সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আমরা কি সত্যিই নিরাপদ সমাজ হারিয়ে ফেলেছি?

বিল্লাল হোসেন
  • Update Time : ১১:৩৫:৪৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬
  • / ২৩৯ Time View

একটি ছোট্ট জুতো পড়ে আছে ফ্ল্যাটের সামনে। আরেকটি নেই। সেই দৃশ্য দেখেই একজন মা কিংবা বাবার বুকের ভেতর হঠাৎ যেন বজ্রপাত হয়। অজানা আশঙ্কায় বুক কেঁপে ওঠে। এরপর শুরু হয় পাগলের মতো ছুটোছুটি—একটি ফ্ল্যাট, আরেকটি ফ্ল্যাট, প্রতিটি দরজায় ধাক্কা। “আমার মেয়েকে দেখেছেন?”

সব দরজা খুললেও একটি দরজা বন্ধ থাকে। কেউ সাড়া দেয় না। মানুষ জড়ো হয়। পুলিশ আসে। দরজা ভাঙা হয়। তারপর যে দৃশ্য চোখে পড়ে, তা কোনো সভ্য সমাজের ছবি হতে পারে না। ছোট্ট শিশুটির নিথর দেহ পড়ে আছে রক্তাক্ত মেঝেতে। আর বাথরুমের বালতিতে পড়ে আছে তার বিচ্ছিন্ন মাথা।

এটি শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়; এটি পুরো রাষ্ট্রের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।

রাজধানীর মিরপুরে ছোট্ট রামিসার নির্মম হত্যাকাণ্ড আবারও আমাদের সামনে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে—বাংলাদেশে শিশু, বিশেষ করে মেয়ে শিশুরা কতটা নিরাপদ? কতদিন আমরা এভাবে একের পর এক লাশ দেখব? কতদিন সংবাদ শিরোনামে ছোট্ট শিশুদের ধর্ষণ, হত্যা, নির্যাতন আর নিখোঁজ হওয়ার খবর পড়তে হবে?

সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, এসব ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়। বরং নিয়মিত ঘটতে থাকা এক সামাজিক মহামারিতে পরিণত হয়েছে। কিছুদিন আগেই শিশু ফাহিমাকে প্রতিবেশী একজন মানুষ সিগারেট আনতে পাঠিয়ে একা পেয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করে। পরে হত্যার পর লাশ ব্রিফকেসে লুকিয়ে রাখে। আবার কোথাও দেখা যাচ্ছে, ৯-১০ বছরের শিশুরা এমন সব আচরণ করছে, যা তাদের বয়সের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

এগুলো শুধু অপরাধ নয়; এগুলো সমাজের নৈতিক ভাঙনের ভয়াবহ সংকেত।

আমাদের সমাজে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে এক গভীর সংকট তৈরি হয়েছে। পরিবার, প্রতিবেশী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এমনকি আত্মীয়স্বজন—যেখানে শিশুরা সবচেয়ে বেশি নিরাপদ থাকার কথা, সেখানেই তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছে। বাস্তবতা এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, অনেক বাবা-মা এখন সন্তানকে এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল করতে ভয় পান।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন এই ভয়?

কারণ অপরাধীরা জানে, এই দেশে বিচার দীর্ঘ, দুর্বল এবং অনেক ক্ষেত্রে অনিশ্চিত। বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলেছে। যখন একটি শিশুহত্যার বিচার বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, যখন ধর্ষক রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব খাটিয়ে পার পেয়ে যায়, তখন অপরাধীরা ভয় পাবে কেন?

রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আর শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি সভ্য রাষ্ট্রের মৌলিক কর্তব্য। কিন্তু আমরা কি সেই দায়িত্ব পালন করতে পেরেছি? যদি পারতাম, তাহলে প্রতিনিয়ত এত শিশু কেন নির্মমতার শিকার হতো?

আজ বাংলাদেশের অসংখ্য পরিবার আতঙ্কে বাস করছে। মেয়ে সন্তান স্কুলে গেলে মা উদ্বিগ্ন থাকেন। বাইরে খেলতে গেলে বাবা উৎকণ্ঠায় থাকেন। শিশুরা কার সঙ্গে মিশছে, কী দেখছে, কোথায় যাচ্ছে—সবকিছু নিয়ে পরিবারগুলোকে এখন যুদ্ধ করতে হচ্ছে।

এখানে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বের কথা বললে হবে না। পরিবারকেও সচেতন হতে হবে। সন্তানদের “গুড টাচ” ও “ব্যাড টাচ” সম্পর্কে শেখাতে হবে। এমন সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যাতে শিশু ভয় না পেয়ে সব কথা বাবা-মাকে বলতে পারে। কারণ অনেক শিশু বছরের পর বছর নির্যাতন সহ্য করেও মুখ খুলতে পারে না।

