“বেড়া যদি ক্ষেত খায়, তাহলে ঠেকাবে কে?” বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাস, দুর্নীতি, খেলাপি ঋণ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়
- Update Time : ১২:২১:৪৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ জানুয়ারী ২০২৬
- / ২৩৫ Time View

বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত ব্যাংকিং খাত একসময় দেশ গঠনের অন্যতম প্রধান সহায়ক শক্তি ছিল। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠনে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই খাত ক্রমেই পরিণত হয়েছে অনিয়ম, দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব, লুটপাট ও খেলাপি ঋণের অভয়ারণ্যে। আজ যে ব্যাংকিং সংকট আমরা প্রত্যক্ষ করছি, তা কোনো হঠাৎ দুর্ঘটনা নয়—এটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও তদারকির ব্যর্থতার ফল।
ব্যাংকিং খাতের অবক্ষয়ের পেছনের ইতিহাস
১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে বেসরকারি ব্যাংকিং সম্প্রসারণের নামে লাইসেন্স বাণিজ্য শুরু হয়। রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংক অনুমোদন, পরিচালনা পর্ষদে অদক্ষ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়োগ এবং ঋণ অনুমোদনে স্বজনপ্রীতির সংস্কৃতি ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়। ব্যাংকগুলো আমানতকারীর অর্থকে পুঁজি হিসেবে না দেখে অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের ব্যক্তিগত তহবিলে পরিণত করে।
খেলাপি ঋণ ও লুটপাট সংস্কৃতি
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ এখন একটি কাঠামোগত রোগ। হাজার হাজার কোটি টাকা ইচ্ছাকৃতভাবে ফেরত না দিয়ে বারবার পুনঃতফসিল, ছাড় ও বিশেষ সুবিধা আদায় করেছে প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতারা। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষ যেখানে একদিন দেরিতে কিস্তি দিলে হয়রানির শিকার হন, সেখানে বড় ঋণখেলাপিরা রাষ্ট্রীয় নীতির আশীর্বাদে বারবার রক্ষা পেয়ে গেছে।
তদারক কর্তৃপক্ষের দায়: বাংলাদেশ ব্যাংক কী করেছিল?
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাংবিধানিক দায়িত্ব ছিল—
- ব্যাংকগুলোর কার্যক্রমে কঠোর নজরদারি
- আমানতকারীর অর্থের সুরক্ষা
- ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ ও দুর্নীতি আগেভাগে শনাক্ত করা
- পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার জবাবদিহি নিশ্চিত করা
কিন্তু বাস্তবতায় দেখা গেছে, বহু ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ছিল নীরব দর্শক। সময়মতো ব্যবস্থা না নেওয়া, রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার, দুর্বল পরিদর্শন ব্যবস্থা এবং কাগুজে রিপোর্টের ওপর নির্ভরতার কারণে সংকট আরও গভীর হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি প্রশ্ন প্রবলভাবে উচ্চারিত হয়েছে—
“বেড়া
যাদের দায়িত্ব ছিল ক্ষেত পাহারা দেওয়া, তারাই যখন ক্ষেত খেতে শুরু করে, তখন সাধারণ নাগরিকের আস্থা ভেঙে পড়াই স্বাভাবিক।
অবশেষে পরিবর্তনের ঘোষণা: ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি
এই প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশ ব্যাংক অবশেষে ব্যাংক তদারকিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে হাঁটছে। প্রথাগত পরিদর্শন পদ্ধতির পরিবর্তে ডেটাভিত্তিক ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি (Risk-Based Supervision – RBS) চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এই ব্যবস্থায়—
- ব্যাংকগুলোর ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী তদারকি হবে
- শুধু নিয়ম মানা নয়, ভবিষ্যৎ ঝুঁকি, ব্যবসায়িক মডেল ও সুশাসন বিশ্লেষণ করা হবে
- দুর্বল ব্যাংক আগেভাগেই শনাক্ত করে সতর্কতা ও নির্দেশনা দেওয়া হবে
- প্রয়োজনে এমডি অপসারণ, পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া ও ব্যাংক রেজুল্যুশন অধ্যাদেশ প্রয়োগ করা হবে
এ লক্ষ্যে তদারকি কাঠামো পুনর্গঠন করে ১৩টি বিভাগের পরিবর্তে ১৭টি বিভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি ‘ব্যাংক সুপারভিশন’ বিভাগ গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি ডিজিটাল ব্যাংকিং, ডেটা বিশ্লেষণ, পেমেন্ট সিস্টেম ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধে নতুন বিভাগ চালু করা হয়েছে। মানিলন্ডারিং তদারকিতে বিএফআইইউ-ধাঁচের আলাদা নজরদারি ব্যবস্থাও যুক্ত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
২০২৮ সাল থেকে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান (IFRS-6) বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে, যা ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক চিত্র প্রকাশে বাধ্য করবে। এতে হিসাব গোপন ও কৃত্রিম মুনাফা দেখানোর সুযোগ অনেকাংশে কমে আসবে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়…
এই সংস্কার কি সত্যিই কার্যকর হবে, নাকি এটি কেবল আরেকটি কাগুজে সংস্কার হয়ে থাকবে? যারা বছরের পর বছর অনিয়ম দেখেও চুপ থেকেছে, তারা কি এবার সত্যিকার অর্থে কঠোর হবে? রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কি নিজের স্বাধীনতা প্রমাণ করতে পারবে?
বাংলাদেশের মানুষ এখন আর শুধু নীতিমালা চায় না—তারা চায় বাস্তব প্রয়োগ, জবাবদিহি ও শাস্তির দৃষ্টান্ত। কারণ ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, আইন যত শক্তই হোক, প্রয়োগ না হলে তার কোনো মূল্য নেই।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি একটি প্রয়োজনীয় ও সময়োপযোগী উদ্যোগ—এ নিয়ে সন্দেহ নেই। তবে অতীতের ব্যর্থতা ভুলে গেলে চলবে না। যদি এবারও তদারককারী প্রতিষ্ঠান নিজেদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তবে জনগণের সেই পুরোনো প্রবাদ আবারও সত্য প্রমাণিত হবে—
“বেড়া যদি ক্ষেত খায়, তাহলে ঠেকাবে কে?”
এবার সময় এসেছে, বেড়াকেই আগে শোধরানোর।














