মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনার রায় ঘোষণা ১৭ নভেম্বর
- Update Time : ১২:৪০:২৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ নভেম্বর ২০২৫
- / ২২৩ Time View

জুলাই–আগস্ট গণআন্দোলনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিনজন আসামির বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করা হবে আগামী সোমবার, ১৭ নভেম্বর। বৃহস্পতিবার (১৩ নভেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১–এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই তারিখ নির্ধারণ করেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারপতি মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। মামলার অপর দুই আসামি হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুন।
মামলার পটভূমি
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। নতুনভাবে গঠিত এই ট্রাইব্যুনালেই মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রথম মামলাটি হয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে। ১৭ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে ট্রাইব্যুনাল আনুষ্ঠানিকভাবে বিচারকাজ শুরু করে এবং সেদিনই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়।
পরে তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুনকেও একই মামলায় আসামি করা হয়। ২০২৫ সালের ১২ মে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ৮,৭৪৭ পৃষ্ঠার বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেয়। এর মধ্যে তথ্যসূত্র রয়েছে ২,০১৮ পৃষ্ঠা, জব্দতালিকা ও দালিলিক প্রমাণ ৪,০০৫ পৃষ্ঠা এবং শহীদদের তালিকা ২,৭২৪ পৃষ্ঠা।
১ জুন ২০২৫ প্রসিকিউশন আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ দাখিল করে এবং ১০ জুলাই তিন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু হয়।
রাজসাক্ষীর স্বীকারোক্তি
বিচারের এক পর্যায়ে সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুন দোষ স্বীকার করে রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদন জানান। ট্রাইব্যুনাল আবেদনটি মঞ্জুর করে তাকে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী (অ্যাপ্রুভার) হিসেবে সাক্ষ্য দেওয়ার অনুমতি দেয়।
পরে ২৩ অক্টোবর, অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান তার সমাপনী বক্তব্যে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানের সর্বোচ্চ শাস্তি—অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড—দাবি করেন। চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামও একই দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রনিযুক্ত প্রতিরক্ষা আইনজীবী মো. আমির হোসেন আসামিদের খালাস চান।
প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম বলেন,
“আমরা আশা করছি রায়ে শেখ হাসিনা ও কামালের মৃত্যুদণ্ড হবে। বিচার বাধাগ্রস্ত করতে আওয়ামী লীগ দেশ–বিদেশে অপচেষ্টা চালাচ্ছে, কিন্তু আদালতের কার্যক্রম থেমে নেই—বিচার তার নিজস্ব গতিতেই এগোচ্ছে।”
অভিযোগের সারসংক্ষেপ
মামলায় প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে মোট পাঁচটি অভিযোগ উত্থাপন করা হয়:
- প্রথম অভিযোগ:
২০২৪ সালের ১৪ জুলাই গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা আন্দোলনরত ছাত্রদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। এই বক্তব্যের পরপরই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, আইজিপি মামুন এবং আওয়ামী সন্ত্রাসীদের নেতৃত্বে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছাত্র–জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে ১,৫০০ জন নিহত এবং ২৫,০০০ জন আহত হন। - দ্বিতীয় অভিযোগ:
শেখ হাসিনা আন্দোলন দমন করতে হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেন। অডিও প্রমাণে এই নির্দেশের সত্যতা উঠে আসে। - তৃতীয় অভিযোগ:
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান ও মামুনের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে তদন্তে উঠে আসে। - চতুর্থ অভিযোগ:
ঢাকার চানখাঁরপুলে আন্দোলনরত ছয় নিরস্ত্র নাগরিককে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায়ও তিন আসামির নাম উল্লেখ আছে। - পঞ্চম অভিযোগ:
আশুলিয়ায় ছয়জন নিরীহ নাগরিককে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান ও মামুনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়।
রায়ের অপেক্ষা
সব পক্ষের বক্তব্য ও সাক্ষ্য–প্রমাণ গ্রহণ শেষে ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করেছে ১৭ নভেম্বর (সোমবার)। এদিনই নির্ধারিত হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত এই মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার রায়—
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এবং সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুনের ভাগ্যে কী ঘটছে।
আইনজীবী ও বিশ্লেষকদের মতে, এই রায় শুধু অভিযুক্তদের ভবিষ্যৎই নির্ধারণ করবে না, বরং তা বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার অঙ্গনে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।















