সংস্কারের সবচেয়ে বড় অন্তরায় আমলাতন্ত্র, তারা যতটুকু চায় সংস্কার ততটুকুই হবে: ইফতেখারুজ্জামান
- Update Time : ০৯:০২:৪৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ ডিসেম্বর ২০২৫
- / ১৩৩ Time View

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, বাংলাদেশে সংস্কারের অগ্রগতি নির্ভর করছে আমলাতন্ত্রের সদিচ্ছা ও অনুমোদনের ওপর, যা দেশের টেকসই উন্নয়ন, জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক শক্তির বিকাশকে গভীরভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। তার ভাষায়, “সংস্কার ততটাই হবে, যতটা আমলাতন্ত্র চায়।”
মঙ্গলবার (৯ ডিসেম্বর) আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস ২০২৫ উপলক্ষে আয়োজিত “কর্তৃত্ববাদ পতন-পরবর্তী বাংলাদেশের গণমাধ্যমের পরিস্থিতি” শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব মন্তব্য করেন। আলোচনার মূল প্রবন্ধে এবং পরবর্তী বক্তৃতায় তিনি প্রশাসনিক সংস্কার, দুর্নীতি দমন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও অন্তর্বর্তী সরকারের আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
আমলাতন্ত্র—বাংলাদেশের সংস্কারের সবচেয়ে বড় বাধা
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জনপ্রশাসন সংস্কারের জন্য শতাধিক সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও মাত্র ১৮টি সুপারিশ বাস্তবায়নের পথে আনা হয়েছে, এবং সেগুলোর প্রথম দিকেই এসেছে “টয়লেট পরিষ্কার”–এর মতো তুচ্ছ বিষয়। তার মতে, এটি প্রমাণ করে যে গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত ও প্রতিষ্ঠানগত সংস্কারকে আমলাতন্ত্র ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে যাচ্ছে।
তিনি উল্লেখ করেন—
- দুদক সংস্কার কমিশনের প্রায় সব প্রস্তাবনায় সব রাজনৈতিক দল একমত।
- কিন্তু বছরের পর বছর ধরে কোনও প্রস্তাবই বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
- অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে “গোপনীয়তা ও অস্বচ্ছতা” বজায় রাখছে।
তার মতে, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন না এলে কোনও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন বাস্তবে রূপ নেবে না। প্রশাসনিক কাঠামোতে জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং কর্তৃত্বের বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া উন্নয়ন কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
গণমাধ্যম সংস্কারে স্থবিরতা—“পাবলিক গুড” সুরক্ষার অভাব
গণমাধ্যম সংস্কার নিয়ে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাষ্ট্র যদি গণমাধ্যমকে পাবলিক গুড হিসেবে সুরক্ষার নিশ্চয়তা দিতে না পারে, তবে গণমাধ্যমে স্থায়ী পরিবর্তন কখনোই সম্ভব হবে না।
তিনি জানান—
- গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন ইতোমধ্যে ধুলা জমাতে শুরু করেছে।
- সুপারিশগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাস্তবায়নের আগেই থেমে গেছে।
- দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
- রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপে গণমাধ্যমের ওপর মানুষের আস্থা ক্ষয়ে গেছে, বিশ্বাসযোগ্যতা কমে গেছে।
তিনি আরও বলেন, অতীতের কর্তৃত্ববাদী শাসনমডেলকে শক্তিশালী করার অন্যতম হাতিয়ার ছিল গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবিত করা, যা সংবাদ পরিবেশন, সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে সংকুচিত করেছে।
৫ আগস্টের পরবর্তী পরিস্থিতি—দখল, চাঁদাবাজি ও মামলা বাণিজ্যের অভিযোগ
ইফতেখারুজ্জামান স্মরণ করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের বিকাল থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে দখল, চাঁদাবাজি, হামলা ও মামলা বাণিজ্যের ঘটনা প্রবলভাবে বৃদ্ধি পায়। তার বক্তব্য—
“এই পুরো প্রক্রিয়ায় গণমাধ্যমের একটি অংশও নীরব সঙ্গী হয়েছে।”
তার মতে—
- বাংলাদেশের কর্তৃত্ববাদ ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে,
- আর গত ১৫ বছরে এসে চরমে পৌঁছেছে।
- সংস্কার কমিশনগুলো থেকে প্রাপ্ত অগ্রাধিকারমূলক করণীয়গুলো থাকলেও সেগুলোর বেশির ভাগই সরকারের সময়ে বাস্তবায়িত হয়নি।
সংস্কারের ভবিষ্যৎ
তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, রাষ্ট্রের কাঠামোতে জবাবদিহির চর্চা ও প্রশাসনিক সংস্কৃতি বদলানো ছাড়া কোনও সংস্কারই দীর্ঘমেয়াদি হবে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের অস্বচ্ছ আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক অভিপ্রায়ের অস্পষ্টতাও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।
ইফতেখারুজ্জামানের মতে—
- গণমাধ্যমকে স্বাধীন ও কার্যকর না করলে গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে না,
- প্রশাসনকে জবাবদিহির আওতায় না আনলে দুর্নীতি কমবে না,
- এবং সংস্কারের প্রকৃত রূপায়ণও সম্ভব হবে না।















