সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভারতীয় মিডিয়ার প্রতিবেদন: “নিজের ফাঁসির রায় শোনা সহজ নয়”

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৮:৩২:৩৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর ২০২৫
  • / ২৪৬ Time View

সোমবার বাংলাদেশ এক ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হলো। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই রায়ে তার সঙ্গে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

টেলিভিশনের পর্দায় নিজের বিরুদ্ধে রায় শোনার পর আসাদুজ্জামান খান কামাল ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজারকে বলেছেন, নিজের ফাঁসির রায় শুনা সহজ নয়।” রায় ঘোষণার প্রায় তিন ঘণ্টা পর ফোনকলে তিনি সাংবাদিকদের এ প্রতিক্রিয়া জানান। সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে তিনি আরও বলেন, মরতে আমার ভয় নেই।” গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার তুমুল আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তিনি দেশ ছাড়েন এবং এরপর থেকে কলকাতার এক অজ্ঞাত স্থানে বাস করছেন। আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় তিনি ভারতে পালিয়ে থাকা আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন এবং বাংলাদেশে দলকে সক্রিয় করার পরিকল্পনা করছেন। রায়ের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে কামাল বলেন, আমরা জানতাম যে এই রায় আসবেই। গত এক বছরে দেশে ঘটমান ঘটনা রায়ের পূর্বাভাস দিয়েছিল, তাই রায় আমাদের জন্য কোন চমক নয়।”

প্রায় সারা দিন বিদেশি মিডিয়াগুলোও এই খবরকে গুরুত্ব সহকারে প্রচার করেছে। বিবিসি, সিএনএন, দ্য গার্ডিয়ানসহ বিশ্বের নামকরা সংবাদমাধ্যমগুলো হাসিনার মৃত্যুদণ্ডকে প্রধান শিরোনামে তুলে ধরেছে। ভারতের ইংরেজি ভাষার সংবাদমাধ্যমগুলোও ব্যাপক আগ্রহ দেখিয়েছে এবং হাসিনার প্রত্যর্পণ চুক্তি ও দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ বিষয়ে বিশ্লেষণ করেছে। পাশাপাশি শেখ হাসিনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াও প্রচার করা হয়েছে।

এনডিটিভি শিরোনাম করেছে— মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ঢাকার আদালতে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড।” প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর ছাত্র নেতৃত্বাধীন আন্দোলন দমনে ব্যাপক সহিংসতার দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। আদালত তাকে তিনটি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করেছে। তার সঙ্গে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল এবং সাবেক পুলিশ প্রধান চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনকেও সাজা দেওয়া হয়েছে। সংবাদমাধ্যমটি উল্লেখ করেছে যে, বাংলাদেশ-ভারত প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী গত বছরের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী দেশ ছাড়েন। এরপর থেকে তিনি দিল্লিতে অবস্থান করছেন, কামালও ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার ভারতকে প্রত্যর্পণের জন্য চিঠি পাঠালেও ভারত তা মঞ্জুর করেনি।

হিন্দুস্তান টাইমস শিরোনাম দিয়েছে— মৃত্যুদণ্ডাদেশের পর ভারতের কাছে হাসিনাকে হস্তান্তরের আহ্বান।” সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, রায় ঘোষণার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র দপ্তর এই বিষয়ে প্রতিক্রিয়া দিয়েছে। ঢাকা মনে করছে, দুই দেশের প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী ভারতকে হাসিনাকে ফেরত দিতে হবে।

ইকোনমিক টাইমস শিরোনাম করেছে— শেখ হাসিনা: উত্থান, রাজত্ব এবং বাংলাদেশের ‘লৌহমানবীর’ পতন।” প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন আধুনিক, উন্নয়নশীল বাংলাদেশের স্থপতি, আর সমালোচকদের কাছে স্বৈরশাসক। তার ক্ষমতার লোভ সাধারণ মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করেছে। তবে খুব কম মানুষই কল্পনা করতে পারতেন যে, ৭৭ বছর বয়সী ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী নিজের তৈরি ট্রাইব্যুনালেই একদিন দোষী সাব্যস্ত হবেন। সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তার অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করলে এটি বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকা নারী প্রধানমন্ত্রীর জীবনের এক নাটকীয় মোড় হয়ে দাঁড়ায়।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

