সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশে রাজনীতি কি কর্মীদের রুটি-রোজগারের হাতিয়ার?

বিল্লাল হোসেন
  • Update Time : ০৯:৩২:৪৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২ জুন ২০২৬
  • / ২৪৩ Time View

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে দেখা যায়—দেশের বড় বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন, গণআন্দোলন, স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রাম কিংবা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াই কখনোই কেবল শীর্ষ নেতৃত্বের একক প্রচেষ্টায় সফল হয়নি। প্রতিটি আন্দোলনের পেছনে ছিল হাজার হাজার ত্যাগী কর্মীর ঘাম, শ্রম, ত্যাগ, কারাবরণ, নির্যাতন এবং কখনো কখনো জীবন উৎসর্গের ইতিহাস। রাজনৈতিক দলের প্রকৃত শক্তি কোনো নেতার বক্তৃতায় নয়, বরং তৃণমূলের সেই কর্মীদের মধ্যে নিহিত, যারা প্রতিকূলতার মধ্যেও পতাকা বহন করে সংগঠনকে টিকিয়ে রাখেন।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ করে গত প্রায় দেড় দশকে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা নানা ধরনের প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন। অনেকেই মামলা, গ্রেপ্তার, কারাবরণ, ব্যবসায়িক ক্ষতি, চাকরি হারানো, সামাজিক বঞ্চনা এবং পারিবারিক সংকটের মধ্য দিয়েও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছেন। তাদের অনেকের জীবনের সেরা সময় কেটেছে রাজনৈতিক সংগ্রামে। ফলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তাদের মনে স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রত্যাশা জন্ম নেয় যে, তাদের ত্যাগ ও অবদানের মূল্যায়ন হবে।

এই প্রত্যাশাকে অস্বাভাবিক বলা যাবে না। বরং এটি মানবিক এবং রাজনৈতিক বাস্তবতারই অংশ। কারণ একজন কর্মী যখন নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে একটি রাজনৈতিক আদর্শের জন্য দীর্ঘ সময় ব্যয় করেন, তখন তিনি স্বাভাবিকভাবেই মনে করেন যে সংগঠন তার অবদানকে স্মরণ রাখবে। কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—একটি রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব কোথায় শেষ হয় এবং একজন কর্মীর ব্যক্তিগত দায়িত্ব কোথা থেকে শুরু হয়?

বাস্তবতা হলো, রাজনৈতিক দল কোনো কর্মসংস্থান প্রকল্প নয়। কোনো রাজনৈতিক সংগঠন লাখো কর্মীর ব্যক্তিগত জীবিকা নিশ্চিত করার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় না। একটি রাজনৈতিক দলের মূল উদ্দেশ্য হলো জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি নির্ধারণ করা এবং একটি আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক দর্শন বাস্তবায়ন করা। ফলে দল কর্মীদের রাজনৈতিক পরিচয়, নেতৃত্বের সুযোগ এবং সংগ্রামের প্ল্যাটফর্ম দিতে পারে; কিন্তু প্রত্যেক কর্মীর অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।

সমস্যার সূচনা ঘটে তখন, যখন রাজনীতি আদর্শের চেয়ে জীবিকার মাধ্যম হিসেবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তখন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য পরিবর্তিত হতে শুরু করে। সংগ্রামের জায়গা দখল করে নেয় ব্যক্তিগত প্রত্যাশা। আদর্শের জায়গায় আসে সুবিধা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। আর সেই প্রত্যাশা পূরণ না হলে জন্ম নেয় হতাশা, ক্ষোভ এবং বিভক্তি।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অন্যতম দুর্বলতা এখানেই। বহু মানুষ রাজনীতিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করলেও বিকল্প কোনো অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলতে পারেন না। দীর্ঘদিন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত থাকার কারণে তারা ব্যবসা, চাকরি বা পেশাগত দক্ষতা অর্জনের সুযোগ হারান। পরবর্তীতে তারা দলীয় সুযোগ-সুবিধার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এর ফলে রাজনৈতিক সংগঠনও এক ধরনের চাপের মধ্যে পড়ে যায়। কারণ তখন আদর্শভিত্তিক কর্মীর পরিবর্তে সুবিধাভোগী কর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যেসব রাজনৈতিক সংগঠন আত্মনির্ভর ও পেশাজীবী কর্মী তৈরি করতে পেরেছে, তারাই দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী হয়েছে। বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীর নিজস্ব পেশাগত পরিচয় রয়েছে। কেউ শিক্ষক, কেউ আইনজীবী, কেউ চিকিৎসক, কেউ কৃষক, কেউ উদ্যোক্তা, আবার কেউ প্রযুক্তি খাতের পেশাজীবী। রাজনীতি তাদের পরিচয়ের একটি অংশ, জীবিকার একমাত্র উৎস নয়।

