শহীদ শরিফ ওসমান হাদি—এই সময়ের এক প্রতীকী নাম—যার বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁর স্ত্রী রাবেয়া ইসলাম শম্পা। সেই প্রশ্ন আসলে শুধু একজন স্ত্রীর নয়; এটি পুরো জাতির দীর্ঘদিনের আর্তনাদ।

বুধবার (২১ জানুয়ারি) সকালে ফেসবুকে দেওয়া এক হৃদয়বিদারক পোস্টে শম্পা লিখেছেন, রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরি? শহীদ ওসমান হাদির বিচারের কত দেরি?”—এই প্রশ্ন আজ বাংলাদেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের প্রশ্ন। কারণ, এ দেশে বিচার চাওয়া মানেই যেন এক অনন্ত অপেক্ষার নাম।

ইতিহাস আমাদের সামনে নির্মম সত্য তুলে ধরে। সাগর–রুনি হত্যাকাণ্ড—বছরের পর বছর পার হলেও বিচার অধরা। আবরার ফাহাদ—একটি তরুণ প্রাণ, যার হত্যাকাণ্ড দেশ কাঁপাল, কিন্তু বিচার প্রক্রিয়া আজও পূর্ণতার মুখ দেখেনি। আর এখন সেই তালিকায় যুক্ত হচ্ছে শহীদ ওসমান হাদি। প্রতিবারই একই চিত্র—তদন্তের নামে সময়ক্ষেপণ, তারিখের পর তারিখ, আর শেষে জনগণের ক্লান্তি।

রাবেয়া ইসলাম শম্পার বক্তব্যে সবচেয়ে শক্তিশালী যে কথাটি উঠে এসেছে, তা হলো—হাদি কেবল একটি পরিবারের সম্পত্তি নয়, তিনি সারা বাংলাদেশের। তাঁর রক্তের দায় রাষ্ট্র এড়াতে পারে না। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, ক্ষতিপূরণ, অনুদান বা সাময়িক সহানুভূতি দিয়ে বিচার থামিয়ে দেওয়া যাবে না। বিচারহীনতা ঢাকতে ‘দেওয়া-নেওয়ার রাজনীতি’ করলে সেটাই হবে সবচেয়ে বড় ভুল।

এই রাষ্ট্র যদি শহীদ ওসমান হাদির হত্যার বিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে এর ফল হবে ভয়াবহ। মানুষ আর কাঁদবে না, রাস্তায় নামবে না, প্রতিবাদ করবে না—কারণ তারা বিশ্বাস হারাবে। আর একটি রাষ্ট্রের জন্য নাগরিকের বিশ্বাস হারানো মানেই নৈতিক দেউলিয়াত্ব।

শম্পা তাঁর লেখায় আরও স্পষ্ট করেছেন—সরকার কী দিচ্ছে বা দিচ্ছে না, তা তাঁর আগ্রহের বিষয় নয়। তাঁর একমাত্র দাবি, যেকোনো মূল্যে তাঁর স্বামীর হত্যার বিচার এবং তাঁর ছেলে ফিরনাসের নিরাপদ ভবিষ্যৎ। এই দাবির মধ্যে কোনো রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই, নেই ব্যক্তিগত সুবিধার লোভ—এটি নিখাদ ন্যায়বিচারের দাবি।

আজ প্রশ্ন একটাই—কত মাস, কত দিন, কত ঘণ্টা লাগবে বিচার শুরু করতে? রাষ্ট্র কি আবারও সময়ের আড়ালে লুকাবে? নাকি এইবার প্রমাণ করবে, বাংলাদেশে ন্যায়বিচার শুধু বইয়ের পাতায় নয়, বাস্তবেও আছে?

শহীদ ওসমান হাদির বিচার বিলম্বিত হলে তা শুধু একটি মামলার ব্যর্থতা হবে না—এটি হবে রাষ্ট্রের নৈতিক পরাজয়। আর ন্যায়বিচার যত দেরি হয়, অন্যায় তত শক্তিশালী হয়। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—বিচার থামানো যায়, কিন্তু ন্যায়বিচারের দাবি কখনো দমিয়ে রাখা যায় না।

Justice delayed is justice denied—এবার দেরি নয়, দরকার দৃশ্যমান বিচার।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

বিল্লাল হোসেন

বিল্লাল হোসেন, একজন প্রজ্ঞাবান পেশাজীবী, যিনি গণিতের ওপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ, ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ হিসেবে একটি সমৃদ্ধ ও বহুমুখী ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন। তার আর্থিক খাতে যাত্রা তাকে নেতৃত্বের ভূমিকায় নিয়ে গেছে, বিশেষ করে সৌদি আরবের আল-রাজি ব্যাংকিং Inc. এবং ব্যাংক-আল-বিলাদে বিদেশী সম্পর্ক ও করেসপন্ডেন্ট মেইন্টেনেন্স অফিসার হিসেবে। প্রথাগত অর্থনীতির গণ্ডির বাইরে, বিল্লাল একজন প্রখ্যাত লেখক ও বিশ্লেষক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালে মননশীল কলাম ও গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করে। তার দক্ষতা বিস্তৃত বিষয় জুড়ে রয়েছে, যেমন অর্থনীতির জটিলতা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, প্রবাসী শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্ট, রেমিটেন্স, রিজার্ভ এবং অন্যান্য সম্পর্কিত দিক। বিল্লাল তার লেখায় একটি অনন্য বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসেন, যা ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে অর্জিত বাস্তব জ্ঞানকে একত্রিত করে একাডেমিক কঠোরতার সাথে। তার প্রবন্ধগুলো শুধুমাত্র জটিল বিষয়গুলির উপর গভীর বোঝাপড়ার প্রতিফলন নয়, বরং পাঠকদের জন্য জ্ঞানপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা তত্ত্ব ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। বিল্লাল হোসেনের অবদান তার প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করে যে, তিনি আমাদের আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বের জটিলতাগুলি উন্মোচন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের একটি বিস্তৃত এবং আরও সূক্ষ্ম বোঝাপড়ার দিকে মূল্যবান অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।

