সময়: রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬, ৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভয়াবহ কম্পনে কেঁপে উঠল ঢাকা ও আশপাশ: এক কোটিরও বেশি মানুষ তীব্র কম্পন অনুভব করেছে

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১০:২৩:৪৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২২ নভেম্বর ২০২৫
  • / ১২৩ Time View

রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের জেলাজুড়ে গতকাল শুক্রবার (২১ নভেম্বর) সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে যে শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হয়, তা সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ ভূ-কম্পনগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নরসিংদীর মাধবদী উপজেলাকেন্দ্রিক রিখটার স্কেলে ৫.৭ মাত্রার এই ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ১০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন। আহত হয়েছেন আরও ছয় শতাধিক মানুষ। হতাহতের দিক থেকে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটেছে নরসিংদীতে—এ জেলায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। রাজধানী ঢাকায় মারা গেছেন চারজন এবং নারায়ণগঞ্জে প্রাণ হারিয়েছেন আরও একজন।

উৎপত্তিস্থল ঢাকার এত কাছে—অভূতপূর্ব কম্পন

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীরে—যা ভূকম্পবিদ্যার ভাষায় “অগভীর ভূমিকম্প” এবং সাধারণত সবচেয়ে তীব্রভাবে অনুভূত হয়। এই কেন্দ্রটি ছিল ঢাকা থেকে মাত্র ২৫ কিলোমিটার দূরে।
অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস (USGS) এই ভূমিকম্পটির মাত্রা ৫.৫ হিসেবে নথিভুক্ত করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার এত কাছে এর আগে রকম শক্তির ভূমিকম্প রেকর্ড হয়নি, ফলে কম্পনের তীব্রতা ছিল নজিরবিহীন এবং জনমনে আতঙ্ক ছিল তুঙ্গে।

দেয়াল ধস, ফাটল, আতঙ্কে আহত—নানা স্থানে ক্ষয়ক্ষতি

কম্পনের তীব্রতায় ঢাকা, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে বহু ভবনের দেয়াল ও অংশবিশেষ ধসে পড়ে। অসংখ্য ভবনে নতুন করে ফাটল দেখা গেছে—বিশেষ করে পুরোনো ও অনিয়মে নির্মিত স্থাপনাগুলোতে। কোথাও কোথাও মাটি দেবে যাওয়ার ঘটনাও নিশ্চিত হয়েছে।

ভয় পেয়ে ভবন থেকে দ্রুত নিচে নামার সময় অসংখ্য মানুষ দৌড়াতে গিয়ে পড়ে যান, কেউ কেউ শ্বাসকষ্টে বা হৃদ্‌রোগে অসুস্থ হয়ে পড়েন।
রাজধানীর নিকেতন এলাকার বাসিন্দা আশরাফুল আলম জানান—
“সেলুনে ছিলাম। হঠাৎ চেয়ার দুলতে শুরু করলো। মনে হচ্ছিল মেঝেটাই সরে যাচ্ছে। দৌড়ে বাইরে এসে দেখি সবাই আতঙ্কে ছুটছে। সত্যি বলতে, এই শহরে আর নিরাপদ মনে হয় না।”

কোটির বেশি মানুষের কাছে পৌঁছায় কম্পন

ইউএসজিএসের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে ভয়াবহ একটি চিত্র—

  • প্রায় কোটির বেশি মানুষ এ ভূমিকম্পে মৃদু কম্পন অনুভব করেছেন।
  • আরও পৌনে কোটি মানুষ মাঝারি মাত্রার কম্পন টের পেয়েছেন।
  • শুধু ঢাকাতেই এক কোটির বেশি মানুষ শক্তিশালী কম্পনে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
  • নরসিংদীতে প্রায় লাখ মানুষ উচ্চ তীব্রতায় কম্পন অনুভব করেছেন।

USGS ভূমিকম্পটির মানবিক ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনাকে কমলা’ সতর্কতায় এবং অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনাকে হলুদ’ শ্রেণিতে রেখেছে—যা মাঝারি থেকে বড় ধরনের বিপর্যয়ের সম্ভাবনার নির্দেশক।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা—ঢাকা বড় ভূমিকম্পের জন্য প্রস্তুত নয়

বুয়েটের ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারী এই ভূমিকম্পকে আগামী বড় বিপর্যয়ের পূর্বচিহ্ন হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন—
“ঢাকার এত কাছে এ মাত্রার ভূমিকম্প আগে হয়নি। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এ অঞ্চলে প্রতি ১৫০ বছর পর বড় ধরনের ভূমিকম্প ফিরে আসে। আমাদের সতর্কতার কোনো বিকল্প নেই।”

