সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আলোচনায় ‘রাতের ডিসি’, কোন যোগ্যতায় নিয়োগ পাচ্ছেন-বিবিসি বাংলা

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৬:৪৫:৩৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৬ নভেম্বর ২০২৫
  • / ২১৪ Time View

বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার দেশজুড়ে ৫০টিরও বেশি জেলায় জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে রদবদল করেছে। যেসব জেলার ডিসিদের বদলি করা হয়নি, তারাই পরবর্তী নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসক নিয়োগকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের ভেতরে দুই প্রধান রাজনৈতিক বলয়ের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত মিলছে।—বিবিসি বাংলা।

এর আগে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার জানিয়ে রেখেছিল, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অনুষ্ঠিত তিনটি নির্বাচনে যারা ন্যূনতমভাবেও যুক্ত ছিলেন, এমন কোনো কর্মকর্তা আগামী জাতীয় নির্বাচনে দায়িত্ব পাবেন না।

ফলে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে প্রশাসন ক্যাডারের পরিবর্তে বিলুপ্ত অর্থনীতি ক্যাডারের কর্মকর্তাদের এখন বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। তবে অনেকেরই মাঠ প্রশাসনে কাজ করার অভিজ্ঞতা নেই, যা সমালোচনার কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও মাঠ প্রশাসনের অভিজ্ঞতা ছাড়া কাউকে জেলা প্রশাসক বা ডিসি করলে তা ভালো নির্বাচনে সহায়ক হবে না। তিনি আরও বলেন, সরকার যেই ধরনের নির্বাচন চাইবে, ডিসি ও ইউএনও যাকে দায়িত্ব দিক না কেন, সেই ধরনের নির্বাচনই হবে। রাজনীতিকরা যদি ভালো নির্বাচন না চায়, তবে কেউ তা বাস্তবায়ন করতে পারবে না।

ঢালাওভাবে সকলকে দোষারোপ না করে সরকারের উচিত চৌকস, কৌশলী ও দক্ষ কর্মকর্তাদের পদায়ন নিশ্চিত করা।

প্রসঙ্গত, সরকারের ঘোষণার অনুযায়ী ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে বাকি সব দলকে নিয়ে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।

দিনে-রাতে ডিসি বদল তৎপর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ৯ নভেম্বর রাতের ঘুমের সময়ে ১৪ জেলায় নতুন জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করলে সামাজিক মাধ্যমে ‘রাতের ডিসি’ বিষয়টি তীব্র আলোচনার জন্ম দেয়। প্রজ্ঞাপনটি গভীর রাতে জারি হওয়ায় বিষয়টি আরও বেশি নজর কাড়ে।

এর আগে শনিবার সরকার আরও ১৫টি জেলায় ডিসি নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল। পরবর্তীতে বৃহস্পতিবার পৃথক দুটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আরও ২৩টি জেলায় নতুন ডিসি নিয়োগের ঘোষণা আসে। এ প্রজ্ঞাপনের মধ্যে কিছু জেলায় বিদ্যমান ডিসিদের বদলি করা হয়, আর বাকিগুলোতে নতুন কর্মকর্তারা ডিসি হিসেবে দায়িত্ব পান।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, অর্থনীতি ক্যাডার থেকে প্রশাসন ক্যাডারে যুক্ত কিছু কর্মকর্তাকে ডিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যারা মাঠ প্রশাসন ও নির্বাচনি কাজের পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। জেলা প্রশাসনে কাজ করা কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সাধারণত জেলা প্রশাসকরা কালেকটর হিসেবে ভূমি রাজস্ব আদায় এবং সরকারের মালিকানাধীন ভূমি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করেন।

ফলে ডিসি বা জেলা প্রশাসকের জন্য মাঠ পর্যায়ে ভূমিসংক্রান্ত কাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা কর্মজীবনের শুরুতেই ম্যাজিস্ট্রেট ও এসি ল্যান্ড (সহকারী কমিশনার ভূমি) হিসেবে কাজের মধ্য দিয়ে এই অভিজ্ঞতা অর্জন শুরু করেন। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে কাজ করে তারা আরও দক্ষ হয়ে ওঠেন।

