সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বর্তমান যুক্তরাষ্ট্র ও অতীতের ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ: আগ্রাসনের এক অভিন্ন ইতিহাস

বিল্লাল হোসেন
  • Update Time : ১১:৩৯:৫২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬
  • / ১৭১ Time View

ইতিহাস কখনো নিজেকে হুবহু পুনরাবৃত্তি করে না, কিন্তু অনেক সময় একই চরিত্র নতুন নামে, নতুন কৌশলে আবার ফিরে আসে। আজকের বৈশ্বিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার দিকে তাকালে অনেক বিশ্লেষকের কাছে উনিশ ও বিশ শতকের ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের সঙ্গে এর বিস্ময়কর সাদৃশ্য চোখে পড়ে। শক্তির প্রদর্শন, অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমে বিশ্বকে নিজেদের স্বার্থে নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতা—এই বৈশিষ্ট্যগুলো একসময় যেমন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পরিচায়ক ছিল, আজ তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নীতিতেও প্রতিফলিত হচ্ছে।

ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ মূলত ‘সভ্যতা বিস্তারের’ নামে শুরু হলেও এর আসল উদ্দেশ্য ছিল সম্পদ লুণ্ঠন, বাজার দখল এবং কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ। ভারতবর্ষ, আফ্রিকা কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটিশ শাসন স্থানীয় জনগণের স্বার্থ রক্ষা করেনি; বরং শোষণ, দমন-পীড়ন ও অর্থনৈতিক নিঃস্বতা তৈরি করেছে। আজ যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি উপনিবেশ স্থাপন না করলেও অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশকে কার্যত পরাধীন করে রাখছে—যাকে অনেকে ‘নব্য-উপনিবেশবাদ’ বলে অভিহিত করেন।

সামরিক আগ্রাসনের দিক থেকেও এই সাদৃশ্য স্পষ্ট। ব্রিটিশরা বিদ্রোহ দমন ও প্রভাব বিস্তারের জন্য সেনাবাহিনী ব্যবহার করত; যুক্তরাষ্ট্রও একইভাবে ‘গণতন্ত্র রক্ষা’, ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ বা ‘মানবাধিকার’ এর মতো নৈতিক অজুহাত সামনে রেখে ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া কিংবা ভিয়েতনামের মতো দেশে সামরিক হস্তক্ষেপ করেছে। ফলাফলও প্রায় একই—রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ধ্বংস, লক্ষুতি মানুষের প্রাণহানি এবং দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা।

অর্থনৈতিক দিক থেকে ব্রিটিশরা উপনিবেশগুলোকে কাঁচামালের উৎস ও নিজেদের শিল্পপণ্যের বাজারে পরিণত করেছিল। আজ যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক, নিষেধাজ্ঞা ও ডলার-নির্ভর বৈশ্বিক অর্থনীতির মাধ্যমে বহু দেশের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে। ঋণ, বাণিজ্য চুক্তি ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে নিজেদের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে বাধ্য করা হচ্ছে—যা উপনিবেশিক শোষণের আধুনিক রূপ।

রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রেও তুলনা প্রাসঙ্গিক। ব্রিটিশরা উপনিবেশগুলোতে নিজেদের অনুগত শাসক বসাত অথবা বিভাজনের রাজনীতি ব্যবহার করত। যুক্তরাষ্ট্রও বিভিন্ন দেশে সরকার পরিবর্তন, নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার কিংবা অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব উসকে দেওয়ার অভিযোগে বারবার অভিযুক্ত হয়েছে। ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতির আধুনিক সংস্করণ আজও বিশ্ব রাজনীতিতে কার্যকর।

সবচেয়ে বড় মিলটি হলো শক্তির একচেটিয়া ব্যবহারের মানসিকতা। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য নিজেকে বিশ্বশাসনের স্বাভাবিক অধিকারী মনে করত; যুক্তরাষ্ট্রও নিজেদের ‘বিশ্বের পুলিশ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনেক সময় উপেক্ষিত হয়, যদি তা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়—যেমনটি একসময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ক্ষেত্রেও দেখা গিয়েছিল।

অতএব বলা যায়, ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ ও বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক আগ্রাসন ইতিহাসের দুটি ভিন্ন অধ্যায় হলেও তাদের মূল চরিত্রে গভীর সাদৃশ্য রয়েছে। পার্থক্য শুধু রূপ ও ভাষায়—তখন ছিল সরাসরি শাসন, আজ আছে সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্যের সূক্ষ্ম জাল। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করা জরুরি, কারণ ইতিহাস বুঝতে পারলেই ভবিষ্যতে নতুন উপনিবেশবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সচেতন ও প্রতিরোধী হওয়া সম্ভব।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

