সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে শুরু হবে সংবিধান সংস্কারের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৭:৩০:২৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ নভেম্বর ২০২৫
  • / ২৬০ Time View

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই একযোগে অনুষ্ঠিত হবে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা— জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন বিষয়ে গণভোট। এই গণভোটে চারটি মৌলিক প্রস্তাবের ওপর একটিমাত্র প্রশ্নের মাধ্যমে ভোটাররা তাঁদের মতামত জানাবেন ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ চিহ্ন দিয়ে।

বৃহস্পতিবার (১৩ নভেম্বর) রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ যদি ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন, তাহলে কী ঘটবে এবং তার রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক প্রভাব কী হবে।

তিনি বলেন, “গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট যদি ‘হ্যাঁ’ সূচক হয়, তাহলে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়েই একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে। এই পরিষদ একই সঙ্গে জাতীয় সংসদ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবে। পরিষদ তার প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কারের কাজ সম্পন্ন করবে।

প্রধান উপদেষ্টা আরও জানান, সংস্কার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে উচ্চকক্ষ (সেনেট) গঠন করা হবে, যেখানে সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন সদস্য অন্তর্ভুক্ত হবেন। এই উচ্চকক্ষের মেয়াদ নিম্নকক্ষের (জাতীয় সংসদ) শেষ কার্যদিবস পর্যন্ত বহাল থাকবে।

ড. ইউনূস বলেন, “এভাবে জনগণের প্রত্যক্ষ মতামতের মাধ্যমে আমরা একটি অংশগ্রহণমূলক, জবাবদিহিমূলক এবং ভারসাম্যপূর্ণ রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলব, যা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য স্থিতিশীল গণতন্ত্রের ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।”

তিনি আরও যোগ করেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকারনামা অনুসারে সংবিধানে সনদটি অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হবে গণভোটের ফলাফল ঘোষণার পরই। “এই আদেশ ইতিমধ্যে অনুমোদিত হয়েছে, যা সংবিধান সংশোধনের সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরি করবে,” বলেন তিনি।

গণভোটের প্রশ্নটি থাকবে নিম্নরূপে:

আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?”

প্রশ্নের নিচে চারটি প্রস্তাব থাকবে—

ক) নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী গঠন করা হবে।

খ) আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট (Bicameral Parliament)— একটি নিম্নকক্ষ (জাতীয় সংসদ) এবং একটি উচ্চকক্ষ (সেনেট)। জাতীয় নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠিত হবে, এবং সংবিধান সংশোধনের জন্য উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন বাধ্যতামূলক হবে।

গ) সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ নিশ্চিতকরণ, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকারের বিকেন্দ্রীকরণসহ ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে— যা আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে।

ঘ) জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারগুলো রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুসারে ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, যদি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের জোয়ার আসে, তাহলে এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করবে। প্রথমবারের মতো জনগণের সরাসরি মতামতের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কারের প্রক্রিয়া শুরু হবে— যা গণতান্ত্রিক উন্নয়নের একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে শুরু হবে সংবিধান সংস্কারের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া

Update Time : ০৭:৩০:২৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ নভেম্বর ২০২৫

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই একযোগে অনুষ্ঠিত হবে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা— জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন বিষয়ে গণভোট। এই গণভোটে চারটি মৌলিক প্রস্তাবের ওপর একটিমাত্র প্রশ্নের মাধ্যমে ভোটাররা তাঁদের মতামত জানাবেন ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ চিহ্ন দিয়ে।

বৃহস্পতিবার (১৩ নভেম্বর) রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ যদি ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন, তাহলে কী ঘটবে এবং তার রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক প্রভাব কী হবে।

তিনি বলেন, “গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট যদি ‘হ্যাঁ’ সূচক হয়, তাহলে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়েই একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে। এই পরিষদ একই সঙ্গে জাতীয় সংসদ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবে। পরিষদ তার প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কারের কাজ সম্পন্ন করবে।

প্রধান উপদেষ্টা আরও জানান, সংস্কার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে উচ্চকক্ষ (সেনেট) গঠন করা হবে, যেখানে সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন সদস্য অন্তর্ভুক্ত হবেন। এই উচ্চকক্ষের মেয়াদ নিম্নকক্ষের (জাতীয় সংসদ) শেষ কার্যদিবস পর্যন্ত বহাল থাকবে।

ড. ইউনূস বলেন, “এভাবে জনগণের প্রত্যক্ষ মতামতের মাধ্যমে আমরা একটি অংশগ্রহণমূলক, জবাবদিহিমূলক এবং ভারসাম্যপূর্ণ রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলব, যা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য স্থিতিশীল গণতন্ত্রের ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।”

তিনি আরও যোগ করেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকারনামা অনুসারে সংবিধানে সনদটি অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হবে গণভোটের ফলাফল ঘোষণার পরই। “এই আদেশ ইতিমধ্যে অনুমোদিত হয়েছে, যা সংবিধান সংশোধনের সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরি করবে,” বলেন তিনি।

গণভোটের প্রশ্নটি থাকবে নিম্নরূপে:

আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?”

প্রশ্নের নিচে চারটি প্রস্তাব থাকবে—

ক) নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী গঠন করা হবে।

খ) আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট (Bicameral Parliament)— একটি নিম্নকক্ষ (জাতীয় সংসদ) এবং একটি উচ্চকক্ষ (সেনেট)। জাতীয় নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠিত হবে, এবং সংবিধান সংশোধনের জন্য উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন বাধ্যতামূলক হবে।

গ) সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ নিশ্চিতকরণ, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকারের বিকেন্দ্রীকরণসহ ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে— যা আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে।

ঘ) জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারগুলো রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুসারে ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, যদি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের জোয়ার আসে, তাহলে এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করবে। প্রথমবারের মতো জনগণের সরাসরি মতামতের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কারের প্রক্রিয়া শুরু হবে— যা গণতান্ত্রিক উন্নয়নের একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।