দেশের ক্রান্তিলগ্নে দেশ ও জনগণ হারালো মা ও অভিভাবককে
- Update Time : ১১:২১:৪০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫
- / ১৮৩ Time View

বাংলাদেশ আজ এক গভীর শোকের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোরের আলো ফোটার পর, ফজরের ঠিক পরেই তার ইন্তেকালে শুধু একটি রাজনৈতিক দলের নয়—সমগ্র জাতির জীবনে নেমে এসেছে এক অপূরণীয় শূন্যতা। দেশের ক্রান্তিকালে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও গণতন্ত্রের প্রশ্নবিদ্ধ বাস্তবতায়, জনগণ হারালো এক অভিজ্ঞ অভিভাবককে, আর বিএনপি হারালো তার রাজনৈতিক মাকে।
বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন কেবল একজন রাজনীতিক নন; তিনি ছিলেন এক সংগ্রামী নারীর প্রতীক, যিনি প্রতিকূলতা, দমন-পীড়ন ও ষড়যন্ত্রের ভেতর দিয়েও দীর্ঘদিন রাজনীতির কেন্দ্রে অবস্থান করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস, লিভার সিরোসিস, কিডনি জটিলতা ও অন্যান্য শারীরিক সমস্যায় ভুগলেও শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ছিলেন দলের ঐক্যের প্রতীক, কর্মীদের অনুপ্রেরণার উৎস। তার মৃত্যুর খবরে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের চোখে যেমন অশ্রু, তেমনি সাধারণ মানুষের মাঝেও দেখা গেছে গভীর বেদনা।
একটি জাতির ইতিহাসে কিছু মানুষ থাকেন, যারা ব্যক্তি পরিচয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে প্রতীকে রূপ নেন। বেগম খালেদা জিয়া তেমনই একজন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকারপ্রধান—এই তথ্যগুলো নিছক পরিসংখ্যান নয়; এগুলো একটি রক্ষণশীল সমাজে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের এক সাহসী উদাহরণ। ১৯৯১ সালে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের নির্বাচনে তার নেতৃত্বে সরকার গঠন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক। সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বহুদলীয় রাজনীতির বিকাশে তার ভূমিকা আজও স্মরণীয়।
তার রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি অনন্য দিক হলো—তিনি কখনো কোনো আসনে পরাজিত হননি। একাধিক আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রতিবারই জনগণের সমর্থন পেয়েছেন। এই ধারাবাহিকতা কেবল জনপ্রিয়তার প্রমাণ নয়; এটি তার রাজনৈতিক আস্থার ভিত্তিকে দৃঢ়ভাবে নির্দেশ করে। তবে তার জীবনের শেষ অধ্যায় ছিল বেদনাদায়ক—দীর্ঘ কারাবাস, চিকিৎসা সংকট, বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি না পাওয়া—সব মিলিয়ে তিনি যেন রাষ্ট্রের কাছ থেকেই পেয়েছেন সবচেয়ে নির্মম অবহেলা। এই বাস্তবতা ইতিহাসের কাঠগড়ায় একদিন কঠোর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে।
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতি ছিল মূলত প্রতিরোধের রাজনীতি। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর তিনি যে রাজনৈতিক পথে হাঁটা শুরু করেন, তা সহজ ছিল না। একজন গৃহিণী থেকে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে উঠে আসা—এটি নিছক ভাগ্যের খেলা নয়; এটি দৃঢ়তা, আত্মত্যাগ ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ফল। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, ভোটাধিকারের প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন। বহুবার আপসের প্রস্তাব এলেও তিনি রাজনৈতিক আদর্শ থেকে সরে আসেননি—এটাই তাকে তার অনুসারীদের কাছে “মা” করে তুলেছিল।
আজ দেশের যে রাজনৈতিক সংকট—নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা, বিরোধী কণ্ঠের সংকোচন, গণতন্ত্রের শ্বাসরুদ্ধ অবস্থা—এই সময়টিতে তার অনুপস্থিতি সবচেয়ে বেশি অনুভূত হবে। বিএনপি নেতৃত্বের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তার রেখে যাওয়া রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে দায়িত্বশীলভাবে বহন করা। আবেগ নয়, ঐক্য; প্রতিশোধ নয়, গণতন্ত্র—এই দর্শনই ছিল তার রাজনীতির মর্মকথা।
রাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও এই মুহূর্তে দায়িত্বশীলতা প্রত্যাশিত। রাজনৈতিক মতভেদ ভুলে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও প্রবীণ নেত্রীর প্রতি রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও সম্মান প্রদর্শন কেবল সৌজন্যের বিষয় নয়—এটি জাতির রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরীক্ষাও। ইতিহাস নির্মম হলেও ন্যায়বিচারপ্রবণ; আজকের আচরণই আগামী দিনের মূল্যায়ন নির্ধারণ করবে।
দেশের ক্রান্তিলগ্নে বেগম খালেদা জিয়ার বিদায় আমাদের মনে করিয়ে দেয়—রাজনীতি কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, এটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার ধারক। তিনি ছিলেন সেই আশার এক দৃঢ় আশ্রয়। আজ তিনি নেই, কিন্তু তার সংগ্রাম, তার দৃঢ়তা ও তার গণতান্ত্রিক স্বপ্ন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। শোকাহত পরিবার, দল ও জাতির প্রতি গভীর সমবেদনা।














