সময়: রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অক্সফোর্ডের গবেষণা: ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের চরম উষ্ণ ৬ দেশের একটি হবে বাংলাদেশ

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১১:২৯:০২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬
  • / ১৩৭ Time View

জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাবে আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে চরম তাপপ্রবণ ছয়টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশ স্থান পাবে—এমনই উদ্বেগজনক পূর্বাভাস উঠে এসেছে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত এক আন্তর্জাতিক গবেষণায়। গবেষণাটি দেখাচ্ছে, বর্তমান হারে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক দশকে তাপপ্রবাহ মানবসভ্যতার জন্য এক নীরব কিন্তু মারাত্মক হুমকিতে পরিণত হবে।

সোমবার (২৬ জানুয়ারি) মর্যাদাপূর্ণ বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার সাসটেইনেবিলিটি-তে প্রকাশিত এই গবেষণায় বলা হয়েছে, আগামী ২৫ বছরের মধ্যে চরম তাপে আক্রান্ত বৈশ্বিক জনসংখ্যার হার প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে। শিল্প-পূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক উষ্ণতা যদি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যায়, তবে চলতি শতাব্দীর মাঝামাঝি নাগাদ বিশ্বের প্রায় ৪১ শতাংশ মানুষ—অর্থাৎ আনুমানিক ৩৭৯ কোটি মানুষ—অসহনীয় তাপপ্রবাহের মধ্যে বসবাস করতে বাধ্য হবে।

গবেষণায় তাপপ্রবাহের ঝুঁকি নিরূপণে ব্যবহার করা হয়েছে ‘কুলিং ডিগ্রি ডেইজ’ (সিডিডি) নামের একটি সূচক। বছরে ৩ হাজারের বেশি সিডিডি থাকা অঞ্চলগুলোকে ‘চরম তাপপ্রবণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই সূচক মূলত ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা নিরাপদ রাখতে কতটা শীতলীকরণ প্রয়োজন, তার পরিমাপ নির্দেশ করে।

এই মানদণ্ড অনুযায়ী, চরম তাপে বসবাসকারী সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের পাশাপাশি রয়েছে ভারত, নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও ফিলিপাইন। অক্সফোর্ডের গবেষক ও এই গবেষণার প্রধান লেখক ড. জেসুস লিজানা সতর্ক করে বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় গড় তাপমাত্রা অনেক সময় প্রকৃত ঝুঁকিকে আড়াল করে দেয়। বাস্তবে দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী ইতোমধ্যেই বিপজ্জনক তাপমাত্রার মধ্যে জীবনযাপন করছে।

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, তীব্র তাপপ্রবাহের ফলে বাংলাদেশে হিটস্ট্রোক, হৃদরোগ ও কিডনি রোগসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি দ্রুত বাড়বে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বয়স্ক মানুষ, শিশু এবং নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী—যাদের এয়ার কন্ডিশন বা উন্নত শীতলীকরণ ব্যবস্থার সুযোগ সীমিত।

এতদিন বাংলাদেশের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান হুমকি হিসেবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি বা ঘূর্ণিঝড়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলেও, এই গবেষণা দেখাচ্ছে যে চরম তাপমাত্রা এখন এক নীরব কিন্তু সমানভাবে প্রাণঘাতী বিপদ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে শীতলীকরণের চাহিদা দ্রুত বাড়বে, যা এক পর্যায়ে ‘কুলিং ট্র্যাপ’ তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ বেশি এয়ার কন্ডিশন ব্যবহারে জ্বালানি চাহিদা বাড়বে, আর সেই জ্বালানি যদি জীবাশ্মভিত্তিক হয়, তবে তা জলবায়ু পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করবে।

অক্সফোর্ডের এই গবেষণাকে বিশ্বনেতাদের জন্য একটি জরুরি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণতা যদি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায়, তবে প্রাণঘাতী তাপে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। তবে সেই সুযোগ দ্রুত সংকুচিত হয়ে আসছে।

গবেষণা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে ‘অত্যন্ত শীতল’ অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের অনুপাত বর্তমানের ১৪ শতাংশ থেকে কমে ৭ শতাংশে নেমে আসবে। বিপরীতে ব্রাজিল, লাওস ও দক্ষিণ সুদানের মতো দেশগুলোতে মাথাপিছু শীতলীকরণের চাহিদা সবচেয়ে দ্রুত বাড়বে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

