উত্তাল বিশ্ব ও মানব ইতিহাসের ঘূর্ণিঝড়- ২০২৫
- Update Time : ০৯:৪৬:৩৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী ২০২৬
- / ১৬৯ Time View

আগুনে ঘেরা এক গ্রহ: যুদ্ধ, সংকট ও অস্থিরতায় সংজ্ঞায়িত ২০২৫
২০২৫ সাল একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে অস্থির, সহিংস ও উত্তাল সময়গুলোর একটি হিসেবে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এই বছরজুড়ে বিশ্ব যেন বারবার আরও বড় সংঘাতের কিনারায় দাঁড়িয়ে পড়েছিল। বিভিন্ন মহাদেশে সশস্ত্র সংঘাত তীব্রতর হয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধগুলো থামেনি, বরং নতুন নতুন উত্তেজনাকেন্দ্র তৈরি হয়েছে—যা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার গভীর ভাঙনকে নগ্নভাবে সামনে এনেছে। বৈশ্বিক সংঘাত পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুদ্ধ ও সহিংসতায় বিশ্বজুড়ে প্রাণ হারিয়েছেন ২ লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি মানুষ—যা সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ সংখ্যা।
এই সময়কে আরও আতঙ্কজনক করে তুলেছে কেবল প্রাণহানির পরিমাণ নয়, বরং এর ভয়াবহ মানবিক মূল্য। কোটি কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, বহু অঞ্চলে মৌলিক অবকাঠামো ভেঙে পড়েছে, আর আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা ব্যবস্থা হিমশিম খেয়েছে পরিস্থিতি সামাল দিতে। পূর্ব ইউরোপ থেকে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা—সবখানেই যুদ্ধের সীমারেখা ঝাপসা হয়ে গিয়ে সাধারণ নাগরিকদের জীবন সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
১. বৈশ্বিক যুদ্ধ ও সশস্ত্র সংঘাতের ভয়াবহ বিস্তার
ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধ: যার কোনো শেষ দেখা যাচ্ছে না
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ ২০২৫ সালে এসে চতুর্থ বছরে পা দেয়, কিন্তু কোনো টেকসই শান্তিচুক্তির আভাস দেখা যায়নি। বরং যুদ্ধটি রূপ নেয় দীর্ঘস্থায়ী ‘ক্ষয়যুদ্ধ’-এ। রাশিয়া নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও ভারী গোলাবর্ষণের মাধ্যমে ইউক্রেনের বিদ্যুৎকেন্দ্র, পরিবহন ব্যবস্থা ও নগর এলাকাকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।
এর ফলে ইউক্রেনে বারবার বিদ্যুৎ বিভ্রাট, পানির সংকট ও তীব্র শীতকালে তাপমাত্রাজনিত মানবিক দুর্ভোগ দেখা দেয়। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন হয়ে ওঠে টিকে থাকার এক নিরন্তর সংগ্রাম। স্কুল অনিয়মিতভাবে চালু থাকে, হাসপাতালগুলো জরুরি পরিস্থিতিতে কাজ করে, আর লাখ লাখ মানুষ হয় দেশের ভেতরে বাস্তুচ্যুত নয়তো বিদেশে শরণার্থী।
ন্যাটো ও পশ্চিমা মিত্রদের অব্যাহত সামরিক ও আর্থিক সহায়তা সত্ত্বেও ইউক্রেনকে একদিকে নিজের ভূখণ্ড রক্ষা করতে হয়েছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখার কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে।
এই যুদ্ধ বৈশ্বিক ভূরাজনীতিকে আমূল বদলে দিয়েছে। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অনুষ্ঠিত ২০২৫ সালের ন্যাটো সম্মেলনে সদস্য রাষ্ট্রগুলো প্রতিরক্ষা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো, আধুনিক সামরিক সক্ষমতা গড়ে তোলা এবং পারস্পরিক সামরিক সমন্বয় জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই সংঘাত ন্যাটোর কৌশলগত অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণ করেছে এবং বড় আকারের রাষ্ট্রীয় যুদ্ধের আশঙ্কাকে আবারও বৈশ্বিক বাস্তবতায় ফিরিয়ে এনেছে।
গাজা সংকট: ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি আর অনন্ত দুর্ভোগ
২০২৫ সালে ইসরায়েল–হামাস সংঘাত বিশ্বের অন্যতম আবেগঘন ও কূটনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর সংকট হিসেবে রয়ে গেছে। বছরজুড়ে কয়েক দফা সাময়িক যুদ্ধবিরতি হলেও সেগুলো ছিল ক্ষণস্থায়ী ও ভঙ্গুর। পর্যায়ক্রমে রকেট হামলা, বিমান আক্রমণ ও স্থল অভিযান চলতেই থাকে।
গাজা উপত্যকা ভয়াবহ মানবিক সংকটে নিমজ্জিত হয়। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও বিদ্যুতের তীব্র ঘাটতি, ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো ও সীমিত প্রবেশাধিকার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বারবার দুর্ভিক্ষসদৃশ পরিস্থিতি ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার সম্পূর্ণ ধসের আশঙ্কা প্রকাশ করে।
যুক্তরাষ্ট্র, মিসর ও কাতারের নেতৃত্বে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা মানবিক করিডোর সচল রাখা, জিম্মি মুক্তি ও আঞ্চলিক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোর দিকে মনোযোগী ছিল। তবে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধান না থাকায় গাজা সংকট এক প্রকার ‘স্থায়ী জরুরি অবস্থা’ হিসেবেই রয়ে যায়।