বিল্লাল হোসেন

বিল্লাল হোসেন, একজন প্রজ্ঞাবান পেশাজীবী, যিনি গণিতের ওপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ, ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ হিসেবে একটি সমৃদ্ধ ও বহুমুখী ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন। তার আর্থিক খাতে যাত্রা তাকে নেতৃত্বের ভূমিকায় নিয়ে গেছে, বিশেষ করে সৌদি আরবের আল-রাজি ব্যাংকিং Inc. এবং ব্যাংক-আল-বিলাদে বিদেশী সম্পর্ক ও করেসপন্ডেন্ট মেইন্টেনেন্স অফিসার হিসেবে। প্রথাগত অর্থনীতির গণ্ডির বাইরে, বিল্লাল একজন প্রখ্যাত লেখক ও বিশ্লেষক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালে মননশীল কলাম ও গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করে। তার দক্ষতা বিস্তৃত বিষয় জুড়ে রয়েছে, যেমন অর্থনীতির জটিলতা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, প্রবাসী শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্ট, রেমিটেন্স, রিজার্ভ এবং অন্যান্য সম্পর্কিত দিক। বিল্লাল তার লেখায় একটি অনন্য বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসেন, যা ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে অর্জিত বাস্তব জ্ঞানকে একত্রিত করে একাডেমিক কঠোরতার সাথে। তার প্রবন্ধগুলো শুধুমাত্র জটিল বিষয়গুলির উপর গভীর বোঝাপড়ার প্রতিফলন নয়, বরং পাঠকদের জন্য জ্ঞানপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা তত্ত্ব ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। বিল্লাল হোসেনের অবদান তার প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করে যে, তিনি আমাদের আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বের জটিলতাগুলি উন্মোচন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের একটি বিস্তৃত এবং আরও সূক্ষ্ম বোঝাপড়ার দিকে মূল্যবান অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।

বর্তমান যুক্তরাষ্ট্র ও অতীতের ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ: আগ্রাসনের এক অভিন্ন ইতিহাস

Update Time : ১১:৩৯:৫২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬

ইতিহাস কখনো নিজেকে হুবহু পুনরাবৃত্তি করে না, কিন্তু অনেক সময় একই চরিত্র নতুন নামে, নতুন কৌশলে আবার ফিরে আসে। আজকের বৈশ্বিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার দিকে তাকালে অনেক বিশ্লেষকের কাছে উনিশ ও বিশ শতকের ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের সঙ্গে এর বিস্ময়কর সাদৃশ্য চোখে পড়ে। শক্তির প্রদর্শন, অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমে বিশ্বকে নিজেদের স্বার্থে নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতা—এই বৈশিষ্ট্যগুলো একসময় যেমন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পরিচায়ক ছিল, আজ তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নীতিতেও প্রতিফলিত হচ্ছে।

ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ মূলত ‘সভ্যতা বিস্তারের’ নামে শুরু হলেও এর আসল উদ্দেশ্য ছিল সম্পদ লুণ্ঠন, বাজার দখল এবং কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ। ভারতবর্ষ, আফ্রিকা কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটিশ শাসন স্থানীয় জনগণের স্বার্থ রক্ষা করেনি; বরং শোষণ, দমন-পীড়ন ও অর্থনৈতিক নিঃস্বতা তৈরি করেছে। আজ যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি উপনিবেশ স্থাপন না করলেও অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশকে কার্যত পরাধীন করে রাখছে—যাকে অনেকে ‘নব্য-উপনিবেশবাদ’ বলে অভিহিত করেন।

সামরিক আগ্রাসনের দিক থেকেও এই সাদৃশ্য স্পষ্ট। ব্রিটিশরা বিদ্রোহ দমন ও প্রভাব বিস্তারের জন্য সেনাবাহিনী ব্যবহার করত; যুক্তরাষ্ট্রও একইভাবে ‘গণতন্ত্র রক্ষা’, ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ বা ‘মানবাধিকার’ এর মতো নৈতিক অজুহাত সামনে রেখে ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া কিংবা ভিয়েতনামের মতো দেশে সামরিক হস্তক্ষেপ করেছে। ফলাফলও প্রায় একই—রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ধ্বংস, লক্ষুতি মানুষের প্রাণহানি এবং দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা।

অর্থনৈতিক দিক থেকে ব্রিটিশরা উপনিবেশগুলোকে কাঁচামালের উৎস ও নিজেদের শিল্পপণ্যের বাজারে পরিণত করেছিল। আজ যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক, নিষেধাজ্ঞা ও ডলার-নির্ভর বৈশ্বিক অর্থনীতির মাধ্যমে বহু দেশের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে। ঋণ, বাণিজ্য চুক্তি ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে নিজেদের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে বাধ্য করা হচ্ছে—যা উপনিবেশিক শোষণের আধুনিক রূপ।

রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রেও তুলনা প্রাসঙ্গিক। ব্রিটিশরা উপনিবেশগুলোতে নিজেদের অনুগত শাসক বসাত অথবা বিভাজনের রাজনীতি ব্যবহার করত। যুক্তরাষ্ট্রও বিভিন্ন দেশে সরকার পরিবর্তন, নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার কিংবা অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব উসকে দেওয়ার অভিযোগে বারবার অভিযুক্ত হয়েছে। ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতির আধুনিক সংস্করণ আজও বিশ্ব রাজনীতিতে কার্যকর।

সবচেয়ে বড় মিলটি হলো শক্তির একচেটিয়া ব্যবহারের মানসিকতা। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য নিজেকে বিশ্বশাসনের স্বাভাবিক অধিকারী মনে করত; যুক্তরাষ্ট্রও নিজেদের ‘বিশ্বের পুলিশ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনেক সময় উপেক্ষিত হয়, যদি তা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়—যেমনটি একসময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ক্ষেত্রেও দেখা গিয়েছিল।

অতএব বলা যায়, ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ ও বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক আগ্রাসন ইতিহাসের দুটি ভিন্ন অধ্যায় হলেও তাদের মূল চরিত্রে গভীর সাদৃশ্য রয়েছে। পার্থক্য শুধু রূপ ও ভাষায়—তখন ছিল সরাসরি শাসন, আজ আছে সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্যের সূক্ষ্ম জাল। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করা জরুরি, কারণ ইতিহাস বুঝতে পারলেই ভবিষ্যতে নতুন উপনিবেশবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সচেতন ও প্রতিরোধী হওয়া সম্ভব।