ভূমিকম্পে দুই শিশুসহ নিহত ৬, আহত শতাধিক: রাজধানী থেকে জেলা—সারা বাংলাদেশজুড়ে আতঙ্ক
- Update Time : ০৪:২৪:০২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২১ নভেম্বর ২০২৫
- / ১৩৫ Time View

শুক্রবার (২১ নভেম্বর) সকালেও হঠাৎ অস্বস্তিকর কেঁপে ওঠা অনুভূত হয় রাজধানীসহ সারা বাংলাদেশে। মাত্র কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী এই কম্পনই এক মুহূর্তে বদলে দেয় বহু মানুষের জীবন। এখন পর্যন্ত পাওয়া প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ জনে—এর মধ্যে দুই শিশু ও এক প্রবীণ নাগরিকও রয়েছেন। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীতে এসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। একই সঙ্গে সারা দেশে আহত হয়েছেন অন্তত শতাধিক মানুষ, ভেঙে পড়েছে দেয়াল–সানশেড, বহু ভবনে দেখা দিয়েছে বড় ছোট ফাটল।
৫.৫ মাত্রার ভূমিকম্প, কেন্দ্রস্থল নরসিংদী
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানায়, রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৫। সকাল ১০টা ৩৮ মিনিট ২৬ সেকেন্ডে কম্পনটি অনুভূত হয়। ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল নরসিংদী। ভূপৃষ্ঠের মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীরে উৎপত্তিস্থল হওয়ায় কম্পনের তীব্রতা তুলনামূলক বেশি অনুভূত হয়।
ঢাকার বাইরে গোপালগঞ্জ, নড়াইল, রংপুর, সাতক্ষীরা, যশোর, কুমিল্লা, রাজশাহী, কুড়িগ্রাম, সিলেট, ফেনী, মাদারীপুর, ঝালকাঠি, দিনাজপুরসহ প্রায় ২০টিরও বেশি জেলায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ভারতের আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ এলাকাতেও হালকা কম্পন রেকর্ড করা হয়েছে বলে এনডিটিভি জানিয়েছে।
রাজধানীতে ভবনের রেলিং ভেঙে ৩ জন নিহত
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা যায় রাজধানীর বংশালের কসাইটুলী এলাকায়। ভূমিকম্পের কম্পনে একটি পাঁচ তলা আবাসিক ভবনের লোহার রেলিং হঠাৎ ভেঙে নিচে পড়ে। রেলিংয়ের নিচে থাকা তিন পথচারী গুরুতর আহত হন এবং হাসপাতালে নেওয়ার আগেই মারা যান।
বংশাল থানার ওসি জানান, সকাল সোয়া ১১টার দিকে ঘটনা ঘটে।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে—রেলিং ভেঙে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তা রক্তে লাল হয়ে যায়, আশপাশের মানুষ চিৎকার-চেঁচামেচি করতে করতে আহতদের উদ্ধার করে নিকটস্থ হাসপাতালে ছুটে যান।
ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ভবন দুলে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে মানুষজন আতঙ্কে রাস্তা ও খোলা জায়গায় বেরিয়ে আসেন। কোথাও কোথাও দেয়ালে ফাটল, সিঁড়ি চিপে যাওয়া, ফার্নিচার উল্টে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে।
নারায়ণগঞ্জে টিনশেড বাড়ির দেয়াল ধসে এক বছরের শিশুর মৃত্যু
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে একটি টিনশেড বাড়ির দেয়াল ধসে ফাতেমা নামে মাত্র এক বছর বয়সী একটি শিশু মারা যায়। এ ঘটনায় শিশুটির মা কুলসুম বেগম ও প্রতিবেশী জেসমিন বেগম আহত হন।
রূপগঞ্জ থানার ওসি তরিকুল ইসলাম জানান, কুলসুম বেগম মেয়েকে নিয়ে ভুলতা গাউছিয়া এলাকায় যাওয়ার পথে ভূমিকম্প শুরু হয়। রাস্তার পাশে থাকা পুরোনো টিনশেড বাড়িটির দেয়াল তাদের ওপর ভেঙে পড়ে। স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠালে শিশু ফাতেমাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
নরসিংদীতে সানশেড ভেঙে বাবা-ছেলেসহ নিহত ২
নরসিংদীর সদর উপজেলার গাবতলি এলাকার একটি বাড়ির সানশেড ভেঙে পড়ে ওমর (১০) নামে এক শিশু ও ৭৫ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ নিহত হন। শিশুটির বাবা দেলোয়ার হোসেন উজ্জ্বল গুরুতর আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে আছেন।
ওমরের দুই বোনও আহত অবস্থায় নরসিংদী সদর হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে।
ওমরের চাচা জাকির হোসেন বলেন,
“ভূমিকম্প শুরু হলে দেলোয়ার ভাই তিন সন্তানকে নিয়ে দ্রুত বাসা থেকে বের হচ্ছিলেন। ঠিক তখনই সানশেডটি ভেঙে তাদের ওপর পড়ে।”
ঢামেক পুলিশ ফাঁড়ির ওসি মো. ফারুক জানান, হাসপাতালে আনার পর চিকিৎসক ওমরকে মৃত ঘোষণা করেন।
পলাশে মাটির ঘর ধসেও প্রাণহানি
নরসিংদীর পলাশ উপজেলার মালিতা গ্রামে একটি মাটির ঘরের দেয়াল ধসে পড়ে ৭৫ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ ঘটনাস্থলেই মারা যান। পুরোনো ও জীর্ণ ঘরটি কম্পনের আঘাতে সম্পূর্ণ ধসে পড়ে বলে স্থানীয়দের বরাত পাওয়া গেছে।
সরকারি সংস্থাগুলোর সতর্কতা—পরবর্তী আফটারশক আশঙ্কা
ভূমিকম্পের পরপরই ফায়ার সার্ভিস, সিভিল ডিফেন্স ও স্থানীয় প্রশাসনের সদস্যরা বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধার তৎপরতা চালায়। ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, কেন্দ্রস্থল অগভীর হওয়ায় আরও আফটারশক অনুভূত হতে পারে।
গৃহস্থালিতে পুরোনো ভবন, দুর্বল দেয়াল, সানশেড ও বারান্দার নিচে না দাঁড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
অবকাঠামো ক্ষতি—একাধিক ভবনে ফাটল
বিভিন্ন জেলার ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে—
- কয়েকটি পুরোনো ভবনে বড় ধরনের ফাটল
- কিছু জায়গায় সিঁড়ি চিপে যাওয়া
- টাইলস ও সিলিং ভেঙে পড়া
- শপিংমলে মানুষদের হুড়মুড় করে বের হওয়ায় আহত
সব মিলিয়ে দেশের অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক হিসাব এখনো করা সম্ভব হয়নি।















