আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের নোটিশ আইনসঙ্গত নয়: অ্যাডভোকেট শিশির মনির
- Update Time : ০২:২০:০৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
- / ৬৫ Time View

ঢাকার মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের জন্য যে নোটিশ জারি করা হয়েছে, তা আইনগতভাবে বৈধ নয় বলে দাবি করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনির। তিনি জানিয়েছেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই নোটিশের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন। সংবাদ সম্মেলনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও উপস্থিত ছিলেন।
শিশির মনির বলেন, একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া, তদন্ত প্রতিবেদন এবং ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতিগুলো অনুসরণ করা আবশ্যক। তিনি দাবি করেন, আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পাঠানো নোটিশে সেই প্রক্রিয়াগত বিষয়গুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। ফলে নোটিশটির আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তিনি আরও জানান, হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ তদন্তে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে দুই নার্সকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি যেসব ব্যক্তি কর্তব্য পালনে গাফিলতি করেছেন বলে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেও তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অবস্থান সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে শিশির মনির বলেন, নিহত নবজাতকদের পরিবার এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ—উভয় পক্ষই চান না যে হাসপাতালটির সেবা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাক। বরং তারা চান, ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন হোক এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক, যাতে ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক ঘটনা আর না ঘটে।
তিনি বলেন, “যেসব পরিবার তাদের সন্তান হারিয়েছে, তাদের বেদনা কোনোভাবেই পূরণ করার নয়। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে তাদের পাশে থাকতে চায়। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের যোগ্য সদস্যদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং সম্মানজনক আর্থিক সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
সংবাদ সম্মেলনে সাম্প্রতিক সময়ে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনাও আলোচনায় আসে। এ বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করে শিশির মনির বলেন, সাংবাদিকদের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ ঘটনার জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখিত এবং ক্ষমাপ্রার্থী।
তিনি জানান, ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং যারা এতে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি অনুরোধ জানান, ঘটনাটিকে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করার জন্য।
তবে সাংবাদিকদের একাধিক প্রশ্নের মুখেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সরাসরি ঘটনার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে রাজি হয়নি। ফলে নবজাতকদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার সম্ভাব্য ত্রুটি কিংবা ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে অনেক প্রশ্নের উত্তর এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গভর্নিং বডির সভাপতি অধ্যাপক আব্দুর সবুর খানও সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, এ ঘটনায় জড়িত দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে তাদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
এদিকে নিহত নবজাতকদের একজনের বাবা হাবিবুর রহমান আবেগঘন বক্তব্যে বলেন, “এটি ছিল আমার তৃতীয় সন্তান। আমার প্রথম দুই সন্তানের জন্মও এই হাসপাতালেই হয়েছিল। সেবার মান ভালো মনে হওয়ায় এবারও আমরা এখানেই এসেছিলাম। কিন্তু যা ঘটেছে তা কোনো পরিবারের জন্যই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।”
তিনি বলেন, “আমরা হাসপাতালটি বন্ধ হয়ে যাক তা চাই না। আমরা চাই, যেসব ত্রুটি ও অব্যবস্থাপনা রয়েছে সেগুলো সংশোধন করা হোক। ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবার যেন আমাদের মতো এমন শোকের মুখোমুখি না হয়।”
উল্লেখ্য, সম্প্রতি আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অল্প সময়ের ব্যবধানে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তদন্ত শুরু করে এবং হাসপাতালের কার্যক্রম, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ নিয়ে জনমনে উদ্বেগ ও আলোচনা অব্যাহত থাকবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।