Justice Delayed is Justice Denied শহীদ ওসমান হাদি ও ন্যায়বিচারের দীর্ঘশ্বাস

Update Time : ১১:৩৯:০০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬

 

“Justice delayed is justice denied”—ন্যায়বিচার বিলম্বিত হলে তা আর ন্যায়বিচার থাকে না; তা হয়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় অবহেলা, ক্ষমতার নিষ্ঠুরতা এবং ভুক্তভোগীদের প্রতি নির্মম তামাশা। আজ বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার দিকে তাকালে এই কথাটিই সবচেয়ে বেশি সত্য বলে মনে হয়। শহীদ শরিফ ওসমান হাদি—এই সময়ের এক প্রতীকী নাম—যার বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁর স্ত্রী রাবেয়া ইসলাম শম্পা। সেই প্রশ্ন আসলে শুধু একজন স্ত্রীর নয়; এটি পুরো জাতির দীর্ঘদিনের আর্তনাদ।

বুধবার (২১ জানুয়ারি) সকালে ফেসবুকে দেওয়া এক হৃদয়বিদারক পোস্টে শম্পা লিখেছেন, রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরি? শহীদ ওসমান হাদির বিচারের কত দেরি?”—এই প্রশ্ন আজ বাংলাদেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের প্রশ্ন। কারণ, এ দেশে বিচার চাওয়া মানেই যেন এক অনন্ত অপেক্ষার নাম।

ইতিহাস আমাদের সামনে নির্মম সত্য তুলে ধরে। সাগর–রুনি হত্যাকাণ্ড—বছরের পর বছর পার হলেও বিচার অধরা। আবরার ফাহাদ—একটি তরুণ প্রাণ, যার হত্যাকাণ্ড দেশ কাঁপাল, কিন্তু বিচার প্রক্রিয়া আজও পূর্ণতার মুখ দেখেনি। আর এখন সেই তালিকায় যুক্ত হচ্ছে শহীদ ওসমান হাদি। প্রতিবারই একই চিত্র—তদন্তের নামে সময়ক্ষেপণ, তারিখের পর তারিখ, আর শেষে জনগণের ক্লান্তি।

রাবেয়া ইসলাম শম্পার বক্তব্যে সবচেয়ে শক্তিশালী যে কথাটি উঠে এসেছে, তা হলো—হাদি কেবল একটি পরিবারের সম্পত্তি নয়, তিনি সারা বাংলাদেশের। তাঁর রক্তের দায় রাষ্ট্র এড়াতে পারে না। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, ক্ষতিপূরণ, অনুদান বা সাময়িক সহানুভূতি দিয়ে বিচার থামিয়ে দেওয়া যাবে না। বিচারহীনতা ঢাকতে ‘দেওয়া-নেওয়ার রাজনীতি’ করলে সেটাই হবে সবচেয়ে বড় ভুল।

এই রাষ্ট্র যদি শহীদ ওসমান হাদির হত্যার বিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে এর ফল হবে ভয়াবহ। মানুষ আর কাঁদবে না, রাস্তায় নামবে না, প্রতিবাদ করবে না—কারণ তারা বিশ্বাস হারাবে। আর একটি রাষ্ট্রের জন্য নাগরিকের বিশ্বাস হারানো মানেই নৈতিক দেউলিয়াত্ব।

শম্পা তাঁর লেখায় আরও স্পষ্ট করেছেন—সরকার কী দিচ্ছে বা দিচ্ছে না, তা তাঁর আগ্রহের বিষয় নয়। তাঁর একমাত্র দাবি, যেকোনো মূল্যে তাঁর স্বামীর হত্যার বিচার এবং তাঁর ছেলে ফিরনাসের নিরাপদ ভবিষ্যৎ। এই দাবির মধ্যে কোনো রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই, নেই ব্যক্তিগত সুবিধার লোভ—এটি নিখাদ ন্যায়বিচারের দাবি।

আজ প্রশ্ন একটাই—কত মাস, কত দিন, কত ঘণ্টা লাগবে বিচার শুরু করতে? রাষ্ট্র কি আবারও সময়ের আড়ালে লুকাবে? নাকি এইবার প্রমাণ করবে, বাংলাদেশে ন্যায়বিচার শুধু বইয়ের পাতায় নয়, বাস্তবেও আছে?

শহীদ ওসমান হাদির বিচার বিলম্বিত হলে তা শুধু একটি মামলার ব্যর্থতা হবে না—এটি হবে রাষ্ট্রের নৈতিক পরাজয়। আর ন্যায়বিচার যত দেরি হয়, অন্যায় তত শক্তিশালী হয়। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—বিচার থামানো যায়, কিন্তু ন্যায়বিচারের দাবি কখনো দমিয়ে রাখা যায় না।

Justice delayed is justice denied—এবার দেরি নয়, দরকার দৃশ্যমান বিচার।