জুলাইয়ের নতুন পে-স্কেল: স্বস্তি নাকি নতুন বৈষম্যের সূচনা?
- Update Time : ১১:৫৬:১৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
- / ১৫৯ Time View

দীর্ঘ এক দশক পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো কার্যকর হতে যাচ্ছে। আগামী ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হতে যাওয়া নবম পে-স্কেল নিঃসন্দেহে লাখো সরকারি কর্মচারীর জন্য একটি বড় স্বস্তির খবর। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যয়ের চাপের মধ্যে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি সময়ের দাবি ছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই সিদ্ধান্ত কি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে স্বস্তি দেবে, নাকি নতুন এক বৈষম্য ও মূল্যস্ফীতির দ্বার উন্মোচন করবে?
বাংলাদেশের অর্থনীতির বাস্তবতা বলছে, দেশের মোট কর্মসংস্থানের মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ সরকারি খাতে। বাকি ৯৩ শতাংশেরও বেশি মানুষ বেসরকারি, করপোরেট ও অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। অথচ নতুন পে-স্কেলের সুফল সরাসরি ভোগ করবেন মাত্র প্রায় ২০ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী। অন্যদিকে কোটি কোটি বেসরকারি চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও নিম্নআয়ের মানুষ এই সিদ্ধান্তের পরোক্ষ চাপ বহন করতে বাধ্য হবেন।
নতুন পে-স্কেলে ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডের বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব নিঃসন্দেহে বড় ধরনের পরিবর্তন। কিন্তু একই সময়ে বেসরকারি খাতের অধিকাংশ কর্মীর বেতন যেখানে ৩ থেকে ৫ শতাংশের বেশি বাড়ছে না, সেখানে এই ব্যবধান সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যকে আরো তীব্র করে তুলবে।
আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো “ক্রয়ক্ষমতার বৈষম্য”। একজন সরকারি কর্মকর্তা নিয়মিত ইনক্রিমেন্ট, ভাতা, পেনশন ও চাকরির নিরাপত্তা পাচ্ছেন; অন্যদিকে বেসরকারি খাতের কর্মীরা চাকরি হারানোর ভয়, উচ্চ কর, সীমিত সুবিধা এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্যে জীবনযাপন করছেন। ফলে নতুন পে-স্কেল শুধু অর্থনৈতিক ব্যবধানই বাড়াবে না, তরুণদের মানসিকতাতেও বড় পরিবর্তন আনবে। মেধাবীরা ক্রমেই উদ্যোক্তা বা উৎপাদনমুখী খাতের পরিবর্তে সরকারি চাকরির দিকে ঝুঁকবেন। এতে দীর্ঘমেয়াদে দেশের উৎপাদনশীল অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আরো উদ্বেগের বিষয় হলো “মনস্তাত্ত্বিক মূল্যস্ফীতি”। বাংলাদেশের বাজারব্যবস্থার একটি নেতিবাচক বাস্তবতা হচ্ছে—সরকারি বেতন বৃদ্ধির খবর এলেই ব্যবসায়ীদের একটি অংশ নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানোর অজুহাত খুঁজে পায়। ২০১৫ সালের অষ্টম পে-স্কেলের পর বাজারে যে কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি হয়েছিল, তার তিক্ত অভিজ্ঞতা এখনো মানুষ ভুলে যায়নি। বর্তমানে যখন মূল্যস্ফীতি টানা কয়েক বছর ধরে ৯ শতাংশের আশপাশে অবস্থান করছে, তখন বাজারে অতিরিক্ত ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকার প্রবাহ নতুন চাপ তৈরি করতেই পারে।
সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, এই মূল্যস্ফীতির চাপ বহন করবে সেই মানুষগুলো, যাদের আয় বাড়ছে না। একজন গার্মেন্টকর্মী, বেসরকারি ব্যাংকার, স্কুলশিক্ষক, দোকানকর্মী বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বাজারে গিয়ে যদি দেখেন চাল, ডাল, তেল, ভাড়া—সব কিছুর দাম আবার বেড়ে গেছে, তাহলে তাঁর জীবনে নতুন পে-স্কেলের কোনো সুফল নেই; বরং এটি হয়ে উঠবে নতুন দুর্ভোগের কারণ।
তবে এটিও সত্য যে সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য বেতন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতির তুলনায় তাঁদের প্রকৃত আয় কমে গেছে। দক্ষ ও সৎ প্রশাসন গড়ে তুলতে হলে সম্মানজনক বেতন কাঠামো প্রয়োজন। কিন্তু শুধু বেতন বাড়ালেই হবে না; এর সঙ্গে প্রশাসনিক সংস্কার, জবাবদিহিতা ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। জনগণ জানতে চায়—বেতন বাড়ানোর বিনিময়ে সরকারি সেবার মান কতটা বাড়বে? অফিসে হয়রানি, ধীরগতি ও দুর্নীতি কি কমবে?
একই সঙ্গে সরকারকে বেসরকারি খাতের জন্যও সমন্বিত নীতি নিতে হবে। করপোরেট কর যৌক্তিকীকরণ, সহজ ঋণ, উৎপাদন ব্যয় কমানো, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং শ্রমিক-কর্মচারীদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্বিন্যাস ছাড়া এই বৈষম্য কমানো সম্ভব নয়। কারণ একটি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি সরকারি খাত নয়; বরং উৎপাদনশীল বেসরকারি খাত।
এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কঠোর বাজার তদারকি। ব্যবসায়ীদের অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি, সিন্ডিকেট ও মজুতদারির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে নতুন পে-স্কেল সাধারণ মানুষের জন্য আশীর্বাদের বদলে অভিশাপ হয়ে উঠতে পারে। বাজারে কৃত্রিম সংকট ও অযৌক্তিক ভাড়া বৃদ্ধি ঠেকাতে প্রশাসনকে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনমান উন্নয়ন অবশ্যই জরুরি। কিন্তু সেই উন্নয়ন যদি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনকে আরো কঠিন করে তোলে, তাহলে তা কখনোই টেকসই অর্থনৈতিক নীতি হতে পারে না। নতুন পে-স্কেল যেন কেবল একটি শ্রেণির আর্থিক স্বস্তি না হয়ে, বরং সমগ্র অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষার মাধ্যমে সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিত করে—এটাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।