পদায়ন সংক্রান্ত নীতিমালা অনুযায়ী, একজন কর্মকর্তার জেলা প্রশাসক হওয়ার জন্য মাঠ প্রশাসনে অন্তত দুই বছরের অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক। তবে এবারে নিয়োগ পাওয়া বেশ কিছু কর্মকর্তার ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতার অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া বলেন, মাঠ প্রশাসনে অভিজ্ঞতা নেই এবং নির্বাচনের কাজে কখনও যুক্ত ছিলেন না এমন কাউকে জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিলে তিনি নির্বাচনে কার্যকর অবদান রাখতে পারবেন না। বরং তার কারণে সমস্যা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। নির্বাচনে বিভিন্ন ধরনের ‘খেলোয়াড়’ থাকে, এবং তাদের পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা শুধুমাত্র মাঠ প্রশাসন বা নির্বাচনি কাজের পূর্ব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আসে।

এছাড়া, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা পদাধিকার অনুসারে নির্বাচনের সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ফলে তারা নির্বাচনি কাজ করা বা না করার বিষয়ে নিজস্ব কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।

আওয়ামী লীগ আমলে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে যেসব ডিসি রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তারা বর্তমানে সেই পদে নেই। অনেকের পদোন্নতি হয়েছে, আবার কিছু কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলকভাবে অবসর দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সরকার অনেককে ওএসডি বা বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ৪৫ জনকে চলতি বছরের শুরুতে ওএসডি করা হয়েছিল।

এছাড়া, গত তিনটি বিতর্কিত সংসদ নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা সাবেক জেলা প্রশাসকদের মধ্যে যাদের চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে, তাদের মধ্যে ২২ জনকে তখন বাধ্যতামূলকভাবে অবসরে পাঠানো হয়েছিল। আর যাদের বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হয়নি, তাদের মধ্যে ৪৩ জনকে ওএসডি করা হয়েছিল।

অন্যদিকে, যারা তখন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন, তাদের পদাধিকার অনুসারে সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে কাজ করতে হয়েছিল।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া বলেন, আসলে জাতীয় নির্বাচনে ইউএনওদের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে না। নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ থাকে জেলা প্রশাসক, প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসার এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের। ফলে যারা ইউএনও ছিলেন, তাদের ঢালাওভাবে নির্বাচনের অযোগ্য বলা অন্যায়।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এবারের ডিসি নিয়োগে সাবেক অর্থনীতি ক্যাডারের পাশাপাশি ২৫, ২৭, ২৮ ও ২৯ ব্যাচের বিসিএস কর্মকর্তারা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছেন। এর মধ্যে ২৫তম বিসিএসের কর্মকর্তারা বিএনপির সময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত, আর ২৭তম ব্যাচের লিখিত পরীক্ষা বিএনপির সময়ে হলেও মৌখিক পরীক্ষা ও নিয়োগ হয়েছিল ফখরুদ্দিন আহমেদের কেয়ারটেকার সরকারের আমলে।

২৮তম বিসিএসের সব পরীক্ষা কেয়ারটেকার সরকারের সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, আর কর্মকর্তাদের নিয়োগ হয়েছিল ২০১০ সালে আওয়ামী লীগের আমলে। ২৯তম ব্যাচের পুরো পরীক্ষা ও নিয়োগ প্রক্রিয়াও আওয়ামী লীগের প্রথম আমলে সম্পন্ন হয়েছিল। তবে এসব ব্যাচের যারা গত তিনটি নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের বাদ দিয়ে অন্য কর্মকর্তাদের নিয়ে দুই রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে লড়াই চলছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। চাকরিরত থাকায় তারা তাদের নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।

সরকারের দুজন উপদেষ্টার একান্ত সচিবকে জেলা প্রশাসক করা নিয়ে যেমন আলোচনা হচ্ছে, তেমনি কিছু জেলার ডিসি সরিয়ে দেওয়ার পেছনে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের অভিযোগও উঠেছে। উদাহরণস্বরূপ, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি জেলার ডিসিকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যদিও তিনি ছাত্রজীবনে ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন বলে পরিচিত।

