সারা বছরে মাত্র ৯২ দিন ক্লাস: শিখন ঘাটতি নিয়েই বার্ষিক পরীক্ষায় প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা
- Update Time : ১০:৪৫:৪৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০২৫
- / ১০০ Time View

সারা বছরে মাত্র ৯২ দিন ক্লাস: শিখন ঘাটতি নিয়েই বার্ষিক পরীক্ষায় প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা
পরীক্ষা শেষে আরও কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি শিক্ষক নেতা আবুল কাশেমের
দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এমন এক শিক্ষাবর্ষ পার করেছে, যেখানে ৩৬৫ দিনের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে শ্রেণিকক্ষে পাঠ গ্রহণ করেছে মাত্র ৯২ দিন। এটি প্রায় তিন মাসের সমান। বাকি সময়জুড়ে ছুটি, পরীক্ষা, শিক্ষক আন্দোলন, শীত-ঘূর্ণিঝড়সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং পাঠ্যবই বিতরণে দীর্ঘ বিলম্ব শিক্ষার্থীদের শেখার ধারাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে। এমন শিখন ঘাটতি নিয়েই আজ রোববার থেকে শুরু হয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিভিন্ন শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা।
শিক্ষাপঞ্জির হিসাবই বলছে—ব্যাপক শিখন ক্ষতি
২০২৫ সালের শিক্ষাপঞ্জি অনুযায়ী সরকারি ছুটি ছিল ৭৬ দিন। সাপ্তাহিক ছুটি ১০৪ দিন। অর্থাৎ শুধু ছুটির কারণেই ১৮০ দিন স্কুল বন্ধ ছিল।
বাকি থাকল ১৮৫ দিন।
এর মধ্যে আবার—
• বেতন–ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে ৪০ দিন শিক্ষকরা কর্মবিরতি পালন করেন (১৬ দিন পূর্ণদিবস, ২৪ দিন অর্ধদিবস)।
• কর্মবিরতির দিন বাদ দিলে কার্যকর শিক্ষাদিবস থাকে ১৪৫ দিন।
• বছরের বিভিন্ন সময়ে পরীক্ষায় ব্যস্ততা গেছে ২৭ দিন।
• শৈত্যপ্রবাহ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ‘মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি’সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে আরও ১১ দিন ক্লাস বন্ধ ছিল।
• পাঠ্যবই হাতে পেতে শিক্ষার্থীদের জানুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হওয়ায় প্রথম দিককার আরও বেশ কিছু দিন কার্যকর ক্লাস হয়নি।
সব মিলিয়ে দেখা যায়, মোট ক্লাস হয়েছে মাত্র ৯২ দিন, যা একটি শিক্ষাবর্ষের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। ফলে শিক্ষার্থীরা শিখন ঘাটতি নিয়েই পরীক্ষার হলে বসতে বাধ্য হয়েছে।
শিক্ষকদের বদলি ও আন্দোলনে উত্তপ্ত শিক্ষাঙ্গন
দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৬৫ হাজারের বেশি, যেখানে মোট শিক্ষক ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৯৮১ জন। তাদের মধ্যে প্রায় ৩৫ হাজার প্রধান শিক্ষক, বাকিরা সবাই সহকারী শিক্ষক। দেশে প্রাথমিক পর্যায়ের মোট শিক্ষার্থী প্রায় ২ কোটি; এর মধ্যে সরকারি বিদ্যালয়ে পড়ে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ শিশু।
