৩২ ঘণ্টা পর ৪০ ফুট গভীর নলকূপের গর্ত থেকে উদ্ধার দুই বছরের সাজিদ
- Update Time : ০৯:৪৮:৩৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫
- / ২০৩ Time View

রাজশাহীর তানোর উপজেলার কোয়েলহাট পূর্বপাড়া গ্রামে পরিত্যক্ত নলকূপের গভীর গর্তে পড়ে নিখোঁজ হওয়া দুই বছরের শিশু সাজিদকে টানা ৩২ ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর উদ্ধার অভিযানের পর অবশেষে অচেতন অবস্থায় জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর) রাত ৯টার দিকে মাটির প্রায় ৪০ ফুট গভীর অন্ধকার সুড়ঙ্গ থেকে তাকে বের করে আনতে সক্ষম হয় ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল।
ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেলের কর্মকর্তা তালহা জুবায়ের ইত্তেফাক ডিজিটালকে বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “আমরা শিশুটিকে উদ্ধার করেছি, তবে সে জীবিত না মৃত—এ মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। উদ্ধার করার পরই দ্রুত তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হচ্ছে। বিস্তারিত শিগগির জানানো হবে।”
দুপুরে গর্তে পড়ে নিখোঁজ, মুহূর্তেই বদলে যায় পুরো গ্রাম
বুধবার দুপুর সোয়া ১টার দিকে কোয়েলহাট পূর্বপাড়া গ্রামের ফসলের মাঠে খেলতে খেলতে সাজিদ হঠাৎ মাটির নিচে থাকা একটি পুরনো নলকূপের গর্তে পড়ে যায়। গর্তটি সরু ও গভীর হওয়ায় মুহূর্তেই শিশুটি নিচে আটকে যায় এবং চারপাশের মানুষদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়রা প্রথমে বাঁশ, দড়ি ও স্থানীয় যন্ত্রপাতি দিয়ে উদ্ধার করার চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হন। পরে সংবাদ পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের তানোর, রাজশাহী সদর ও চারঘাট স্টেশনের তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা জীবন-মৃত্যুর লড়াই
দীর্ঘ ৩২ ঘণ্টার অভিযান জুড়ে ফায়ার সার্ভিস শিশুটিকে জীবিত রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে।
- গর্তের ভেতরে নিয়মিত অক্সিজেন সরবরাহ করা হয়,
- শিশুটির নড়াচড়া শনাক্ত করতে বিশেষ ক্যামেরা নামানো হয়,
- গর্ত ধসে পড়া প্রতিরোধে কাঠ ও লোহার সাপোর্ট দেওয়া হয়।
বুধবার বিকেল ৫টা ৩০ মিনিট থেকে উদ্ধারকাজে নতুন কৌশল নেয়া হয়—গর্তের পাশেই স্কেভেটর দিয়ে সমান্তরাল আরেকটি পথ খোঁড়া শুরু করা হয়, যাতে নীচে পৌঁছে শিশুটিকে পাশ থেকে বের করা যায়। এ কাজে ব্যবহারের জন্য দুটি ট্র্যাক্টরও মাঠে আনা হয়।
ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত তারা প্রায় ৪২ ফুট মাটি খুঁড়েছে। তারপর রাতে অবশেষে শিশু সাজিদকে হাতের নাগালে পায় উদ্ধারকারীরা এবং নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা শেষে তাকে তুলে আনতে সক্ষম হয়।
গর্তের ইতিহাস: কেন খুলে গেল মৃত্যুফাঁদ?
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, কোয়েলহাট গ্রামে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নিচে নেমে যাওয়ায় একজন গ্রামবাসী পানির স্তর পরীক্ষা করতে বেশ কয়েক বছর আগে ওই গর্তটি করেন। পরে তা বালু-মাটি দিয়ে ভরাট করা হয়। কিন্তু এই বর্ষায় জমিতে পানি জমে থাকায় মাটি নরম হয়ে ধসে পড়ে, ফলে পুরনো সেই গর্তটি আবার খুলে যায়।
দুর্ভাগ্যের বিষয়—ঘটনার দিন সাজিদের মা রুনা খাতুন মাঠে ধানের খড় সংগ্রহ করতে যান। সেখানে খেলতে খেলতেই সাজিদ অসাবধানতাবশত গর্তের মুখে পড়ে যায় এবং পাইপের ভেতর দিয়ে অনেকটা নিচে চলে যায়।
পুরো গ্রামের বুক থমকে ছিল ৩২ ঘণ্টা
ঘটনাস্থলে হাজারো মানুষ জড়ো হয়ে দোয়া, প্রার্থনা আর উদ্বেগ নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। প্রতিটি মিনিট পেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে চাপ বাড়ছিল উদ্ধারকর্মীদের ওপরও। অবশেষে শিশুটিকে উদ্ধার করা হলে现场ে কান্না ও স্বস্তির মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
ফায়ার সার্ভিস বলেছে, “এই ধরনের সরু ও গভীর গর্ত থেকে শিশু উদ্ধার করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তবুও আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি।”