সুদান: বিশ্বের ভয়াবহতম মানবিক বিপর্যয়গুলোর একটি
২০২৫ সালের সবচেয়ে ভয়াবহ অথচ তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত সংঘাতের একটি ঘটে সুদানে। সুদানিজ সশস্ত্র বাহিনী (SAF) ও র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (RSF)-এর মধ্যে গৃহযুদ্ধ দেশটিকে সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খলায় নিমজ্জিত করে।
২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রাণহানির সংখ্যা দেড় লাখ ছাড়ায় এবং প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়—দেশের ভেতরে ও সীমান্ত পেরিয়ে। পুরো এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়, হাসপাতাল লুট হয়, মানবিক সহায়তাকর্মীরাও হামলার শিকার হন। গণহত্যা, যৌন সহিংসতা ও জাতিগত নিধনের খবর বিশ্ব বিবেককে নাড়িয়ে দেয়।
আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থাগুলো সুদানকে বিশ্বের সবচেয়ে মারাত্মক মানবিক সংকটগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করলেও কার্যকর আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ সীমিতই থেকে যায়। এই সংকট রাষ্ট্রব্যবস্থার ভঙ্গুরতা ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোর ব্যর্থতাকে স্পষ্ট করে তোলে।
২. আঞ্চলিক অস্থিরতা ও গণঅসন্তোষ
গ্রিসে কৃষক বিক্ষোভ: ইউরোপের অর্থনৈতিক ক্ষোভ
গ্রিসে হাজার হাজার কৃষক ভর্তুকি বিলম্ব, জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধি এবং পশুরোগ সংকটের প্রতিবাদে রাজপথে নামেন। মহাসড়ক অবরোধ, সীমান্ত বন্ধ এবং দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলন ইউরোপজুড়ে কৃষি খাতের সংকটকে সামনে আনে।
কিনশাসা দাঙ্গা: কঙ্গোতে ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতা
ডিআর কঙ্গোর রাজধানী কিনশাসায় এম২৩ বিদ্রোহীদের অগ্রগতি ও আন্তর্জাতিক নিষ্ক্রিয়তার প্রতিবাদে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। দূতাবাস ও জাতিসংঘ কার্যালয়েও হামলা হয়, যা রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের দুর্বলতা প্রকাশ করে।
মালিতে গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলন
সামরিক জান্তা রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ও ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার উদ্যোগ নিলে মালিতে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। এই আন্দোলন পশ্চিম আফ্রিকায় সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে জনরোষের প্রতিফলন।
৩. জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত বিপর্যয়
২০২৫ সালে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা ও দাবানলে বিশ্বজুড়ে বিমাকৃত ক্ষতির পরিমাণ ছাড়ায় ১২০ বিলিয়ন ডলার। এটি ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল জলবায়ু বিপর্যয়গুলোর একটি।
বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেন, ২০২৫ ছিল রেকর্ডকৃত তিনটি সবচেয়ে উষ্ণ বছরের একটি। ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস সীমা অতিক্রম করে তাপমাত্রা জলবায়ু সংকটকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।
৪. বৈশ্বিক কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্মেলন
জি২০ জোহানেসবার্গ সম্মেলন: আফ্রিকায় ইতিহাস
প্রথমবারের মতো আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত জি২০ সম্মেলনে বৈশ্বিক বৈষম্য, জলবায়ু অর্থায়ন ও দক্ষিণ–দক্ষিণ সহযোগিতা গুরুত্ব পায়।
ন্যাটো ও ব্রিকস সম্মেলন
ন্যাটো সম্মেলনে প্রতিরক্ষা জোরদার করার সিদ্ধান্ত হয়। ব্রিকস সম্মেলনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ ও বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার আহ্বান জানানো হয়।
৫. অর্থনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
২০২৫ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতি ধীরে স্থিতিশীল হলেও বাণিজ্য যুদ্ধ ও শুল্ক রাজনীতি উত্তেজনা বাড়ায়। একই সঙ্গে mRNA প্রযুক্তিভিত্তিক সার্বজনীন ক্যানসার ভ্যাকসিনের সম্ভাবনা মানবজাতির জন্য নতুন আশার আলো জ্বালায়।
এক পরিবর্তনশীল পৃথিবী
২০২৪–২০২৫ সময়কাল মানবজাতির জন্য এক সন্ধিক্ষণ:
- যুদ্ধ ও মানবিক সংকট বৈশ্বিক জোট পুনর্গঠন করেছে
- জলবায়ু পরিবর্তন অস্তিত্বের সংকটকে তীব্র করেছে
- কূটনীতি নতুন শক্তিকেন্দ্রের জন্ম দিয়েছে
- প্রযুক্তি ও অর্থনীতি ভবিষ্যৎকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে
সব মিলিয়ে ২০২৫ এক চাপগ্রস্ত, সংকটময় কিন্তু তবু সহযোগিতা ও অগ্রগতির আশায় এগিয়ে চলা পৃথিবীর প্রতিচ্ছবি।














