সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হাসিনাকে ‘১০০ কোটি টাকা ঘুষ’: ট্রান্সকম সিইও সিমিন রহমানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধানে দুদক

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০২:৩২:৫৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ নভেম্বর ২০২৫
  • / ১২২ Time View
সিমিন রহমান। ফাইল ছবি

ট্রান্সকম গ্রুপকে ঘিরে দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধ, সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং নানা অভিযোগের পটভূমিতে এবার বড় সিদ্ধান্ত নিল দুর্নীতি দমন কমিশন—দুদক। সংস্থাটি ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘১০০ কোটি টাকা ঘুষ’ দেওয়ার অভিযোগে ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিমিন রহমানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করেছে।

এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে করপোরেট অঙ্গন থেকে রাজনৈতিক অঙ্গন পর্যন্ত নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। কেননা, ট্রান্সকম বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ব্যবসায়িক গোষ্ঠী, আর তাদের পরিবারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব একাধিকবার প্রকাশ্যে এসেছে।

অভিযোগের ভিত্তিতে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধানে দুদক

দুদকের সংশ্লিষ্ট এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন—শেখ হাসিনাকে ‘১০০ কোটি টাকা ঘুষ’ দেওয়া হয়েছে কি না এবং কে বা কারা এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন, তা এখন সংস্থার অগ্রাধিকারমূলক অনুসন্ধানের বিষয়।
চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে দুদকের উপপরিচালক এ কে এম মাহবুবুর রহমানকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি ইতোমধ্যে প্রাথমিক যাচাই–বাছাই শুরু করেছেন।

দুদকের অফিসিয়াল চিঠিতে বলা হয়েছে—অভিযোগের সত্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা, সন্দেহজনক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, সম্পদ বা স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি প্রয়োজন অনুযায়ী জব্দ বা ফ্রিজ করার ক্ষমতাও অনুসন্ধান কর্মকর্তাকে দেওয়া হয়েছে।

কেন আসছে ‘ঘুষের’ অভিযোগ?

দুদকের দাবি—ট্রান্সকম সিইওর বিরুদ্ধে ‘হত্যা, শেয়ার জালিয়াতি, প্রতারণা ও সম্পত্তি দখলের’ মতো গুরুতর অভিযোগের একাধিক মামলা ধামাচাপা দিতে অতীত সরকারের সময় শেখ হাসিনাকে মোটা অঙ্কের অবৈধ টাকা দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।

যদিও, এসব অভিযোগের বিষয়ে সিমিন রহমান বা ট্রান্সকম গ্রুপের মিডিয়া/লিগ্যাল বিভাগ কোনো মন্তব্য দেয়নি।

ট্রান্সকম পরিবারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব: ২০২৪ সালেই প্রকাশ্যে আসে

২০২৪ সালে এই দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে যখন ট্রান্সকমের পরিচালক শাযরেহ হক তার বড় বোন সিমিন রহমানের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা করতে শুরু করেন।

/> তার অভিযোগগুলো—

  • বড় ভাই আরশাদ ওয়ালিউর রহমানকে হত্যা,
  • অর্থ আত্মসাৎ,
  • সম্পত্তি দখল,
  • অবৈধভাবে শেয়ার হস্তান্তর ও জালিয়াতি।

২০২৪ সালের ২১ মার্চ গুলশান থানায় দায়ের করা মামলায় সিমিন রহমান, তার ছেলে যারাইফ আয়াত হোসেনসহ মোট ১১ জনকে আসামি করা হয়। আরশাদের মৃত্যু নিয়ে পরিবারে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়, যা পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত শুরু করে।

এর আগে শাযরেহ হক আরও তিনটি মামলায় তার মা শাহনাজ রহমান, বড় বোন সিমিন, এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন। এসব মামলায় ট্রান্সকমের পাঁচ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারও করা হয়। পিবিআই এরপর গুলশানের ট্রান্সকম হেড অফিস থেকে গুরুত্বপূর্ণ নথি জব্দ করে।