কর্মকর্তা বাছাইয়ের ক্রাইটেরিয়া

বর্তমান নির্বাচন কমিশন চলতি বছরের জুলাইয়ে ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র স্থাপন এবং ব্যবস্থাপনা নীতিমালা’তে সংশোধনী আনে, যার ফলে সংসদ নির্বাচনের ভোটকেন্দ্র স্থাপনের কর্তৃত্ব থেকে জেলা প্রশাসক ও এসপিদের বাদ দেওয়া হয়েছে।

গত মাসের শেষ দিকে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যে গত তিন নির্বাচনে ‘ন্যূনতম সংশ্লিষ্টতা’ থাকা কোনো কর্মকর্তা আগামী নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এই তথ্য জানিয়েছিলেন

এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, নির্বাচনে কর্মকর্তা পদায়নের মানদণ্ড ও পদায়ন প্রক্রিয়ায় কিছু বিষয় বিবেচনা করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে–– কর্মকর্তার শারীরিক সক্ষমতা, এসিআর বা বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন কেমন, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা বা পলিটিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড, কর্মদক্ষতা, পূর্ববর্তী পোস্টিং এবং পত্রিকায় তার বিষয়ে কোনো রিপোর্ট আসছে কি না।

উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে জোর দেওয়া হয়েছে যে, মাঠ প্রশাসনে গত তিন নির্বাচনে ডিসি, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, ইউএনও বা যারা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের কোনো পদায়ন না করার বিষয়ে। রিটার্নিং অফিসার, পোলিং অফিসার বা অ্যাসিস্ট্যান্ট রিটার্নিং অফিসার হলেও, যদি তারা গত তিন নির্বাচনে ন্যূনতমভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন, তবে তাদের আগামী নির্বাচনে কোনো দায়িত্ব দেওয়া হবে না।

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আলোচনায় ‘রাতের ডিসি’, কোন যোগ্যতায় নিয়োগ পাচ্ছেন-বিবিসি বাংলা

Update Time : ০৬:৪৫:৩৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৬ নভেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার দেশজুড়ে ৫০টিরও বেশি জেলায় জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে রদবদল করেছে। যেসব জেলার ডিসিদের বদলি করা হয়নি, তারাই পরবর্তী নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসক নিয়োগকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের ভেতরে দুই প্রধান রাজনৈতিক বলয়ের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত মিলছে।—বিবিসি বাংলা।

এর আগে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার জানিয়ে রেখেছিল, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অনুষ্ঠিত তিনটি নির্বাচনে যারা ন্যূনতমভাবেও যুক্ত ছিলেন, এমন কোনো কর্মকর্তা আগামী জাতীয় নির্বাচনে দায়িত্ব পাবেন না।

ফলে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে প্রশাসন ক্যাডারের পরিবর্তে বিলুপ্ত অর্থনীতি ক্যাডারের কর্মকর্তাদের এখন বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। তবে অনেকেরই মাঠ প্রশাসনে কাজ করার অভিজ্ঞতা নেই, যা সমালোচনার কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও মাঠ প্রশাসনের অভিজ্ঞতা ছাড়া কাউকে জেলা প্রশাসক বা ডিসি করলে তা ভালো নির্বাচনে সহায়ক হবে না। তিনি আরও বলেন, সরকার যেই ধরনের নির্বাচন চাইবে, ডিসি ও ইউএনও যাকে দায়িত্ব দিক না কেন, সেই ধরনের নির্বাচনই হবে। রাজনীতিকরা যদি ভালো নির্বাচন না চায়, তবে কেউ তা বাস্তবায়ন করতে পারবে না।

ঢালাওভাবে সকলকে দোষারোপ না করে সরকারের উচিত চৌকস, কৌশলী ও দক্ষ কর্মকর্তাদের পদায়ন নিশ্চিত করা।

