‘আপু’ সম্বোধন ঘিরে ইউএনও–আয়োজকের বাগবিতণ্ডা: সামাজিক মাধ্যমে তীব্র বিতর্ক
- Update Time : ১১:৩৭:১৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬
- / ১৭৭ Time View

লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলায় একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে ‘আপু’ সম্বোধনকে কেন্দ্র করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামিমা আক্তার জাহানের সঙ্গে অনুষ্ঠানের আয়োজকের বাগবিতণ্ডার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসনিক আচরণ, শিষ্টাচার এবং নাগরিকের ভাষা ব্যবহারের স্বাধীনতা—সব মিলিয়ে এটি এখন একটি আলোচিত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কালীগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়া সংগঠন ‘রয়েল ফুটবল একাডেমি’র ১০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সম্প্রতি একটি চড়ুইভাতি বা পিকনিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। আয়োজনে অংশ নেন একাডেমির সদস্য, শুভানুধ্যায়ী ও স্থানীয় ক্রীড়ানুরাগীরা। অনুষ্ঠান চলাকালে একাডেমির একজন সদস্য বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি)-তে সুযোগ পাওয়ায় তাকে সংবর্ধনাও দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠান শেষ হতে রাত প্রায় ১২টা বেজে গেলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামিমা আক্তার জাহান একাডেমির সহসভাপতি মেহেরবান মিঠুকে ফোন করে অনুষ্ঠানের অবস্থা ও অনুমতির বিষয় জানতে চান। ফোনালাপে মিঠু ইউএনওকে জানান, বিকেএসপিতে সুযোগ পাওয়া খেলোয়াড়কে সংবর্ধনা দেওয়ার কারণে অনুষ্ঠান শেষ হতে কিছুটা দেরি হচ্ছে এবং খুব শিগগিরই তা শেষ হয়ে যাবে।
ফোনালাপের একপর্যায়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মেহেরবান মিঠু বলেন, “এখনই শেষ হয়ে যাবে, আপু।” অভিযোগ অনুযায়ী, এই ‘আপু’ সম্বোধন শুনেই ইউএনও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। ফোনালাপের একটি অংশ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সেখানে ইউএনওকে বলতে শোনা যায়, “আমি আপনার আপু নই—ফর ইউর কাইন্ড ইনফরমেশন। অনুমতি নেওয়ার সময় তো এত রাত হওয়ার কথা ছিল না। আপনি কি এই অনুষ্ঠানের অনুমতি নিতে এসেছিলেন?”
মেহেরবান মিঠু পরে জানান, তিনি নিজে সরাসরি অনুমতি নিতে উপস্থিত ছিলেন না। ইউএনওর কঠোর মনোভাব ও বক্তব্যে তিনি বিব্রত হন এবং পরিস্থিতি শান্ত করতে দুঃখ প্রকাশ করেন। এরপর দ্রুত অনুষ্ঠানটি সমাপ্ত করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
ঘটনার পরপরই বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। নেটিজেনদের প্রতিক্রিয়া ছিল বিভক্ত। একদল মনে করেন, সরকারি কর্মকর্তাদের ‘স্যার’ বা ‘ম্যাম’ বলে সম্বোধন করার কোনো সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নেই এবং ‘আপু’ একটি প্রচলিত, সম্মানসূচক ও শালীন সম্বোধন। তাঁদের মতে, এ ধরনের সম্বোধন নিয়ে ক্ষুব্ধ হওয়া প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গির সংকীর্ণতাকেই প্রকাশ করে।
অন্যদিকে, কেউ কেউ প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও নিয়ম-নীতির বিষয়টি সামনে এনে বলেন, অনুমতি ছাড়া গভীর রাত পর্যন্ত অনুষ্ঠান চলা ঠিক নয় এবং সরকারি কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কঠোর হতে পারেন। তাঁদের মতে, বিষয়টিকে শুধুমাত্র সম্বোধনের প্রশ্নে না দেখে প্রশাসনিক দায়িত্বের দিক থেকেও বিবেচনা করা উচিত।
এ বিষয়ে রয়েল ফুটবল একাডেমির সহসভাপতি মেহেরবান মিঠু গণমাধ্যমকে বলেন, “নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দেরি হওয়ায় আমি বিনয়ের সঙ্গে দুঃখ প্রকাশ করে ‘আপু’ বলেছিলাম। এতে তিনি এতটা ক্ষুব্ধ হবেন, তা কল্পনাও করিনি। পুরো ঘটনাটি আমাদের সবাইকে মানসিকভাবে কষ্ট দিয়েছে।”
তবে অভিযোগটি পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন ইউএনও শামিমা আক্তার জাহান। তিনি বলেন, “আপু বলার কারণে আমি রাগ করিনি। গভীর রাত পর্যন্ত অনুষ্ঠান চলছিল, যা নিয়মবহির্ভূত। সে কারণেই অনুষ্ঠান বন্ধ করতে বলা হয়েছে। বিষয়টি সামাজিক মাধ্যমে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।”
সব মিলিয়ে, একটি সাধারণ সম্বোধনকে কেন্দ্র করে প্রশাসন ও নাগরিকের সম্পর্ক, ক্ষমতার ব্যবহার এবং শালীন আচরণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে এই ঘটনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলমান বিতর্কে অনেকেই মনে করছেন, এ ধরনের বিষয়গুলোতে উভয় পক্ষের সংযম ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাই হতে পারে উত্তরণের পথ।















