সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিয়াল কি প্রতিশোধের রাজনীতি শিখে ফেলল?

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১০:৫৩:১৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬
  • / ১৩৪ Time View

 

পদ্মা নদীর বুকে জেগে ওঠা এক চরে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা শুধু ভয়াবহই নয়, ভাবনারও জন্ম দিচ্ছে। রাজশাহীর পবা উপজেলার চর এলাকায় একটি বাথানে শিয়ালের দল একের পর এক গরু–মহিষের ওপর হামলা চালিয়েছে। এতে অন্তত ২০০টি গরু–মহিষ আহত হয়েছে। শুধু পশুই নয়, হামলার শিকার হয়েছেন মানুষও। দুই কৃষকের ওপর সরাসরি আক্রমণ চালানো হয়েছে, চারজনকে তাড়া করে নদীতে নামতে বাধ্য করা হয়েছে।

ঘটনাটি শুনে অনেকেরই শৈশবের পড়া ‘শিয়াল পণ্ডিতের রাজনীতি’ গল্পের কথা মনে পড়ে যায়। সেই গল্পে শিয়াল কৌশলে বাঘকে বোকা বানিয়ে নিজের প্রতিশোধ নেয়। তখন আমরা সেটাকে রূপকথা ভেবেছি। কিন্তু আজ বাস্তব জীবনে শিয়ালের এমন আক্রমণ কি সেই রূপকথারই এক ভয়ংকর প্রতিফলন নয়?

ঘটনার সূত্রপাত ২০ ডিসেম্বর রাতে। পদ্মা নদীতে জেগে ওঠা ষাটবিঘা চরে পাশের খানপুর এলাকার কৃষকেরা গরুর বাথান করেছিলেন। দিনে গরু চরে বেড়ায়, রাতে বাথানে রেখে সবাই বাড়ি ফেরেন। ২১ ডিসেম্বর ভোরে খবর আসে—বাথানের বেড়া ভেঙে গরু ছড়িয়ে পড়েছে। গিয়ে দেখা যায়, বহু গরুর নাক, মুখ ও কান ছেঁড়া, রক্তে ভেজা চরের মাঠ। বাথানে ছিল ছয় শতাধিক গরু।

কৃষকেরা নিশ্চিত হন, এটি শিয়ালের কাজ। কারণ, হামলার পরদিন সকালেও ছয়টি শিয়াল বাথানের আশপাশে ঘোরাঘুরি করছিল। এমনকি উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাও শিয়ালগুলো প্রত্যক্ষ করেন।

হামলার ভয়াবহতা এখানেই শেষ নয়। চরের ফেরিওয়ালা আফসার আলী ও তাঁর চাচাশ্বশুর আক্কাস আলীর ওপর একটি শিয়াল হামলা চালায়। আফসার আলীর ঠোঁট ছিঁড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়, আর আক্কাস আলীর হাত থেকে এক খাবলা মাংস তুলে নিয়ে যায় শিয়াল। কৃষক আবুল কালামের সামনে গিয়ে শিয়াল রক্তমাখা মুখ মাটিতে মুছে নির্বিকারভাবে চলে যায়। এরপর আরও চারজন কৃষককে তাড়া করলে তাঁরা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ বাঁচান।

এই ঘটনার পর মাঠে নামতে ভয় পাচ্ছেন কৃষকেরা। মাহমুদ সুজন আলী জানান, ঘটনার তিন দিন আগে তাঁর একটি গাভি বাছুর প্রসব করলে তিনটি শিয়াল সেটিকে ঘিরে রেখেছিল। তখন তিনি কোনোমতে উদ্ধার করেন। এখন লাঠি ছাড়া কেউ মাঠে নামতে সাহস পাচ্ছেন না।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্যও উদ্বেগজনক। গত বছর শিয়ালের কামড়ে ১৭৬ জন আহত রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। চলতি বছর ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮৮ জনে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—হঠাৎ শিয়াল এমন আচরণ করছে কেন? চর মাঝারদিয়াড় এলাকার কৃষক আবদুল হান্নান একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন। তাঁর মতে, হামলার আগের দিন চরখানপুরে দুই রাখাল একটি শিয়াল মেরে ফেলে। দূরে দাঁড়িয়ে চারটি শিয়াল সেই দৃশ্য দেখে। সম্ভবত সেই ক্ষোভ থেকেই রাতের বেলা বাথানে হামলা চালানো হয়।

