শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ
- Update Time : ০৪:২২:২৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ নভেম্বর ২০২৫
- / ২৪১ Time View

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত বছরের জুলাই–অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছে। সোমবার ট্রাইব্যুনাল-১ এই বহুল প্রত্যাশিত রায় ঘোষণা করে। পাঁচটি অভিযোগের মধ্যে দুটি অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড এবং আরেকটিতে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের প্যানেলে বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী ছিলেন অন্যান্য সদস্য। রায় ঘোষণার সময় আদালতকক্ষ জনাকীর্ণ হয়ে পড়ে। উপস্থিত ছিলেন নিহতদের স্বজন, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী ও পর্যবেক্ষকরা।
প্রমাণ, অডিও–ভিডিও ও সাক্ষ্য তুলে ধরা
রায় ঘোষণার আগে ট্রাইব্যুনাল একে একে বিভিন্ন ভিডিও ক্লিপ, অডিও রেকর্ডিং, প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দি ও তদন্ত সংস্থার জমাকৃত নথিপত্রের বিবরণ উপস্থাপন করে। জুলাই-অগাস্টের বিক্ষোভ দমনে ঢাকার যাত্রাবাড়ী, বাড্ডা, রামপুরা, সাভার, আশুলিয়া ও রংপুরসহ বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর প্রাণঘাতী গুলি ব্যবহারের ভিডিও আদালতে প্রদর্শন করা হয়।
মানবাধিকার লঙ্ঘন সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন থেকেও গুরুত্বপূর্ণ অংশ পড়ে শোনান প্রসিকিউটররা। এরপর গণঅভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন ব্যক্তি ও সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে শেখ হাসিনার কথোপকথনের অডিও আদালতে বাজানো হয়, যার একটি ছিল সে সময়ের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর সঙ্গে টেলিফোন আলাপ।
অন্যান্য আসামি ও তাদের সাজা
এ মামলার অপর দুই আসামি—সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পুলিশের সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। দুজনই বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন।
সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামালকে এক অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আর রাজসাক্ষী হওয়ায় সাবেক আইজিপি মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়, যেটিকে “সহযোগিতামূলক ভূমিকার কারণে শাস্তি লঘুকরণ” হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে ট্রাইব্যুনাল।
প্রসিকিউশন ও ডিফেন্সের যুক্তিতর্ক
২৩ অক্টোবর সমাপনী যুক্তিতর্কে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানবতাবিরোধী অপরাধে রাষ্ট্রপ্রধানদের বিচারের নজির তুলে ধরে শেখ হাসিনা ও কামালের সর্বোচ্চ দণ্ড দাবি করেন। পরে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম রাষ্ট্রনিযুক্ত ডিফেন্স আইনজীবীদের যুক্তির জবাব দেন।
রাজসাক্ষী মামুনের ক্ষেত্রে প্রসিকিউশন ট্রাইব্যুনালের বিবেচনার ওপর সিদ্ধান্ত ছেড়ে দিলেও তার আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদ খালাস দাবি করেন।
সাক্ষ্যগ্রহণ, অভিযোগ ও তদন্ত
মোট ৮৪ সাক্ষীর মধ্যে ৫৪ জন ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন। প্রথম সাক্ষী খোকন চন্দ্র বর্মণ ২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্টের “বীভৎসতা ও নির্বিচার হত্যার” বর্ণনা দেন। ৮ অক্টোবর তদন্ত কর্মকর্তা মো. আলমগীরের জেরা শেষ হলে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়।
প্রসিকিউশনের দায়ের করা পাঁচটি অভিযোগের মধ্যে ছিল—
১. উসকানি
২. মারণাস্ত্র ব্যবহার
৩. আবু সাঈদ হত্যা
৪. চানখারপুলে হত্যাকাণ্ড
৫. আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানো
মোট ৮,৭৪৭ পৃষ্ঠার আনুষ্ঠানিক অভিযোগনামায় তথ্যসূত্র ২,০১৮ পৃষ্ঠা, জব্দতালিকা ও অন্যান্য প্রমাণাদি ৪,০০৫ পৃষ্ঠা এবং শহীদদের তালিকা ২,৭২৪ পৃষ্ঠা। গত ১২ মে চিফ প্রসিকিউটরের কাছে এই বিশদ প্রতিবেদন জমা দেয় তদন্ত সংস্থা।
এই রায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে বলে পর্যবেক্ষকদের মন্তব্য।