তিনি আরও জানান,
২০২৩ সালে রামগঞ্জে ৫.৫ মাত্রার ভূমিকম্প হলেও সেটি ছিল ঢাকার প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে। কিন্তু এবার কেন্দ্র মাত্র ২৫ কিলোমিটার—ফলে এর প্রভাব ছিল বহু গুণ তীব্র।

ঢাকার নিম্নাঞ্চল সবচেয়ে ঝুঁকিতে—গবেষণা বলছে ভয়াবহ চিত্র

রাজউকের ২০২৪ সালের ‘আরবান রেজিলিয়েন্স’ গবেষণা অনুযায়ী, যদি ঢাকায় ৬.৯ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে, তাহলে—

  • লাখ ৬৪ হাজারের বেশি ভবন ধসে পড়তে পারে,
  • প্রাণহানির সংখ্যা হতে পারে দিনে প্রায় লাখ ২০ হাজার এবং
  • রাতে এই সংখ্যা লাখ ২০ হাজারে পৌঁছাতে পারে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আকতার মাহমুদ জানিয়েছেন, ঢাকার নিম্নাঞ্চলগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ—যেমন
হাজারীবাগ, শ্যামলী, ঢাকা উদ্যান, বছিলা, পূর্বাচল, উত্তরা, বালু নদ ও প্রগতি সরণি এলাকা।

তিনি বলেন,
“নব্বইয়ের দশকের পর এসব নিম্নভূমি ভরাট করে আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকা গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে মাটি দুর্বল এবং তরলীকরণের ঝুঁকি খুব বেশি। বড় ভূমিকম্প হলে সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষতি হবে এখানেই।”

সার্বিক চিত্র

এই ভূমিকম্প আরেকবার স্পষ্ট করে দিয়েছে—ঢাকা ও আশপাশের অঞ্চল কাঠামোগতভাবে খুবই দুর্বল এবং বড় দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি এখনো পর্যাপ্ত নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবন নির্মাণে অনিয়ম, নিম্নভূমি ভরাট করে নগর সম্প্রসারণ এবং দুর্বল অবকাঠামোর কারণে রাজধানী যেকোনো সময় ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে পারে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

ভয়াবহ কম্পনে কেঁপে উঠল ঢাকা ও আশপাশ: এক কোটিরও বেশি মানুষ তীব্র কম্পন অনুভব করেছে

Update Time : ১০:২৩:৪৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২২ নভেম্বর ২০২৫

রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের জেলাজুড়ে গতকাল শুক্রবার (২১ নভেম্বর) সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে যে শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হয়, তা সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ ভূ-কম্পনগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নরসিংদীর মাধবদী উপজেলাকেন্দ্রিক রিখটার স্কেলে ৫.৭ মাত্রার এই ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ১০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন। আহত হয়েছেন আরও ছয় শতাধিক মানুষ। হতাহতের দিক থেকে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটেছে নরসিংদীতে—এ জেলায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। রাজধানী ঢাকায় মারা গেছেন চারজন এবং নারায়ণগঞ্জে প্রাণ হারিয়েছেন আরও একজন।

উৎপত্তিস্থল ঢাকার এত কাছে—অভূতপূর্ব কম্পন

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীরে—যা ভূকম্পবিদ্যার ভাষায় “অগভীর ভূমিকম্প” এবং সাধারণত সবচেয়ে তীব্রভাবে অনুভূত হয়। এই কেন্দ্রটি ছিল ঢাকা থেকে মাত্র ২৫ কিলোমিটার দূরে।
অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস (USGS) এই ভূমিকম্পটির মাত্রা ৫.৫ হিসেবে নথিভুক্ত করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার এত কাছে এর আগে রকম শক্তির ভূমিকম্প রেকর্ড হয়নি, ফলে কম্পনের তীব্রতা ছিল নজিরবিহীন এবং জনমনে আতঙ্ক ছিল তুঙ্গে।

দেয়াল ধস, ফাটল, আতঙ্কে আহত—নানা স্থানে ক্ষয়ক্ষতি

কম্পনের তীব্রতায় ঢাকা, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে বহু ভবনের দেয়াল ও অংশবিশেষ ধসে পড়ে। অসংখ্য ভবনে নতুন করে ফাটল দেখা গেছে—বিশেষ করে পুরোনো ও অনিয়মে নির্মিত স্থাপনাগুলোতে। কোথাও কোথাও মাটি দেবে যাওয়ার ঘটনাও নিশ্চিত হয়েছে।