প্রসঙ্গত, সরকারের ঘোষণার অনুযায়ী ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে বাকি সব দলকে নিয়ে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।

দিনে-রাতে ডিসি বদল তৎপর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ৯ নভেম্বর রাতের ঘুমের সময়ে ১৪ জেলায় নতুন জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করলে সামাজিক মাধ্যমে ‘রাতের ডিসি’ বিষয়টি তীব্র আলোচনার জন্ম দেয়। প্রজ্ঞাপনটি গভীর রাতে জারি হওয়ায় বিষয়টি আরও বেশি নজর কাড়ে।

এর আগে শনিবার সরকার আরও ১৫টি জেলায় ডিসি নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল। পরবর্তীতে বৃহস্পতিবার পৃথক দুটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আরও ২৩টি জেলায় নতুন ডিসি নিয়োগের ঘোষণা আসে। এ প্রজ্ঞাপনের মধ্যে কিছু জেলায় বিদ্যমান ডিসিদের বদলি করা হয়, আর বাকিগুলোতে নতুন কর্মকর্তারা ডিসি হিসেবে দায়িত্ব পান।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, অর্থনীতি ক্যাডার থেকে প্রশাসন ক্যাডারে যুক্ত কিছু কর্মকর্তাকে ডিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যারা মাঠ প্রশাসন ও নির্বাচনি কাজের পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। জেলা প্রশাসনে কাজ করা কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সাধারণত জেলা প্রশাসকরা কালেকটর হিসেবে ভূমি রাজস্ব আদায় এবং সরকারের মালিকানাধীন ভূমি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করেন।

ফলে ডিসি বা জেলা প্রশাসকের জন্য মাঠ পর্যায়ে ভূমিসংক্রান্ত কাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা কর্মজীবনের শুরুতেই ম্যাজিস্ট্রেট ও এসি ল্যান্ড (সহকারী কমিশনার ভূমি) হিসেবে কাজের মধ্য দিয়ে এই অভিজ্ঞতা অর্জন শুরু করেন। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে কাজ করে তারা আরও দক্ষ হয়ে ওঠেন।

পদায়ন সংক্রান্ত নীতিমালা অনুযায়ী, একজন কর্মকর্তার জেলা প্রশাসক হওয়ার জন্য মাঠ প্রশাসনে অন্তত দুই বছরের অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক। তবে এবারে নিয়োগ পাওয়া বেশ কিছু কর্মকর্তার ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতার অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া বলেন, মাঠ প্রশাসনে অভিজ্ঞতা নেই এবং নির্বাচনের কাজে কখনও যুক্ত ছিলেন না এমন কাউকে জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিলে তিনি নির্বাচনে কার্যকর অবদান রাখতে পারবেন না। বরং তার কারণে সমস্যা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। নির্বাচনে বিভিন্ন ধরনের ‘খেলোয়াড়’ থাকে, এবং তাদের পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা শুধুমাত্র মাঠ প্রশাসন বা নির্বাচনি কাজের পূর্ব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আসে।

এছাড়া, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা পদাধিকার অনুসারে নির্বাচনের সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ফলে তারা নির্বাচনি কাজ করা বা না করার বিষয়ে নিজস্ব কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।

আওয়ামী লীগ আমলে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে যেসব ডিসি রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তারা বর্তমানে সেই পদে নেই। অনেকের পদোন্নতি হয়েছে, আবার কিছু কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলকভাবে অবসর দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সরকার অনেককে ওএসডি বা বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ৪৫ জনকে চলতি বছরের শুরুতে ওএসডি করা হয়েছিল।

এছাড়া, গত তিনটি বিতর্কিত সংসদ নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা সাবেক জেলা প্রশাসকদের মধ্যে যাদের চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে, তাদের মধ্যে ২২ জনকে তখন বাধ্যতামূলকভাবে অবসরে পাঠানো হয়েছিল। আর যাদের বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হয়নি, তাদের মধ্যে ৪৩ জনকে ওএসডি করা হয়েছিল।