অক্সফোর্ডের গবেষণা: ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের চরম উষ্ণ ৬ দেশের একটি হবে বাংলাদেশ

Update Time : ১১:২৯:০২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬

জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাবে আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে চরম তাপপ্রবণ ছয়টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশ স্থান পাবে—এমনই উদ্বেগজনক পূর্বাভাস উঠে এসেছে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত এক আন্তর্জাতিক গবেষণায়। গবেষণাটি দেখাচ্ছে, বর্তমান হারে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক দশকে তাপপ্রবাহ মানবসভ্যতার জন্য এক নীরব কিন্তু মারাত্মক হুমকিতে পরিণত হবে।

সোমবার (২৬ জানুয়ারি) মর্যাদাপূর্ণ বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার সাসটেইনেবিলিটি-তে প্রকাশিত এই গবেষণায় বলা হয়েছে, আগামী ২৫ বছরের মধ্যে চরম তাপে আক্রান্ত বৈশ্বিক জনসংখ্যার হার প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে। শিল্প-পূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক উষ্ণতা যদি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যায়, তবে চলতি শতাব্দীর মাঝামাঝি নাগাদ বিশ্বের প্রায় ৪১ শতাংশ মানুষ—অর্থাৎ আনুমানিক ৩৭৯ কোটি মানুষ—অসহনীয় তাপপ্রবাহের মধ্যে বসবাস করতে বাধ্য হবে।

গবেষণায় তাপপ্রবাহের ঝুঁকি নিরূপণে ব্যবহার করা হয়েছে ‘কুলিং ডিগ্রি ডেইজ’ (সিডিডি) নামের একটি সূচক। বছরে ৩ হাজারের বেশি সিডিডি থাকা অঞ্চলগুলোকে ‘চরম তাপপ্রবণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই সূচক মূলত ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা নিরাপদ রাখতে কতটা শীতলীকরণ প্রয়োজন, তার পরিমাপ নির্দেশ করে।

এই মানদণ্ড অনুযায়ী, চরম তাপে বসবাসকারী সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের পাশাপাশি রয়েছে ভারত, নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও ফিলিপাইন। অক্সফোর্ডের গবেষক ও এই গবেষণার প্রধান লেখক ড. জেসুস লিজানা সতর্ক করে বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় গড় তাপমাত্রা অনেক সময় প্রকৃত ঝুঁকিকে আড়াল করে দেয়। বাস্তবে দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী ইতোমধ্যেই বিপজ্জনক তাপমাত্রার মধ্যে জীবনযাপন করছে।

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, তীব্র তাপপ্রবাহের ফলে বাংলাদেশে হিটস্ট্রোক, হৃদরোগ ও কিডনি রোগসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি দ্রুত বাড়বে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বয়স্ক মানুষ, শিশু এবং নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী—যাদের এয়ার কন্ডিশন বা উন্নত শীতলীকরণ ব্যবস্থার সুযোগ সীমিত।

এতদিন বাংলাদেশের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান হুমকি হিসেবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি বা ঘূর্ণিঝড়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলেও, এই গবেষণা দেখাচ্ছে যে চরম তাপমাত্রা এখন এক নীরব কিন্তু সমানভাবে প্রাণঘাতী বিপদ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে শীতলীকরণের চাহিদা দ্রুত বাড়বে, যা এক পর্যায়ে ‘কুলিং ট্র্যাপ’ তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ বেশি এয়ার কন্ডিশন ব্যবহারে জ্বালানি চাহিদা বাড়বে, আর সেই জ্বালানি যদি জীবাশ্মভিত্তিক হয়, তবে তা জলবায়ু পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করবে।

অক্সফোর্ডের এই গবেষণাকে বিশ্বনেতাদের জন্য একটি জরুরি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণতা যদি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায়, তবে প্রাণঘাতী তাপে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। তবে সেই সুযোগ দ্রুত সংকুচিত হয়ে আসছে।

গবেষণা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে ‘অত্যন্ত শীতল’ অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের অনুপাত বর্তমানের ১৪ শতাংশ থেকে কমে ৭ শতাংশে নেমে আসবে। বিপরীতে ব্রাজিল, লাওস ও দক্ষিণ সুদানের মতো দেশগুলোতে মাথাপিছু শীতলীকরণের চাহিদা সবচেয়ে দ্রুত বাড়বে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।