ভয় পেয়ে ভবন থেকে দ্রুত নিচে নামার সময় অসংখ্য মানুষ দৌড়াতে গিয়ে পড়ে যান, কেউ কেউ শ্বাসকষ্টে বা হৃদ্‌রোগে অসুস্থ হয়ে পড়েন।
রাজধানীর নিকেতন এলাকার বাসিন্দা আশরাফুল আলম জানান—
“সেলুনে ছিলাম। হঠাৎ চেয়ার দুলতে শুরু করলো। মনে হচ্ছিল মেঝেটাই সরে যাচ্ছে। দৌড়ে বাইরে এসে দেখি সবাই আতঙ্কে ছুটছে। সত্যি বলতে, এই শহরে আর নিরাপদ মনে হয় না।”

কোটির বেশি মানুষের কাছে পৌঁছায় কম্পন

ইউএসজিএসের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে ভয়াবহ একটি চিত্র—

  • প্রায় কোটির বেশি মানুষ এ ভূমিকম্পে মৃদু কম্পন অনুভব করেছেন।
  • আরও পৌনে কোটি মানুষ মাঝারি মাত্রার কম্পন টের পেয়েছেন।
  • শুধু ঢাকাতেই এক কোটির বেশি মানুষ শক্তিশালী কম্পনে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
  • নরসিংদীতে প্রায় লাখ মানুষ উচ্চ তীব্রতায় কম্পন অনুভব করেছেন।

USGS ভূমিকম্পটির মানবিক ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনাকে কমলা’ সতর্কতায় এবং অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনাকে হলুদ’ শ্রেণিতে রেখেছে—যা মাঝারি থেকে বড় ধরনের বিপর্যয়ের সম্ভাবনার নির্দেশক।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা—ঢাকা বড় ভূমিকম্পের জন্য প্রস্তুত নয়

বুয়েটের ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারী এই ভূমিকম্পকে আগামী বড় বিপর্যয়ের পূর্বচিহ্ন হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন—
“ঢাকার এত কাছে এ মাত্রার ভূমিকম্প আগে হয়নি। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এ অঞ্চলে প্রতি ১৫০ বছর পর বড় ধরনের ভূমিকম্প ফিরে আসে। আমাদের সতর্কতার কোনো বিকল্প নেই।”

তিনি আরও জানান,
২০২৩ সালে রামগঞ্জে ৫.৫ মাত্রার ভূমিকম্প হলেও সেটি ছিল ঢাকার প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে। কিন্তু এবার কেন্দ্র মাত্র ২৫ কিলোমিটার—ফলে এর প্রভাব ছিল বহু গুণ তীব্র।

ঢাকার নিম্নাঞ্চল সবচেয়ে ঝুঁকিতে—গবেষণা বলছে ভয়াবহ চিত্র

রাজউকের ২০২৪ সালের ‘আরবান রেজিলিয়েন্স’ গবেষণা অনুযায়ী, যদি ঢাকায় ৬.৯ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে, তাহলে—

  • লাখ ৬৪ হাজারের বেশি ভবন ধসে পড়তে পারে,
  • প্রাণহানির সংখ্যা হতে পারে দিনে প্রায় লাখ ২০ হাজার এবং
  • রাতে এই সংখ্যা লাখ ২০ হাজারে পৌঁছাতে পারে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আকতার মাহমুদ জানিয়েছেন, ঢাকার নিম্নাঞ্চলগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ—যেমন
হাজারীবাগ, শ্যামলী, ঢাকা উদ্যান, বছিলা, পূর্বাচল, উত্তরা, বালু নদ ও প্রগতি সরণি এলাকা।

তিনি বলেন,
“নব্বইয়ের দশকের পর এসব নিম্নভূমি ভরাট করে আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকা গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে মাটি দুর্বল এবং তরলীকরণের ঝুঁকি খুব বেশি। বড় ভূমিকম্প হলে সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষতি হবে এখানেই।”

সার্বিক চিত্র

এই ভূমিকম্প আরেকবার স্পষ্ট করে দিয়েছে—ঢাকা ও আশপাশের অঞ্চল কাঠামোগতভাবে খুবই দুর্বল এবং বড় দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি এখনো পর্যাপ্ত নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবন নির্মাণে অনিয়ম, নিম্নভূমি ভরাট করে নগর সম্প্রসারণ এবং দুর্বল অবকাঠামোর কারণে রাজধানী যেকোনো সময় ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে পারে।