বার্ষিক পরীক্ষা আদৌ হবে তো? শিক্ষকদের আন্দোলনে অনিশ্চয়তায় দেশের প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম
- Update Time : ০৭:৪৭:৪১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৬ নভেম্বর ২০২৫
- / ১১৪ Time View

বার্ষিক পরীক্ষা আদৌ হবে তো? শিক্ষকদের আন্দোলনে অনিশ্চয়তায় দেশের প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম
দুই গ্রুপের কর্মবিরতি–অবস্থান–অনশন কর্মসূচিতে স্থবির সাড়ে ৬৫ হাজার বিদ্যালয়
১ কোটি শিক্ষার্থীর বার্ষিক পরীক্ষা নিয়ে ঘনাচ্ছে অনিশ্চয়তার ধোঁয়াশা
গ্রেড উন্নয়নসহ তিন দাবিতে সহকারী শিক্ষকদের কঠোর অবস্থান
দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা কার্যক্রম আবারও মারাত্মক অনিশ্চয়তার মুখে। দুই গ্রুপের সহকারী শিক্ষকদের ধারাবাহিক কর্মবিরতি, অবস্থান কর্মসূচি ও অনশন ঘোষণার ফলে সাড়ে ৬৫ হাজার ৫৬৯টি বিদ্যালয়ে নিয়মিত ক্লাস কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। এতে সরাসরি সংকটে পড়েছে ১ কোটির বেশি শিক্ষার্থীর বার্ষিক পরীক্ষা, যা আগামী ৮ ডিসেম্বর শুরু হওয়ার কথা ছিল।
এক গ্রুপের পূর্ণদিবস কর্মবিরতি—১১ ডিসেম্বর থেকে লাগাতার অনশনের হুঁশিয়ারি
১১তম বেতন গ্রেডসহ তিন দফা দাবিতে সহকারী শিক্ষকদের একাংশ গতকাল থেকে পূর্ণদিবস কর্মবিরতি শুরু করেছে। এ কর্মসূচি চলবে আগামীকাল পর্যন্ত।
কর্মসূচি সফল না হলে তারা ঘোষণা দিয়েছে—
- বার্ষিক পরীক্ষা বর্জন,
- ১১ ডিসেম্বর থেকে লাগাতার অনশন,
- এবং প্রয়োজনে আরও কঠোর আন্দোলন।
তাদের অভিযোগ—দীর্ঘ আন্দোলন সত্ত্বেও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
আরেক গ্রুপের ঘোষণা—৩০ নভেম্বর থেকে লাগাতার কর্মবিরতি
একই সময়ে দশম গ্রেডসহ তিন দফা দাবিতে প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদ ৩০ নভেম্বর থেকে লাগাতার পূর্ণদিবস কর্মবিরতি পালনের ঘোষণা দিয়েছে।
পরিষদটি চারটি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত এবং তারা ইতোমধ্যে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে তাদের ক্ষোভ ও অবস্থান স্পষ্ট করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে তারা বলেন—
- আহত শিক্ষকদের রাষ্ট্রীয়ভাবে চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে হবে,
- নিহত শিক্ষিকা ফাতেমা আক্তারের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণসহ পূর্ণ পেনশন নিশ্চিত করতে হবে,
- এবং দশম গ্রেডে বেতন বৃদ্ধি ও বিভাগীয় পদোন্নতির জটিলতা দ্রুত সমাধান করতে হবে।
মন্ত্রণালয়ের সাফ কথা—১৩তম গ্রেড থেকে এক লাফে ১০ম গ্রেড দেওয়া সম্ভব নয়
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে—
- বর্তমান বাস্তবতায় সহকারী শিক্ষকদের ১৩তম গ্রেড থেকে সরাসরি ১০ম গ্রেডে উন্নীত করা সম্ভব নয়।
- দেশের সরকারি প্রাইমারিতে এখনো ৬৬ হাজার এসএসসি–এইচএসসি পাশ শিক্ষক কর্মরত আছেন, যা দশম গ্রেড দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা।
- এসব শিক্ষক অবসরে যেতে লাগবে আরও ১০ বছর।
- দশম গ্রেড বাস্তবায়িত হলে সরকারের বার্ষিক অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় ২,৫০০ কোটি টাকা।
- আর ১১তম গ্রেড দিলেও অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াবে বছরে ৮৩১ কোটি ৯১ লাখ টাকা।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় মন্ত্রণালয় বলছে—আগামী কয়েক বছরের আগে এই গ্রেড পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
দেশজুড়ে প্রাইমারি শিক্ষা কার্যক্রম সহকারী শিক্ষকনির্ভর
বাংলাদেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মোট শিক্ষক ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৯৮১ জন, এর মধ্যে প্রধান শিক্ষক মাত্র ৩৫ হাজার—বাকি সবাই সহকারী।
দেশে প্রাথমিক স্তরের মোট শিক্ষার্থী ১ কোটি ৯৭ লাখ ১৩ হাজার ৬৮৫ জন, যার ১ কোটি ৯ লাখ ৮৫ হাজার ৮১৫ জন সরকারি বিদ্যালয়ে পড়ে।
অর্থাৎ শিক্ষা ব্যবস্থার অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী এখন সহকারী শিক্ষকদের চলমান কর্মসূচির কারণে ঝুঁকিতে।
দাবি আদায়ে মাঠে সহকারী শিক্ষকরা—হামলা, আহত, ক্ষোভ ও হতাশা
গত কয়েক মাস ধরে আন্দোলন, কর্মবিরতি, অবস্থান কর্মসূচি ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে আসছেন সহকারী শিক্ষকরা।
- মে মাসে টানা কর্মবিরতি
- ৮ নভেম্বর তিন দিন অবস্থান
- পুলিশের হামলায় আহত শিক্ষক
- নিহত শিক্ষিকা ফাতেমা আক্তার পরিবারের শোক ও ক্ষোভ
- সরকারের আশ্বাস—কিন্তু বাস্তবে কোনো প্রজ্ঞাপন নেই
এসব কারণে শিক্ষকরা আবারও কঠোর অবস্থানে ফিরছেন।
বার্ষিক পরীক্ষা আদৌ হবে তো?—শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা
৬৫ হাজারের বেশি বিদ্যালয়ে ক্লাস বন্ধ, দুই গ্রুপের লাগাতার কর্মসূচি এবং সরকারের অনড় অবস্থানের কারণে বড় প্রশ্ন এখন—
৮ ডিসেম্বরের পরীক্ষাগুলো সময়মতো নেওয়া যাবে কি না?
শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, অভিভাবকদের মধ্যে উৎকণ্ঠা বাড়ছে, আর শিক্ষকদের আন্দোলন আরও কঠোর হওয়ায় বার্ষিক পরীক্ষা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
আগামী দিনের পথ কোনদিকে?
শিক্ষা-নীতি বিশ্লেষকদের মতে—
- সরকারের উচিত দ্রুত আলোচনায় বসা,
- সাময়িক সমাধান নিয়ে পরীক্ষা-শিক্ষা ব্যাহত না হওয়া নিশ্চিত করা,
- আন্দোলনরত শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি খতিয়ে দেখা।
অন্যদিকে শিক্ষকরা বলছেন—
“দাবি বাস্তবায়ন ছাড়া আর ক্লাসে ফেরা সম্ভব নয়।”














