পে-স্কেল:দেশের স্বার্থ ক্ষুন্ন করে অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত কি শুধু ক্রেডিট নেওয়ার কৌশল?
- Update Time : ০৫:০৫:৪০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬
- / ৩১১ Time View

বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান না বাড়িয়ে বড় পরিসরে মজুরি বৃদ্ধি টেকসই হতে পারে না। বর্তমানে বাংলাদেশ অর্থনীতি বিনিয়োগ ঘাটতি ও মন্দার ঝুঁকিতে রয়েছে। এই অবস্থায় বেতন বৃদ্ধি সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তা অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলতে পারে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বাজার ব্যবস্থার সংস্কার এবং রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া বড় আকারের পে-স্কেল বাস্তবায়ন জনস্বার্থের চেয়ে গোষ্ঠীস্বার্থকেই বেশি সুরক্ষা দেবে।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই অর্থনীতির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব ঘাটতি সামাল দেওয়া এবং জনগণের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা। ঠিক এই বাস্তবতার মধ্যেই সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল প্রস্তাব সামনে এসেছে, যা একদিকে রাষ্ট্রীয় কর্মচারীদের জন্য স্বস্তির বার্তা বয়ে আনলেও অন্যদিকে সাধারণ জনগণ ও ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য তৈরি করছে গভীর উদ্বেগ।
জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন ১০০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডে মূল বেতন ৮ হাজার ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ প্রথম গ্রেডে ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। এই কাঠামো ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আংশিক এবং জুলাই থেকে পুরোপুরি বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই বিপুল ব্যয় আসবে কোথা থেকে?
ঋণনির্ভর সিদ্ধান্ত ও ভবিষ্যৎ সরকারের দায়
প্রস্তাবিত পে-স্কেল বাস্তবায়িত হলে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা। বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মচারীর বেতন-ভাতা বাবদ বাজেটে বরাদ্দ রয়েছে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা। নতুন কাঠামো চালু হলে এই ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যাবে। বাস্তবতা হলো, অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে এমন কোনো রাজস্ব বিস্তার হয়নি, যা দিয়ে এই ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব। ফলে সরকারের সামনে দুটি পথ খোলা থাকে—এক, নতুন করে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ নেওয়া; দুই, উন্নয়ন ও সামাজিক খাতে ব্যয় কমানো।
উভয় পথই শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ঋণ নিলে তার সুদ ও আসল পরিশোধ করতে হবে ভবিষ্যৎ সরকারকে, যা আগামী বাজেটগুলোতে রাজস্ব ব্যয়ের বড় অংশ গ্রাস করবে। অর্থাৎ আজকের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বোঝা বইতে হবে আগামী দিনের নির্বাচিত সরকারকে।
মূল্যস্ফীতির আগুনে ঘি?
বেতন কমিশন দাবি করছে, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় এই বেতন বৃদ্ধি প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, বাংলাদেশে বড় পরিসরে সরকারি বেতন বাড়লে তার প্রভাব পড়ে বাজারে। সরকারি চাকরিজীবীদের হাতে অতিরিক্ত টাকা গেলে চাহিদা বাড়ে, অথচ সরবরাহ ব্যবস্থা দুর্বল থাকলে পণ্যের দাম দ্রুত বেড়ে যায়।
পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীই বলছেন, বেতন বাড়লেও বাজারে দাম বাড়লে বাস্তবে কোনো লাভ থাকে না। বরং যাঁরা বেতনভুক্ত নন—দিনমজুর, কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও বেসরকারি খাতের শ্রমিক—তাঁদের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান যথার্থভাবেই সতর্ক করেছেন, বড় পরিসরে বেতন বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিতে পারে। তাঁর মতে, মূল্যস্ফীতি কমেছে—এই দাবি বাস্তবে প্রতিফলিত হয়নি; বরং কেবল দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের এই বিস্তার বাজারকে আরও অস্থিতিশীল করতে পারে।
জনগণের ওপর চাপ, সুবিধা সীমিত গোষ্ঠীর
প্রস্তাবিত পে-স্কেলে সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগীরা বড় সুবিধা পাচ্ছেন—বৈশাখী ভাতা ৫০ শতাংশ, পেনশনে ৫৫ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি, বাড়িভাড়া ও যাতায়াত ভাতার সম্প্রসারণ। কিন্তু দেশের মোট কর্মজীবী মানুষের একটি ছোট অংশই এই সুবিধার আওতায় আসেন। বিপরীতে, বর্ধিত মূল্যস্ফীতির ধাক্কা বহন করতে হয় পুরো জনগণকে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সঠিকভাবেই প্রশ্ন তুলেছেন—এই ব্যয়ের জন্য জনগণ ও অর্থনীতি আদৌ প্রস্তুত কি না। রাজস্ব সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিশ্লেষণ ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
সংস্কার ছাড়া মজুরি বৃদ্ধি কতটা টেকসই?
বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান না বাড়িয়ে বড় পরিসরে মজুরি বৃদ্ধি টেকসই হতে পারে না। বর্তমানে বাংলাদেশ অর্থনীতি বিনিয়োগ ঘাটতি ও মন্দার ঝুঁকিতে রয়েছে। এই অবস্থায় বেতন বৃদ্ধি সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তা অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকার যদি জনপ্রিয়তা বা স্বল্পমেয়াদি স্বস্তির কথা ভেবে ঋণনির্ভর বেতনস্কেল বাস্তবায়নের পথে হাঁটে, তবে তার দায় শেষ পর্যন্ত পড়বে সাধারণ জনগণ ও ভবিষ্যৎ সরকারের ওপর। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বাজার ব্যবস্থার সংস্কার এবং রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া বড় আকারের পে-স্কেল বাস্তবায়ন জনস্বার্থের চেয়ে গোষ্ঠীস্বার্থকেই বেশি সুরক্ষা দেবে।
আজ প্রশ্ন একটাই—এই বেতন বৃদ্ধি কি সত্যিই অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে, নাকি ঋণ, মূল্যস্ফীতি ও ভবিষ্যৎ চাপের বোঝা আরও ভারী করে তুলবে?