অন্যদিকে, যারা তখন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন, তাদের পদাধিকার অনুসারে সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে কাজ করতে হয়েছিল।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া বলেন, আসলে জাতীয় নির্বাচনে ইউএনওদের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে না। নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ থাকে জেলা প্রশাসক, প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসার এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের। ফলে যারা ইউএনও ছিলেন, তাদের ঢালাওভাবে নির্বাচনের অযোগ্য বলা অন্যায়।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এবারের ডিসি নিয়োগে সাবেক অর্থনীতি ক্যাডারের পাশাপাশি ২৫, ২৭, ২৮ ও ২৯ ব্যাচের বিসিএস কর্মকর্তারা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছেন। এর মধ্যে ২৫তম বিসিএসের কর্মকর্তারা বিএনপির সময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত, আর ২৭তম ব্যাচের লিখিত পরীক্ষা বিএনপির সময়ে হলেও মৌখিক পরীক্ষা ও নিয়োগ হয়েছিল ফখরুদ্দিন আহমেদের কেয়ারটেকার সরকারের আমলে।

২৮তম বিসিএসের সব পরীক্ষা কেয়ারটেকার সরকারের সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, আর কর্মকর্তাদের নিয়োগ হয়েছিল ২০১০ সালে আওয়ামী লীগের আমলে। ২৯তম ব্যাচের পুরো পরীক্ষা ও নিয়োগ প্রক্রিয়াও আওয়ামী লীগের প্রথম আমলে সম্পন্ন হয়েছিল। তবে এসব ব্যাচের যারা গত তিনটি নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের বাদ দিয়ে অন্য কর্মকর্তাদের নিয়ে দুই রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে লড়াই চলছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। চাকরিরত থাকায় তারা তাদের নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।

সরকারের দুজন উপদেষ্টার একান্ত সচিবকে জেলা প্রশাসক করা নিয়ে যেমন আলোচনা হচ্ছে, তেমনি কিছু জেলার ডিসি সরিয়ে দেওয়ার পেছনে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের অভিযোগও উঠেছে। উদাহরণস্বরূপ, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি জেলার ডিসিকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যদিও তিনি ছাত্রজীবনে ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন বলে পরিচিত।

কর্মকর্তা বাছাইয়ের ক্রাইটেরিয়া

বর্তমান নির্বাচন কমিশন চলতি বছরের জুলাইয়ে ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র স্থাপন এবং ব্যবস্থাপনা নীতিমালা’তে সংশোধনী আনে, যার ফলে সংসদ নির্বাচনের ভোটকেন্দ্র স্থাপনের কর্তৃত্ব থেকে জেলা প্রশাসক ও এসপিদের বাদ দেওয়া হয়েছে।

গত মাসের শেষ দিকে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যে গত তিন নির্বাচনে ‘ন্যূনতম সংশ্লিষ্টতা’ থাকা কোনো কর্মকর্তা আগামী নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এই তথ্য জানিয়েছিলেন

এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, নির্বাচনে কর্মকর্তা পদায়নের মানদণ্ড ও পদায়ন প্রক্রিয়ায় কিছু বিষয় বিবেচনা করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে–– কর্মকর্তার শারীরিক সক্ষমতা, এসিআর বা বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন কেমন, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা বা পলিটিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড, কর্মদক্ষতা, পূর্ববর্তী পোস্টিং এবং পত্রিকায় তার বিষয়ে কোনো রিপোর্ট আসছে কি না।

উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে জোর দেওয়া হয়েছে যে, মাঠ প্রশাসনে গত তিন নির্বাচনে ডিসি, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, ইউএনও বা যারা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের কোনো পদায়ন না করার বিষয়ে। রিটার্নিং অফিসার, পোলিং অফিসার বা অ্যাসিস্ট্যান্ট রিটার্নিং অফিসার হলেও, যদি তারা গত তিন নির্বাচনে ন্যূনতমভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন, তবে তাদের আগামী নির্বাচনে কোনো দায়িত্ব দেওয়া হবে না।