ট্রান্সকম নেতৃত্বে পরিবর্তন ক্ষমতার দ্বন্দ্ব

ট্রান্সকম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা লতিফুর রহমান ২০২০ সালের ১ জুলাই মারা গেলে একই বছরের ১ আগস্ট চেয়ারম্যান হন তার স্ত্রী শাহনাজ রহমান। বড় মেয়ে সিমিন হোসেন পান সিইওর দায়িত্ব।

তিন বছর পরই ছোট মেয়ে শাযরেহ হক অভিযোগ–মামলা শুরু করলে পরিবারে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে—যা বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ করপোরেট গ্রুপকে ব্যাপকভাবে আলোচনায় আনে।

হাসিনাকে ঘিরে মামলা–মোকদ্দমা দুদকের নজরদারি

দুদকের মতে—শেখ হাসিনা, তার পরিবার ও ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে বর্তমানে অন্তত ১৫টি মামলা চলছে।
এর মধ্যে তিনটির রায় হয়েছে সম্প্রতি—যেখানে প্লট বরাদ্দ ও অনুদান গ্রহণে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অর্থপাচারের অভিযোগে আদালত শেখ হাসিনাকে মোট ২১ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন।

এ ছাড়া ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান দমানোর দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।

এই প্রেক্ষাপটে এখন ট্রান্সকম সিইও সিমিন রহমানের বিরুদ্ধে ‘ঘুষ’ অভিযোগ নতুন করে রাজনৈতিক ও করপোরেট সার্কেলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

দুদকের পরবর্তী পদক্ষেপ

দুদক বলছে—

  • অভিযোগের সত্যতা যাচাই
  • সম্পদ জব্দ বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ
  • সংশ্লিষ্ট নথি সংগ্রহ
  • ট্রান্সকম পরিবারের ভেতরের বিরোধের সাথে অভিযোগের সম্পর্ক বিশ্লেষণ
  • সিমিন রহমানসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ

সবকিছু শেষ করে একটি পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।

বর্তমানে অভিযোগ অনুসন্ধান চলমান, এবং অভিযোগের ওজন ও আলোচিত ব্যক্তিদের কারণে এটি দেশের আলোচিততম দুর্নীতি তদন্তগুলোর একটি হয়ে উঠেছে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

হাসিনাকে ‘১০০ কোটি টাকা ঘুষ’: ট্রান্সকম সিইও সিমিন রহমানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধানে দুদক

Update Time : ০২:৩২:৫৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ নভেম্বর ২০২৫
সিমিন রহমান। ফাইল ছবি

ট্রান্সকম গ্রুপকে ঘিরে দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধ, সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং নানা অভিযোগের পটভূমিতে এবার বড় সিদ্ধান্ত নিল দুর্নীতি দমন কমিশন—দুদক। সংস্থাটি ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘১০০ কোটি টাকা ঘুষ’ দেওয়ার অভিযোগে ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিমিন রহমানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করেছে।

এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে করপোরেট অঙ্গন থেকে রাজনৈতিক অঙ্গন পর্যন্ত নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। কেননা, ট্রান্সকম বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ব্যবসায়িক গোষ্ঠী, আর তাদের পরিবারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব একাধিকবার প্রকাশ্যে এসেছে।

অভিযোগের ভিত্তিতে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধানে দুদক

দুদকের সংশ্লিষ্ট এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন—শেখ হাসিনাকে ‘১০০ কোটি টাকা ঘুষ’ দেওয়া হয়েছে কি না এবং কে বা কারা এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন, তা এখন সংস্থার অগ্রাধিকারমূলক অনুসন্ধানের বিষয়।
চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে দুদকের উপপরিচালক এ কে এম মাহবুবুর রহমানকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি ইতোমধ্যে প্রাথমিক যাচাই–বাছাই শুরু করেছেন।

দুদকের অফিসিয়াল চিঠিতে বলা হয়েছে—অভিযোগের সত্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা, সন্দেহজনক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, সম্পদ বা স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি প্রয়োজন অনুযায়ী জব্দ বা ফ্রিজ করার ক্ষমতাও অনুসন্ধান কর্মকর্তাকে দেওয়া হয়েছে।

কেন আসছে ‘ঘুষের’ অভিযোগ?