এই কারণেই পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও ব্যক্তির জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে না। কারণ তার অর্থনৈতিক ভিত্তি রাজনীতির ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং এই স্বাধীনতা তাকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেও অধিকতর সাহসী ও নীতিবান করে তোলে। তিনি ক্ষমতার কাছে আপস করতে বাধ্য হন না।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় শিক্ষা রয়েছে। বর্তমান যুগে শুধু রাজনৈতিক পরিচয় যথেষ্ট নয়। প্রযুক্তি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, ফ্রিল্যান্সিং, দক্ষতা উন্নয়ন কিংবা পেশাগত শিক্ষার মাধ্যমে অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলা অপরিহার্য। একজন আত্মনির্ভর কর্মী দলকে বেশি শক্তি দিতে পারেন, কারণ তিনি রাজনৈতিক চাপ বা আর্থিক অনিশ্চয়তার কারণে সহজে নীতিগত অবস্থান পরিবর্তন করেন না।

আরেকটি বাস্তবতা হলো, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আসা কোনো সরকারই রাতারাতি সব সমস্যার সমাধান করতে পারে না। বিশেষ করে যখন একটি সরকার অর্থনৈতিক সংকট, দুর্বল প্রতিষ্ঠান, প্রশাসনিক অকার্যকারিতা এবং আর্থিক অস্থিরতার মতো বহু সমস্যার উত্তরাধিকার পায়, তখন সংস্কার ও পুনর্গঠন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়।

এমন পরিস্থিতিতে অনেক ত্যাগী কর্মীর মনে হতাশা সৃষ্টি হতে পারে। তারা ভাবতে পারেন, তাদের অবদান যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে না। কিন্তু রাজনৈতিক পরিপক্বতার দাবি হলো বৃহত্তর বাস্তবতা বোঝা। রাষ্ট্রের পুনর্গঠন এবং অর্থনীতির পুনরুদ্ধার সময়সাপেক্ষ বিষয়। ফলে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা প্রয়োজন।

এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে সবসময় কিছু সুবিধাবাদী ও হাইব্রিড গোষ্ঠী সক্রিয় থাকে। তারা প্রকৃত ত্যাগী কর্মীদের হতাশা ও ক্ষোভকে ব্যবহার করে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করে। নানা ধরনের গুজব, বিভ্রান্তি এবং অবিশ্বাস সৃষ্টি করে তারা সংগঠনের ভেতরে বিভক্তি তৈরির চেষ্টা করে। রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন উদাহরণ নতুন নয়। তাই কর্মীদের আবেগ নয়, বাস্তবতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা উচিত।

একজন সচেতন রাজনৈতিক কর্মীর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার আত্মমর্যাদা। তিনি জানেন, রাজনীতি সমাজ পরিবর্তনের মাধ্যম, ব্যক্তিগত ভাগ্য পরিবর্তনের একমাত্র পথ নয়। তিনি সংগঠনের জন্য কাজ করবেন, জনগণের জন্য কাজ করবেন, কিন্তু নিজের পরিবার ও ভবিষ্যতের দায়িত্বও নিজেই বহন করবেন।

প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক অধিকার, সম্মান এবং নেতৃত্বের স্থান কেউ কাউকে উপহার দেয় না; তা অর্জন করতে হয় কর্ম, যোগ্যতা এবং সাংগঠনিক দক্ষতার মাধ্যমে। কিন্তু সেই অর্জনের পথ হতে হবে ইতিবাচক, গণতান্ত্রিক এবং গঠনমূলক। ক্ষোভ, বিভক্তি কিংবা অবাস্তব প্রত্যাশা কোনো সংগঠনকে শক্তিশালী করতে পারে না।

আজকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক কর্মীদের সামনে তাই দ্বৈত দায়িত্ব রয়েছে। একদিকে আদর্শ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া, অন্যদিকে নিজেদের অর্থনৈতিক ও পেশাগত ভিত্তি শক্তিশালী করা। এই দুইয়ের সমন্বয়ই একজন কর্মীকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন, মর্যাদাবান এবং দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, রাজনৈতিক দল একজন কর্মীকে পরিচয় দিতে পারে, সংগ্রামের মঞ্চ দিতে পারে, নেতৃত্বের সুযোগ দিতে পারে এবং সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখাতে পারে। কিন্তু জীবনের ভিত্তি নির্মাণের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত ব্যক্তির নিজেরই। তাই রাজনীতিকে ভালোবাসতে হবে, আদর্শকে ধারণ করতে হবে, কিন্তু নিজের জীবনের চাবিকাঠি কখনোই অন্যের হাতে তুলে দেওয়া যাবে না। আত্মনির্ভরতা, দক্ষতা এবং আত্মমর্যাদাই হবে আগামী দিনের রাজনৈতিক কর্মীর সবচেয়ে বড় পুঁজি এবং সবচেয়ে নিরাপদ শক্তি।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

বিল্লাল হোসেন

বিল্লাল হোসেন, একজন প্রজ্ঞাবান পেশাজীবী, যিনি গণিতের ওপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ, ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ হিসেবে একটি সমৃদ্ধ ও বহুমুখী ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন। তার আর্থিক খাতে যাত্রা তাকে নেতৃত্বের ভূমিকায় নিয়ে গেছে, বিশেষ করে সৌদি আরবের আল-রাজি ব্যাংকিং Inc. এবং ব্যাংক-আল-বিলাদে বিদেশী সম্পর্ক ও করেসপন্ডেন্ট মেইন্টেনেন্স অফিসার হিসেবে। প্রথাগত অর্থনীতির গণ্ডির বাইরে, বিল্লাল একজন প্রখ্যাত লেখক ও বিশ্লেষক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালে মননশীল কলাম ও গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করে। তার দক্ষতা বিস্তৃত বিষয় জুড়ে রয়েছে, যেমন অর্থনীতির জটিলতা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, প্রবাসী শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্ট, রেমিটেন্স, রিজার্ভ এবং অন্যান্য সম্পর্কিত দিক। বিল্লাল তার লেখায় একটি অনন্য বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসেন, যা ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে অর্জিত বাস্তব জ্ঞানকে একত্রিত করে একাডেমিক কঠোরতার সাথে। তার প্রবন্ধগুলো শুধুমাত্র জটিল বিষয়গুলির উপর গভীর বোঝাপড়ার প্রতিফলন নয়, বরং পাঠকদের জন্য জ্ঞানপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা তত্ত্ব ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। বিল্লাল হোসেনের অবদান তার প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করে যে, তিনি আমাদের আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বের জটিলতাগুলি উন্মোচন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের একটি বিস্তৃত এবং আরও সূক্ষ্ম বোঝাপড়ার দিকে মূল্যবান অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।

বাংলাদেশে রাজনীতি কি কর্মীদের রুটি-রোজগারের হাতিয়ার?

Update Time : ০৯:৩২:৪৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২ জুন ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে দেখা যায়—দেশের বড় বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন, গণআন্দোলন, স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রাম কিংবা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াই কখনোই কেবল শীর্ষ নেতৃত্বের একক প্রচেষ্টায় সফল হয়নি। প্রতিটি আন্দোলনের পেছনে ছিল হাজার হাজার ত্যাগী কর্মীর ঘাম, শ্রম, ত্যাগ, কারাবরণ, নির্যাতন এবং কখনো কখনো জীবন উৎসর্গের ইতিহাস। রাজনৈতিক দলের প্রকৃত শক্তি কোনো নেতার বক্তৃতায় নয়, বরং তৃণমূলের সেই কর্মীদের মধ্যে নিহিত, যারা প্রতিকূলতার মধ্যেও পতাকা বহন করে সংগঠনকে টিকিয়ে রাখেন।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ করে গত প্রায় দেড় দশকে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা নানা ধরনের প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন। অনেকেই মামলা, গ্রেপ্তার, কারাবরণ, ব্যবসায়িক ক্ষতি, চাকরি হারানো, সামাজিক বঞ্চনা এবং পারিবারিক সংকটের মধ্য দিয়েও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছেন। তাদের অনেকের জীবনের সেরা সময় কেটেছে রাজনৈতিক সংগ্রামে। ফলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তাদের মনে স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রত্যাশা জন্ম নেয় যে, তাদের ত্যাগ ও অবদানের মূল্যায়ন হবে।