পবা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আবদুল লতিফও বলেন, হামলার আগের দিন লোকজন বন মহিষ শিকার করতে এসে একটি শিয়ালের বাচ্চা মেরে নিয়ে গেছে—এমন কথাও শোনা গেছে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে শিয়াল আক্রমণাত্মক আচরণ করতে পারে।

বন বিভাগের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পরিদর্শক জাহাঙ্গীর কবির জানান, শিয়ালের খাদ্যসংকট, আবাসস্থল ধ্বংস, বিরক্ত করা বা প্রজনন মৌসুম—এসব কারণেই শিয়াল এমন আচরণ করতে পারে। ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি শিয়ালের প্রজনন মৌসুম।

তাহলে কি সত্যিই শিয়াল প্রতিশোধের রাজনীতি শিখে ফেলেছে? নাকি মানুষই প্রকৃতির ভারসাম্য ভেঙে এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছে? আমরা শিয়ালের খাবার কেড়ে নিয়েছি, আবাস ধ্বংস করেছি, বাচ্চা মেরেছি—এর পরিণতিতে প্রকৃতি কি পাল্টা বার্তা দিচ্ছে না?

যে গল্পকে একসময় রূপকথা বলে উড়িয়ে দিয়েছি, আজ বাস্তবের মাটিতে তার চেয়েও ভয়াবহ দৃশ্য দেখছি। হয়তো এখনই সতর্ক না হলে প্রকৃতি আরও এমন ঘটনা ঘটাবে, যা রূপকথাকেও হার মানাবে। তখন অর্থনীতিবিদ ম্যালথাসের ভাষায় হয়তো আমাদের বলতে হবে—এটাই প্রকৃতির প্রতিশোধ।

সূত্র: প্রথম আলো

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

শিয়াল কি প্রতিশোধের রাজনীতি শিখে ফেলল?

Update Time : ১০:৫৩:১৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬

 

পদ্মা নদীর বুকে জেগে ওঠা এক চরে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা শুধু ভয়াবহই নয়, ভাবনারও জন্ম দিচ্ছে। রাজশাহীর পবা উপজেলার চর এলাকায় একটি বাথানে শিয়ালের দল একের পর এক গরু–মহিষের ওপর হামলা চালিয়েছে। এতে অন্তত ২০০টি গরু–মহিষ আহত হয়েছে। শুধু পশুই নয়, হামলার শিকার হয়েছেন মানুষও। দুই কৃষকের ওপর সরাসরি আক্রমণ চালানো হয়েছে, চারজনকে তাড়া করে নদীতে নামতে বাধ্য করা হয়েছে।

ঘটনাটি শুনে অনেকেরই শৈশবের পড়া ‘শিয়াল পণ্ডিতের রাজনীতি’ গল্পের কথা মনে পড়ে যায়। সেই গল্পে শিয়াল কৌশলে বাঘকে বোকা বানিয়ে নিজের প্রতিশোধ নেয়। তখন আমরা সেটাকে রূপকথা ভেবেছি। কিন্তু আজ বাস্তব জীবনে শিয়ালের এমন আক্রমণ কি সেই রূপকথারই এক ভয়ংকর প্রতিফলন নয়?