ভারতীয় মিডিয়ার প্রতিবেদন: “নিজের ফাঁসির রায় শোনা সহজ নয়”

Update Time : ০৮:৩২:৩৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর ২০২৫

সোমবার বাংলাদেশ এক ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হলো। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই রায়ে তার সঙ্গে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

টেলিভিশনের পর্দায় নিজের বিরুদ্ধে রায় শোনার পর আসাদুজ্জামান খান কামাল ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজারকে বলেছেন, নিজের ফাঁসির রায় শুনা সহজ নয়।” রায় ঘোষণার প্রায় তিন ঘণ্টা পর ফোনকলে তিনি সাংবাদিকদের এ প্রতিক্রিয়া জানান। সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে তিনি আরও বলেন, মরতে আমার ভয় নেই।” গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার তুমুল আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তিনি দেশ ছাড়েন এবং এরপর থেকে কলকাতার এক অজ্ঞাত স্থানে বাস করছেন। আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় তিনি ভারতে পালিয়ে থাকা আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন এবং বাংলাদেশে দলকে সক্রিয় করার পরিকল্পনা করছেন। রায়ের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে কামাল বলেন, আমরা জানতাম যে এই রায় আসবেই। গত এক বছরে দেশে ঘটমান ঘটনা রায়ের পূর্বাভাস দিয়েছিল, তাই রায় আমাদের জন্য কোন চমক নয়।”

প্রায় সারা দিন বিদেশি মিডিয়াগুলোও এই খবরকে গুরুত্ব সহকারে প্রচার করেছে। বিবিসি, সিএনএন, দ্য গার্ডিয়ানসহ বিশ্বের নামকরা সংবাদমাধ্যমগুলো হাসিনার মৃত্যুদণ্ডকে প্রধান শিরোনামে তুলে ধরেছে। ভারতের ইংরেজি ভাষার সংবাদমাধ্যমগুলোও ব্যাপক আগ্রহ দেখিয়েছে এবং হাসিনার প্রত্যর্পণ চুক্তি ও দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ বিষয়ে বিশ্লেষণ করেছে। পাশাপাশি শেখ হাসিনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াও প্রচার করা হয়েছে।

এনডিটিভি শিরোনাম করেছে— মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ঢাকার আদালতে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড।” প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর ছাত্র নেতৃত্বাধীন আন্দোলন দমনে ব্যাপক সহিংসতার দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। আদালত তাকে তিনটি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করেছে। তার সঙ্গে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল এবং সাবেক পুলিশ প্রধান চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনকেও সাজা দেওয়া হয়েছে। সংবাদমাধ্যমটি উল্লেখ করেছে যে, বাংলাদেশ-ভারত প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী গত বছরের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী দেশ ছাড়েন। এরপর থেকে তিনি দিল্লিতে অবস্থান করছেন, কামালও ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার ভারতকে প্রত্যর্পণের জন্য চিঠি পাঠালেও ভারত তা মঞ্জুর করেনি।

হিন্দুস্তান টাইমস শিরোনাম দিয়েছে— মৃত্যুদণ্ডাদেশের পর ভারতের কাছে হাসিনাকে হস্তান্তরের আহ্বান।” সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, রায় ঘোষণার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র দপ্তর এই বিষয়ে প্রতিক্রিয়া দিয়েছে। ঢাকা মনে করছে, দুই দেশের প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী ভারতকে হাসিনাকে ফেরত দিতে হবে।

ইকোনমিক টাইমস শিরোনাম করেছে— শেখ হাসিনা: উত্থান, রাজত্ব এবং বাংলাদেশের ‘লৌহমানবীর’ পতন।” প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন আধুনিক, উন্নয়নশীল বাংলাদেশের স্থপতি, আর সমালোচকদের কাছে স্বৈরশাসক। তার ক্ষমতার লোভ সাধারণ মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করেছে। তবে খুব কম মানুষই কল্পনা করতে পারতেন যে, ৭৭ বছর বয়সী ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী নিজের তৈরি ট্রাইব্যুনালেই একদিন দোষী সাব্যস্ত হবেন। সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তার অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করলে এটি বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকা নারী প্রধানমন্ত্রীর জীবনের এক নাটকীয় মোড় হয়ে দাঁড়ায়।