সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ড

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৪:৩০:৫৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ নভেম্বর ২০২৫
  • / ২৪৮ Time View

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। সোমবার (১৭ নভেম্বর) ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারপতি মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

মামলার অভিযোগসমূহ

এ মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মোট পাঁচটি গুরুতর অভিযোগ গঠন করা হয়। অভিযোগগুলো হলো—
১. ১৪ জুলাই গণভবনে শেখ হাসিনার ‘উসকানিমূলক বক্তব্য’;
২. হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের নির্মূলের নির্দেশ;
৩. রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার নির্দেশ;
৪. রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় ছয় আন্দোলনকারীকে গুলি করে হত্যার নির্দেশ;
৫. আশুলিয়ায় ছয়জনকে পুড়িয়ে হত্যার নির্দেশ।

এই পাঁচটি অভিযোগের মধ্যে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার, হত্যার নির্দেশ এবং সংগঠিত দমন-পীড়নের ক্ষেত্রে অ্যাপ্রুভার মামুনের জবানবন্দি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মামলায় আসামি যুক্ত হওয়ার প্রেক্ষাপট

শুরুতে মামলার একমাত্র আসামি ছিলেন শেখ হাসিনা। পরবর্তীতে ১৬ মার্চ সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে আসামির তালিকায় যুক্ত করা হয়। সবশেষ গত ১২ মে প্রকাশিত তদন্ত প্রতিবেদনে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

১০ জুলাই ট্রাইব্যুনাল মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে। একইদিন সাবেক আইজিপি মামুন অ্যাপ্রুভার বা রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদন করেন এবং পরে আদালতে গুরুত্বপূর্ণ জবানবন্দি প্রদান করেন। তার জবানবন্দি মামলাটির গতিপথ নির্ধারণে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

রাজনৈতিক পটভূমি: সরকারের পতন পালিয়ে যাওয়া

গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। সেই সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করে ভারতে চলে যান। এর মাধ্যমে দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। আন্দোলনের সময় সংঘটিত সহিংসতা, হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনকে ঘিরেই এ মামলার তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম শুরু হয়।

তিন আসামির অবস্থান

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার তিন আসামির মধ্যে—
• শেখ হাসিনা: পলাতক, বর্তমানে ভারতে
• আসাদুজ্জামান খান কামাল: পলাতক, বর্তমানে ভারতে
• চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন: গ্রেফতার, একমাত্র হাজিরা দেওয়া আসামি

আপিলের সুযোগ নেই পলাতকদের

প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার বলেছেন, পলাতক অবস্থায় কোনো সাজাপ্রাপ্ত আসামি আপিল করতে পারেন না। আইন অনুযায়ী, রায় ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে হলে আসামিকে আত্মসমর্পণ করতে হবে অথবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার থাকতে হবে। ফলে শেখ হাসিনা ও কামাল—দুজনেরই আপিলের সুযোগ এখন কার্যত বাতিল।

এই রায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আন্দোলন-পরবর্তী পরিস্থিতি, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্নে এই রায় ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে থাকবে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ড

Update Time : ০৪:৩০:৫৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ নভেম্বর ২০২৫

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। সোমবার (১৭ নভেম্বর) ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারপতি মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

মামলার অভিযোগসমূহ

এ মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মোট পাঁচটি গুরুতর অভিযোগ গঠন করা হয়। অভিযোগগুলো হলো—
১. ১৪ জুলাই গণভবনে শেখ হাসিনার ‘উসকানিমূলক বক্তব্য’;
২. হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের নির্মূলের নির্দেশ;
৩. রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার নির্দেশ;
৪. রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় ছয় আন্দোলনকারীকে গুলি করে হত্যার নির্দেশ;
৫. আশুলিয়ায় ছয়জনকে পুড়িয়ে হত্যার নির্দেশ।

এই পাঁচটি অভিযোগের মধ্যে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার, হত্যার নির্দেশ এবং সংগঠিত দমন-পীড়নের ক্ষেত্রে অ্যাপ্রুভার মামুনের জবানবন্দি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মামলায় আসামি যুক্ত হওয়ার প্রেক্ষাপট

শুরুতে মামলার একমাত্র আসামি ছিলেন শেখ হাসিনা। পরবর্তীতে ১৬ মার্চ সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে আসামির তালিকায় যুক্ত করা হয়। সবশেষ গত ১২ মে প্রকাশিত তদন্ত প্রতিবেদনে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

১০ জুলাই ট্রাইব্যুনাল মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে। একইদিন সাবেক আইজিপি মামুন অ্যাপ্রুভার বা রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদন করেন এবং পরে আদালতে গুরুত্বপূর্ণ জবানবন্দি প্রদান করেন। তার জবানবন্দি মামলাটির গতিপথ নির্ধারণে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

রাজনৈতিক পটভূমি: সরকারের পতন পালিয়ে যাওয়া

গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। সেই সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করে ভারতে চলে যান। এর মাধ্যমে দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। আন্দোলনের সময় সংঘটিত সহিংসতা, হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনকে ঘিরেই এ মামলার তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম শুরু হয়।

তিন আসামির অবস্থান

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার তিন আসামির মধ্যে—
• শেখ হাসিনা: পলাতক, বর্তমানে ভারতে
• আসাদুজ্জামান খান কামাল: পলাতক, বর্তমানে ভারতে
• চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন: গ্রেফতার, একমাত্র হাজিরা দেওয়া আসামি

আপিলের সুযোগ নেই পলাতকদের

প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার বলেছেন, পলাতক অবস্থায় কোনো সাজাপ্রাপ্ত আসামি আপিল করতে পারেন না। আইন অনুযায়ী, রায় ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে হলে আসামিকে আত্মসমর্পণ করতে হবে অথবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার থাকতে হবে। ফলে শেখ হাসিনা ও কামাল—দুজনেরই আপিলের সুযোগ এখন কার্যত বাতিল।

এই রায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আন্দোলন-পরবর্তী পরিস্থিতি, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্নে এই রায় ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে থাকবে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।