ইন্ডিয়া দ্য মাদার অফ কিলারস অ্যান্ড ফ্যাসিস্ট
- Update Time : ১১:৫৮:৪৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫
- / ১৯০ Time View

ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে ভৌগোলিক অবস্থান, অভিন্ন ইতিহাস, অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার বাস্তবতা দ্বারা গঠিত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে স্পষ্ট টানাপোড়েন দেখা যাচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে—ভারত এমন কিছু বাংলাদেশি রাজনৈতিক ব্যক্তিকে আশ্রয় দিচ্ছে, যাদের বিরুদ্ধে কর্তৃত্ববাদী শাসন, দুর্নীতি ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। এই অভিযোগ দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন করে চাপের মুখে ফেলেছে।
বাংলাদেশের ভেতরের সমালোচকদের মতে, সাবেক ক্ষমতাসীন দলের একাধিক নেতা, মন্ত্রী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি—যাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশি আইনে মামলা রয়েছে—বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সহিংসতা, জোরপূর্বক গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং বড় অঙ্কের দুর্নীতির মতো অভিযোগ তদন্তাধীন বা বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলার একটি অংশ যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও বিশেষ আদালতের আওতাভুক্ত বলেও দাবি করা হচ্ছে।
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিরোধী দল ও মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, তাঁর শাসনামলে রাষ্ট্রব্যবস্থা ক্রমেই কর্তৃত্ববাদী রূপ নেয়। রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে ভিন্নমত দমনের মতো অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা ও সাবেক মন্ত্রীর বিরুদ্ধেও গুরুতর অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে এবং তাঁদের অনেকেই বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন বলে দাবি করা হয়।
বাংলাদেশ সরকার ও নাগরিক সমাজের একটি অংশের বক্তব্য, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তি ও আইনি সহযোগিতা কাঠামো থাকা সত্ত্বেও অভিযুক্তদের ফেরত না দেওয়ায় বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাঁদের মতে, এই অনাগ্রহ বা বিলম্ব একটি নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে—যেখানে জবাবদিহি, আইনের শাসন ও সার্বভৌম বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি সম্মানের চেয়ে রাজনৈতিক হিসাবকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
এই ইস্যুটি বাংলাদেশে জনমনে গভীর অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। অনেক নাগরিক এটিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছেন এবং গণতন্ত্র ক্ষুণ্নের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পরোক্ষ সুরক্ষা হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। এর ফলে জনমত প্রভাবিত হচ্ছে এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ আরও জটিল হয়ে উঠছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দেন, প্রত্যর্পণ একটি আইননির্ভর প্রক্রিয়া—যা চুক্তি, প্রমাণের মানদণ্ড এবং বিচারিক পর্যালোচনার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তবে তাঁদের মতে, গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে সহযোগিতায় দীর্ঘসূত্রতা বা স্পষ্ট অনীহা দ্বিপাক্ষিক আস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। সমালোচকদের যুক্তি, ভারত যদি নিজেকে গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের পক্ষে আঞ্চলিক নেতৃত্ব হিসেবে তুলে ধরে, তবে প্রতিবেশী দেশের গুরুতর অপরাধে অভিযুক্তদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে দেখা যাওয়াটা সমীচীন নয়।
এই বিষয়ে সম্পর্কের অবনতি কেবল রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত দিকেও প্রভাব ফেলতে পারে। বাণিজ্য, পানি বণ্টন, সীমান্ত নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা এবং দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক স্থিতিশীলতা—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পড়ার আশঙ্কা করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা। ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিয়ে অমীমাংসিত ক্ষোভ দীর্ঘমেয়াদে আঞ্চলিক সহযোগিতাকে দুর্বল করতে পারে।
এ কারণেই বাংলাদেশের বিভিন্ন মহল ভারত সরকারকে তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানাচ্ছে। আইনি সহযোগিতা কাঠামো সম্মান করা এবং বিচারিক প্রক্রিয়াকে স্বাভাবিক গতিতে চলতে দেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে। তাঁদের মতে, অভিযুক্তদের বিচার মোকাবিলার জন্য বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হলে শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কই মজবুত হবে না, বরং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও আঞ্চলিক ন্যায়বিচারের প্রতিও ভারতের অঙ্গীকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।
শেষ পর্যন্ত, ভারত–বাংলাদেশের টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক নির্ভর করে পারস্পরিক আস্থা, স্বচ্ছতা এবং একে অপরের আইনগত প্রতিষ্ঠানের প্রতি সম্মানের ওপর। আইনসম্মত ও সহযোগিতামূলক উপায়ে এসব অভিযোগের সমাধান করা গেলে সম্পর্কের আরও অবনতি রোধ করা সম্ভব হবে এবং দুই প্রতিবেশীর মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও গঠনমূলক অংশীদারিত্বের পথ প্রশস্ত হতে পারে।