বেতন–ভাতা ও পদোন্নতিসহ তিন দফা দাবিতে টানা কর্মবিরতি, পরীক্ষা বর্জন এবং কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি পালন করেন সহকারী শিক্ষকরা। আন্দোলনের ফলে পরীক্ষার সময় শিক্ষাঙ্গনে তৈরি হয় চরম বিশৃঙ্খলা—কোথাও পরীক্ষা বাতিল, কোথাও অভিভাবক কিংবা উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় আংশিক পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে, তাতেও দেখা দেয় বিভ্রান্তি।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় কঠোর অবস্থান জানালে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে পাঁচ শতাধিক শিক্ষককে বদলি করে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—প্রাথমিক শিক্ষকদের সাধারণত নিজ জেলার মধ্যেই পদায়ন হয়ে থাকে; জেলার বাইরে বদলি খুবই বিরল, যা সাধারণত শাস্তিমূলক পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য হয়। এবার সেই পথেই হেঁটেছে অধিদপ্তর।
নোয়াখালীতেই বদলি হয়েছেন ৪০ শিক্ষক। আন্দোলনকারী শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক মোহাম্মদ শামছুদ্দিন মাসুদ নিজেও নোয়াখালী থেকে বদলি হয়েছেন লক্ষ্মীপুরে। তার দাবি—ব্যাপক বদলি স্পষ্টভাবে আন্দোলন ভাঙার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে।
এক জেলার সব শিক্ষককে শোকজ— নজিরবিহীন ঘটনা
নোয়াখালীর ২৪৩টি বিদ্যালয়ে পরীক্ষা বন্ধ থাকার কারণে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সেসব বিদ্যালয়ের সব শিক্ষককে শোকজ নোটিশ পাঠিয়েছে।
নোটিশে বলা হয়—একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী পরীক্ষা নেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও শিক্ষকরা সরকারি আদেশ অমান্য করে বিদ্যালয় তালাবদ্ধ করেছেন, যা সরকারি চাকরি আইন ও শৃঙ্খলা বিধিমালার লঙ্ঘন।
তাদের তিন কর্মদিবসের মধ্যে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় আগে কখনো এত বড় পরিসরে সমষ্টিগত শোকজের ঘটনা দেখা যায়নি—এটিও শিক্ষাঙ্গনে চলমান অস্থিরতার তীব্রতা নির্দেশ করে।
৩৫০ মাইল দূরত্বে বদলি—ফেসবুক লাইভে শিক্ষক নেতা আবুল কাশেমের ক্ষোভ
প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক আবুল কাশেমকে ময়মনসিংহ থেকে বদলি করা হয়েছে বরিশাল সদরের একটি বিদ্যালয়ে—যার দূরত্ব প্রায় ৩৫০ মাইল।
ফেসবুক লাইভে তিনি বলেন,
“সহকর্মীদের সঙ্গে আমারও এভাবে দূর জেলায় বদলি স্পষ্টতই প্রতিশোধমূলক সিদ্ধান্ত। আন্দোলনকে দমিয়ে রাখতে সরকার এমন অমানবিক পদক্ষেপ নিচ্ছে।”
আরেক শিক্ষক নেতা রোকনুজ্জামান রাসেলকে হালুয়াঘাট থেকে বদলি করা হয়েছে জামালপুরে।
পরীক্ষার স্বার্থে কর্মসূচি শর্তসাপেক্ষে স্থগিত—কিন্তু আন্দোলন চলছে
সহকারী শিক্ষকদের দুই শীর্ষ সংগঠন—
• প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদ
• বাংলাদেশ প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সংগঠন ঐক্য পরিষদ
যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে—নৈতিকতা, মানবিকতা এবং কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্বার্থে পরীক্ষাকে আন্দোলনের বাইরে রাখা হয়েছে।
পরীক্ষা চলবে, তবে দাবি আদায়ের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। ভবিষ্যৎ কর্মসূচি পরে জানানো হবে।
শিখন ঘাটতি পূরণের পথ কোথায়?
দেশের সবচেয়ে বড় শিক্ষাব্যবস্থা—প্রাথমিক শিক্ষা—দীর্ঘদিন ধরে নানা সংকটের মধ্যে রয়েছে। শিক্ষকদের কাঠামোগত সমস্যা ও সরকারি অবহেলা যেমন রয়েছে, তেমনি আন্দোলন দীর্ঘায়িত হলে শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাত্র ৯২ দিনে শেখা সম্পন্ন করা অসম্ভব।
এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন—
• পুনরুদ্ধারমূলক ক্লাস
• লার্নিং রিকভারি প্রোগ্রাম
• শিক্ষক–শিক্ষার্থী অনুপাতের উন্নয়ন
• সুষ্ঠু কর্মপরিবেশ
—এসব ব্যবস্থা জরুরি হয়ে পড়েছে।