এই প্রত্যাশাকে অস্বাভাবিক বলা যাবে না। বরং এটি মানবিক এবং রাজনৈতিক বাস্তবতারই অংশ। কারণ একজন কর্মী যখন নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে একটি রাজনৈতিক আদর্শের জন্য দীর্ঘ সময় ব্যয় করেন, তখন তিনি স্বাভাবিকভাবেই মনে করেন যে সংগঠন তার অবদানকে স্মরণ রাখবে। কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—একটি রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব কোথায় শেষ হয় এবং একজন কর্মীর ব্যক্তিগত দায়িত্ব কোথা থেকে শুরু হয়?

বাস্তবতা হলো, রাজনৈতিক দল কোনো কর্মসংস্থান প্রকল্প নয়। কোনো রাজনৈতিক সংগঠন লাখো কর্মীর ব্যক্তিগত জীবিকা নিশ্চিত করার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় না। একটি রাজনৈতিক দলের মূল উদ্দেশ্য হলো জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি নির্ধারণ করা এবং একটি আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক দর্শন বাস্তবায়ন করা। ফলে দল কর্মীদের রাজনৈতিক পরিচয়, নেতৃত্বের সুযোগ এবং সংগ্রামের প্ল্যাটফর্ম দিতে পারে; কিন্তু প্রত্যেক কর্মীর অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।

সমস্যার সূচনা ঘটে তখন, যখন রাজনীতি আদর্শের চেয়ে জীবিকার মাধ্যম হিসেবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তখন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য পরিবর্তিত হতে শুরু করে। সংগ্রামের জায়গা দখল করে নেয় ব্যক্তিগত প্রত্যাশা। আদর্শের জায়গায় আসে সুবিধা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। আর সেই প্রত্যাশা পূরণ না হলে জন্ম নেয় হতাশা, ক্ষোভ এবং বিভক্তি।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অন্যতম দুর্বলতা এখানেই। বহু মানুষ রাজনীতিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করলেও বিকল্প কোনো অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলতে পারেন না। দীর্ঘদিন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত থাকার কারণে তারা ব্যবসা, চাকরি বা পেশাগত দক্ষতা অর্জনের সুযোগ হারান। পরবর্তীতে তারা দলীয় সুযোগ-সুবিধার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এর ফলে রাজনৈতিক সংগঠনও এক ধরনের চাপের মধ্যে পড়ে যায়। কারণ তখন আদর্শভিত্তিক কর্মীর পরিবর্তে সুবিধাভোগী কর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যেসব রাজনৈতিক সংগঠন আত্মনির্ভর ও পেশাজীবী কর্মী তৈরি করতে পেরেছে, তারাই দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী হয়েছে। বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীর নিজস্ব পেশাগত পরিচয় রয়েছে। কেউ শিক্ষক, কেউ আইনজীবী, কেউ চিকিৎসক, কেউ কৃষক, কেউ উদ্যোক্তা, আবার কেউ প্রযুক্তি খাতের পেশাজীবী। রাজনীতি তাদের পরিচয়ের একটি অংশ, জীবিকার একমাত্র উৎস নয়।

এই কারণেই পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও ব্যক্তির জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে না। কারণ তার অর্থনৈতিক ভিত্তি রাজনীতির ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং এই স্বাধীনতা তাকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেও অধিকতর সাহসী ও নীতিবান করে তোলে। তিনি ক্ষমতার কাছে আপস করতে বাধ্য হন না।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় শিক্ষা রয়েছে। বর্তমান যুগে শুধু রাজনৈতিক পরিচয় যথেষ্ট নয়। প্রযুক্তি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, ফ্রিল্যান্সিং, দক্ষতা উন্নয়ন কিংবা পেশাগত শিক্ষার মাধ্যমে অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলা অপরিহার্য। একজন আত্মনির্ভর কর্মী দলকে বেশি শক্তি দিতে পারেন, কারণ তিনি রাজনৈতিক চাপ বা আর্থিক অনিশ্চয়তার কারণে সহজে নীতিগত অবস্থান পরিবর্তন করেন না।