ঘটনার সূত্রপাত ২০ ডিসেম্বর রাতে। পদ্মা নদীতে জেগে ওঠা ষাটবিঘা চরে পাশের খানপুর এলাকার কৃষকেরা গরুর বাথান করেছিলেন। দিনে গরু চরে বেড়ায়, রাতে বাথানে রেখে সবাই বাড়ি ফেরেন। ২১ ডিসেম্বর ভোরে খবর আসে—বাথানের বেড়া ভেঙে গরু ছড়িয়ে পড়েছে। গিয়ে দেখা যায়, বহু গরুর নাক, মুখ ও কান ছেঁড়া, রক্তে ভেজা চরের মাঠ। বাথানে ছিল ছয় শতাধিক গরু।

কৃষকেরা নিশ্চিত হন, এটি শিয়ালের কাজ। কারণ, হামলার পরদিন সকালেও ছয়টি শিয়াল বাথানের আশপাশে ঘোরাঘুরি করছিল। এমনকি উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাও শিয়ালগুলো প্রত্যক্ষ করেন।

হামলার ভয়াবহতা এখানেই শেষ নয়। চরের ফেরিওয়ালা আফসার আলী ও তাঁর চাচাশ্বশুর আক্কাস আলীর ওপর একটি শিয়াল হামলা চালায়। আফসার আলীর ঠোঁট ছিঁড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়, আর আক্কাস আলীর হাত থেকে এক খাবলা মাংস তুলে নিয়ে যায় শিয়াল। কৃষক আবুল কালামের সামনে গিয়ে শিয়াল রক্তমাখা মুখ মাটিতে মুছে নির্বিকারভাবে চলে যায়। এরপর আরও চারজন কৃষককে তাড়া করলে তাঁরা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ বাঁচান।

এই ঘটনার পর মাঠে নামতে ভয় পাচ্ছেন কৃষকেরা। মাহমুদ সুজন আলী জানান, ঘটনার তিন দিন আগে তাঁর একটি গাভি বাছুর প্রসব করলে তিনটি শিয়াল সেটিকে ঘিরে রেখেছিল। তখন তিনি কোনোমতে উদ্ধার করেন। এখন লাঠি ছাড়া কেউ মাঠে নামতে সাহস পাচ্ছেন না।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্যও উদ্বেগজনক। গত বছর শিয়ালের কামড়ে ১৭৬ জন আহত রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। চলতি বছর ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮৮ জনে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—হঠাৎ শিয়াল এমন আচরণ করছে কেন? চর মাঝারদিয়াড় এলাকার কৃষক আবদুল হান্নান একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন। তাঁর মতে, হামলার আগের দিন চরখানপুরে দুই রাখাল একটি শিয়াল মেরে ফেলে। দূরে দাঁড়িয়ে চারটি শিয়াল সেই দৃশ্য দেখে। সম্ভবত সেই ক্ষোভ থেকেই রাতের বেলা বাথানে হামলা চালানো হয়।

পবা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আবদুল লতিফও বলেন, হামলার আগের দিন লোকজন বন মহিষ শিকার করতে এসে একটি শিয়ালের বাচ্চা মেরে নিয়ে গেছে—এমন কথাও শোনা গেছে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে শিয়াল আক্রমণাত্মক আচরণ করতে পারে।

বন বিভাগের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পরিদর্শক জাহাঙ্গীর কবির জানান, শিয়ালের খাদ্যসংকট, আবাসস্থল ধ্বংস, বিরক্ত করা বা প্রজনন মৌসুম—এসব কারণেই শিয়াল এমন আচরণ করতে পারে। ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি শিয়ালের প্রজনন মৌসুম।

তাহলে কি সত্যিই শিয়াল প্রতিশোধের রাজনীতি শিখে ফেলেছে? নাকি মানুষই প্রকৃতির ভারসাম্য ভেঙে এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছে? আমরা শিয়ালের খাবার কেড়ে নিয়েছি, আবাস ধ্বংস করেছি, বাচ্চা মেরেছি—এর পরিণতিতে প্রকৃতি কি পাল্টা বার্তা দিচ্ছে না?

যে গল্পকে একসময় রূপকথা বলে উড়িয়ে দিয়েছি, আজ বাস্তবের মাটিতে তার চেয়েও ভয়াবহ দৃশ্য দেখছি। হয়তো এখনই সতর্ক না হলে প্রকৃতি আরও এমন ঘটনা ঘটাবে, যা রূপকথাকেও হার মানাবে। তখন অর্থনীতিবিদ ম্যালথাসের ভাষায় হয়তো আমাদের বলতে হবে—এটাই প্রকৃতির প্রতিশোধ।

সূত্র: প্রথম আলো