যখন চিকিৎসা সেবা হয়ে ওঠে ব্যবসা, এবং ডাক্তাররা তাদের শপথ ভুলে যান
- Update Time : ০৮:৪০:১২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫
- / ১৬১ Time View

বিশ্বজুড়ে চিকিৎসা সেবা আজ ক্রমেই একটি মৌলিক মানবাধিকার থেকে বিশেষ সুবিধায় পরিণত হচ্ছে। চিকিৎসক মানেই জীবনরক্ষক—এই বিশ্বাসের ওপরই চিকিৎসা পেশার ভিত্তি। মানবতার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার অঙ্গীকার, রোগীর কল্যাণকে ব্যক্তিগত লাভের ঊর্ধ্বে রাখার শপথ—এই সবকিছু নিয়েই গড়ে উঠেছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের নৈতিক কাঠামো। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আজ পৃথিবীর বহু দেশে চিকিৎসা সেবা সবচেয়ে ব্যয়বহুল খাতগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
উন্নত ও উন্নয়নশীল—উভয় ধরনের দেশেই চিকিৎসকের ফি, ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা, হাসপাতালের বিল এবং ওষুধের দাম ভয়াবহ হারে বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইউরোপ, ভারত-বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানসহ গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় চিকিৎসা অনেক ক্ষেত্রেই কেবল তাদের জন্যই উন্মুক্ত, যাদের অর্থ আছে। টাকা না থাকলে উন্নত চিকিৎসা তো দূরের কথা, সময়মতো ন্যূনতম সেবা পাওয়াও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
দক্ষিণ এশিয়া: দারিদ্র্যের সঙ্গে চিকিৎসা ব্যয়ের লড়াই
দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষের আবাসস্থল। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান অর্থনৈতিক অগ্রগতির কথা বললেও বাস্তবতা হলো—এই অঞ্চলের বিপুল জনগোষ্ঠী এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বা তার কাছাকাছি জীবনযাপন করছে। এসব মানুষের কাছে সাধারণ চিকিৎসা ব্যয়ই হয়ে ওঠে জীবনের সবচেয়ে বড় সংকট।
সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর উপচে পড়া ভিড়, জনবল সংকট এবং সীমিত সুযোগ-সুবিধা নিত্যদিনের বাস্তবতা। চিকিৎসা পেতে রোগীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কখনো দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়। এই পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে তারা বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের দিকে ঝুঁকে পড়ে, যেখানে পরামর্শ ফি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অস্ত্রোপচার এবং হাসপাতালে থাকার খরচ এত বেশি যে দরিদ্র মানুষের পক্ষে তা বহন করা প্রায় অসম্ভব। অনেক পরিবার জমি, গবাদিপশু, গহনা বিক্রি করতে বাধ্য হয় কিংবা চড়া সুদে ঋণ নেয়—যার বোঝা টেনে নিতে হয় আজীবন।
শপথ বনাম বাজারব্যবস্থা
চিকিৎসাবিজ্ঞানের মূল উদ্দেশ্য মানবতার সেবা। কিন্তু বাণিজ্যিকীকরণ চিকিৎসা ব্যবস্থার চরিত্রই পাল্টে দিয়েছে। বহু ক্ষেত্রে করপোরেট হাসপাতাল, ওষুধ কোম্পানি ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের চাপ চিকিৎসকদের রোগীর চেয়ে লাভের কথা ভাবতে বাধ্য করছে। অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা, ব্যয়বহুল পদ্ধতি এবং দামি ব্র্যান্ডের ওষুধ ব্যবহারের প্রবণতা রোগীর আর্থিক কষ্ট আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এই বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি বেদনাদায়ক প্রশ্ন তুলে ধরে—কিছু চিকিৎসক কি তাঁদের শপথ ভুলে যাচ্ছেন? অবশ্যই এখনো অসংখ্য চিকিৎসক আছেন, যারা সততা, মানবিকতা ও আত্মত্যাগের সঙ্গে মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন। তবে অস্বীকার করার উপায় নেই যে, অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হচ্ছে রোগীর প্রয়োজন নয়, বরং আর্থিক লাভের হিসাব দিয়ে।
মৌলিক অধিকার হয়েও অধরা চিকিৎসা
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালা অনুযায়ী, চিকিৎসা সেবা প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। আয়, সামাজিক অবস্থান বা বসবাসের জায়গা নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে এই অধিকার অনেক দেশেই কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে তো বটেই, এমনকি অনেক উন্নত দেশেও টাকা না থাকলে চিকিৎসা কার্যত অপ্রাপ্য। জরুরি চিকিৎসা হয়তো দেওয়া হয়, কিন্তু ক্যানসার, হৃদরোগ, কিডনি বিকলতা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসা দরিদ্র মানুষের জন্য প্রায় অসম্ভব। ধনী ও দরিদ্র রোগীর মধ্যে চিকিৎসা পাওয়ার ব্যবধান দিন দিন আরও বাড়ছে।
সামনে যাওয়ার পথ
চিকিৎসা ব্যবস্থাকে তার নৈতিক ভিত্তিতে ফিরিয়ে আনতেই হবে। সরকারকে সরকারি স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে, বেসরকারি চিকিৎসা খরচ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে এবং রোগীদের শোষণ থেকে রক্ষা করতে হবে। একই সঙ্গে চিকিৎসকদের এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে তারা করপোরেট চাপমুক্ত থেকে নৈতিকভাবে চিকিৎসা করতে পারবেন।
এ ছাড়া সমাজের দায়িত্ব হলো—যেসব চিকিৎসক তাঁদের শপথ অটুট রেখে দরিদ্র ও অসহায়ের পাশে দাঁড়ান, তাঁদের সম্মান ও উৎসাহ দেওয়া। চিকিৎসা কোনো বিলাসপণ্য হতে পারে না; এটি রাষ্ট্র, চিকিৎসক এবং সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব।
যখন সুস্থ হওয়ার মূল্য অত্যধিক হয়ে যায়, তখন মানবতাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যে পৃথিবীতে কেবল টাকার বিনিময়ে চিকিৎসা পাওয়া যায়, সে পৃথিবী তার মানুষের প্রতি ব্যর্থ। চিকিৎসাবিজ্ঞান মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য—জীবনের মূল্য আর্থিক সামর্থ্য দিয়ে মাপার জন্য নয়। যতদিন না চিকিৎসা সবার জন্য সহজলভ্য হয়, বিশেষ করে দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, ততদিন ন্যায়বিচার, সমতা ও মানব মর্যাদার প্রতিশ্রুতি অপূর্ণই থেকে যাবে।