দুদকের দাবি—ট্রান্সকম সিইওর বিরুদ্ধে ‘হত্যা, শেয়ার জালিয়াতি, প্রতারণা ও সম্পত্তি দখলের’ মতো গুরুতর অভিযোগের একাধিক মামলা ধামাচাপা দিতে অতীত সরকারের সময় শেখ হাসিনাকে মোটা অঙ্কের অবৈধ টাকা দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।

যদিও, এসব অভিযোগের বিষয়ে সিমিন রহমান বা ট্রান্সকম গ্রুপের মিডিয়া/লিগ্যাল বিভাগ কোনো মন্তব্য দেয়নি।

ট্রান্সকম পরিবারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব: ২০২৪ সালেই প্রকাশ্যে আসে

২০২৪ সালে এই দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে যখন ট্রান্সকমের পরিচালক শাযরেহ হক তার বড় বোন সিমিন রহমানের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা করতে শুরু করেন।

/> তার অভিযোগগুলো—

  • বড় ভাই আরশাদ ওয়ালিউর রহমানকে হত্যা,
  • অর্থ আত্মসাৎ,
  • সম্পত্তি দখল,
  • অবৈধভাবে শেয়ার হস্তান্তর ও জালিয়াতি।

২০২৪ সালের ২১ মার্চ গুলশান থানায় দায়ের করা মামলায় সিমিন রহমান, তার ছেলে যারাইফ আয়াত হোসেনসহ মোট ১১ জনকে আসামি করা হয়। আরশাদের মৃত্যু নিয়ে পরিবারে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়, যা পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত শুরু করে।

এর আগে শাযরেহ হক আরও তিনটি মামলায় তার মা শাহনাজ রহমান, বড় বোন সিমিন, এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন। এসব মামলায় ট্রান্সকমের পাঁচ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারও করা হয়। পিবিআই এরপর গুলশানের ট্রান্সকম হেড অফিস থেকে গুরুত্বপূর্ণ নথি জব্দ করে।

ট্রান্সকম নেতৃত্বে পরিবর্তন ক্ষমতার দ্বন্দ্ব

ট্রান্সকম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা লতিফুর রহমান ২০২০ সালের ১ জুলাই মারা গেলে একই বছরের ১ আগস্ট চেয়ারম্যান হন তার স্ত্রী শাহনাজ রহমান। বড় মেয়ে সিমিন হোসেন পান সিইওর দায়িত্ব।

তিন বছর পরই ছোট মেয়ে শাযরেহ হক অভিযোগ–মামলা শুরু করলে পরিবারে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে—যা বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ করপোরেট গ্রুপকে ব্যাপকভাবে আলোচনায় আনে।

হাসিনাকে ঘিরে মামলা–মোকদ্দমা দুদকের নজরদারি

দুদকের মতে—শেখ হাসিনা, তার পরিবার ও ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে বর্তমানে অন্তত ১৫টি মামলা চলছে।
এর মধ্যে তিনটির রায় হয়েছে সম্প্রতি—যেখানে প্লট বরাদ্দ ও অনুদান গ্রহণে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অর্থপাচারের অভিযোগে আদালত শেখ হাসিনাকে মোট ২১ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন।

এ ছাড়া ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান দমানোর দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।

এই প্রেক্ষাপটে এখন ট্রান্সকম সিইও সিমিন রহমানের বিরুদ্ধে ‘ঘুষ’ অভিযোগ নতুন করে রাজনৈতিক ও করপোরেট সার্কেলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

দুদকের পরবর্তী পদক্ষেপ

দুদক বলছে—

  • অভিযোগের সত্যতা যাচাই
  • সম্পদ জব্দ বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ
  • সংশ্লিষ্ট নথি সংগ্রহ
  • ট্রান্সকম পরিবারের ভেতরের বিরোধের সাথে অভিযোগের সম্পর্ক বিশ্লেষণ
  • সিমিন রহমানসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ

সবকিছু শেষ করে একটি পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।

বর্তমানে অভিযোগ অনুসন্ধান চলমান, এবং অভিযোগের ওজন ও আলোচিত ব্যক্তিদের কারণে এটি দেশের আলোচিততম দুর্নীতি তদন্তগুলোর একটি হয়ে উঠেছে।