আরেকটি বাস্তবতা হলো, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আসা কোনো সরকারই রাতারাতি সব সমস্যার সমাধান করতে পারে না। বিশেষ করে যখন একটি সরকার অর্থনৈতিক সংকট, দুর্বল প্রতিষ্ঠান, প্রশাসনিক অকার্যকারিতা এবং আর্থিক অস্থিরতার মতো বহু সমস্যার উত্তরাধিকার পায়, তখন সংস্কার ও পুনর্গঠন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়।

এমন পরিস্থিতিতে অনেক ত্যাগী কর্মীর মনে হতাশা সৃষ্টি হতে পারে। তারা ভাবতে পারেন, তাদের অবদান যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে না। কিন্তু রাজনৈতিক পরিপক্বতার দাবি হলো বৃহত্তর বাস্তবতা বোঝা। রাষ্ট্রের পুনর্গঠন এবং অর্থনীতির পুনরুদ্ধার সময়সাপেক্ষ বিষয়। ফলে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা প্রয়োজন।

এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে সবসময় কিছু সুবিধাবাদী ও হাইব্রিড গোষ্ঠী সক্রিয় থাকে। তারা প্রকৃত ত্যাগী কর্মীদের হতাশা ও ক্ষোভকে ব্যবহার করে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করে। নানা ধরনের গুজব, বিভ্রান্তি এবং অবিশ্বাস সৃষ্টি করে তারা সংগঠনের ভেতরে বিভক্তি তৈরির চেষ্টা করে। রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন উদাহরণ নতুন নয়। তাই কর্মীদের আবেগ নয়, বাস্তবতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা উচিত।

একজন সচেতন রাজনৈতিক কর্মীর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার আত্মমর্যাদা। তিনি জানেন, রাজনীতি সমাজ পরিবর্তনের মাধ্যম, ব্যক্তিগত ভাগ্য পরিবর্তনের একমাত্র পথ নয়। তিনি সংগঠনের জন্য কাজ করবেন, জনগণের জন্য কাজ করবেন, কিন্তু নিজের পরিবার ও ভবিষ্যতের দায়িত্বও নিজেই বহন করবেন।

প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক অধিকার, সম্মান এবং নেতৃত্বের স্থান কেউ কাউকে উপহার দেয় না; তা অর্জন করতে হয় কর্ম, যোগ্যতা এবং সাংগঠনিক দক্ষতার মাধ্যমে। কিন্তু সেই অর্জনের পথ হতে হবে ইতিবাচক, গণতান্ত্রিক এবং গঠনমূলক। ক্ষোভ, বিভক্তি কিংবা অবাস্তব প্রত্যাশা কোনো সংগঠনকে শক্তিশালী করতে পারে না।

আজকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক কর্মীদের সামনে তাই দ্বৈত দায়িত্ব রয়েছে। একদিকে আদর্শ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া, অন্যদিকে নিজেদের অর্থনৈতিক ও পেশাগত ভিত্তি শক্তিশালী করা। এই দুইয়ের সমন্বয়ই একজন কর্মীকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন, মর্যাদাবান এবং দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, রাজনৈতিক দল একজন কর্মীকে পরিচয় দিতে পারে, সংগ্রামের মঞ্চ দিতে পারে, নেতৃত্বের সুযোগ দিতে পারে এবং সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখাতে পারে। কিন্তু জীবনের ভিত্তি নির্মাণের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত ব্যক্তির নিজেরই। তাই রাজনীতিকে ভালোবাসতে হবে, আদর্শকে ধারণ করতে হবে, কিন্তু নিজের জীবনের চাবিকাঠি কখনোই অন্যের হাতে তুলে দেওয়া যাবে না। আত্মনির্ভরতা, দক্ষতা এবং আত্মমর্যাদাই হবে আগামী দিনের রাজনৈতিক কর্মীর সবচেয়ে বড় পুঁজি এবং সবচেয়ে নিরাপদ শক্তি।