কিন্তু কেবল পরিবার দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রকে আরও কঠোর হতে হবে। শিশু নির্যাতন ও হত্যার মামলাগুলোর দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধীদের রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় নয়, অপরাধকে গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আবাসিক ভবন, কোচিং সেন্টার, মাদ্রাসা—সব জায়গায় শিশু সুরক্ষা নীতিমালা বাধ্যতামূলক করতে হবে।

একটি রাষ্ট্র তখনই ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়, যখন মানুষ নিজের ঘরেও নিরাপত্তা অনুভব করে না। আজ বাংলাদেশের বহু বাবা-মা সেই ভয় নিয়েই বেঁচে আছেন।

লামিসা, ফাহিমা কিংবা নাম না জানা অসংখ্য শিশুর মৃত্যু শুধু পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি মৃত্যু একটি পরিবারের স্বপ্ন হত্যা করে, সমাজের বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং রাষ্ট্রের সক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ জানায়।

আমরা যদি এখনো না জাগি, তাহলে আগামী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। কারণ একটি সমাজের সভ্যতা পরিমাপ করা হয় সে সমাজ তার শিশুদের কতটা নিরাপত্তা দিতে পারে, তার ওপর। আর সেই পরীক্ষায় আমরা বারবার ব্যর্থ হচ্ছি।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

বিল্লাল হোসেন

বিল্লাল হোসেন, একজন প্রজ্ঞাবান পেশাজীবী, যিনি গণিতের ওপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ, ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ হিসেবে একটি সমৃদ্ধ ও বহুমুখী ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন। তার আর্থিক খাতে যাত্রা তাকে নেতৃত্বের ভূমিকায় নিয়ে গেছে, বিশেষ করে সৌদি আরবের আল-রাজি ব্যাংকিং Inc. এবং ব্যাংক-আল-বিলাদে বিদেশী সম্পর্ক ও করেসপন্ডেন্ট মেইন্টেনেন্স অফিসার হিসেবে। প্রথাগত অর্থনীতির গণ্ডির বাইরে, বিল্লাল একজন প্রখ্যাত লেখক ও বিশ্লেষক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালে মননশীল কলাম ও গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করে। তার দক্ষতা বিস্তৃত বিষয় জুড়ে রয়েছে, যেমন অর্থনীতির জটিলতা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, প্রবাসী শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্ট, রেমিটেন্স, রিজার্ভ এবং অন্যান্য সম্পর্কিত দিক। বিল্লাল তার লেখায় একটি অনন্য বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসেন, যা ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে অর্জিত বাস্তব জ্ঞানকে একত্রিত করে একাডেমিক কঠোরতার সাথে। তার প্রবন্ধগুলো শুধুমাত্র জটিল বিষয়গুলির উপর গভীর বোঝাপড়ার প্রতিফলন নয়, বরং পাঠকদের জন্য জ্ঞানপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা তত্ত্ব ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। বিল্লাল হোসেনের অবদান তার প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করে যে, তিনি আমাদের আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বের জটিলতাগুলি উন্মোচন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের একটি বিস্তৃত এবং আরও সূক্ষ্ম বোঝাপড়ার দিকে মূল্যবান অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।

আমরা কি সত্যিই নিরাপদ সমাজ হারিয়ে ফেলেছি?

Update Time : ১১:৩৫:৪৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬

একটি ছোট্ট জুতো পড়ে আছে ফ্ল্যাটের সামনে। আরেকটি নেই। সেই দৃশ্য দেখেই একজন মা কিংবা বাবার বুকের ভেতর হঠাৎ যেন বজ্রপাত হয়। অজানা আশঙ্কায় বুক কেঁপে ওঠে। এরপর শুরু হয় পাগলের মতো ছুটোছুটি—একটি ফ্ল্যাট, আরেকটি ফ্ল্যাট, প্রতিটি দরজায় ধাক্কা। “আমার মেয়েকে দেখেছেন?”

সব দরজা খুললেও একটি দরজা বন্ধ থাকে। কেউ সাড়া দেয় না। মানুষ জড়ো হয়। পুলিশ আসে। দরজা ভাঙা হয়। তারপর যে দৃশ্য চোখে পড়ে, তা কোনো সভ্য সমাজের ছবি হতে পারে না। ছোট্ট শিশুটির নিথর দেহ পড়ে আছে রক্তাক্ত মেঝেতে। আর বাথরুমের বালতিতে পড়ে আছে তার বিচ্ছিন্ন মাথা।

এটি শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়; এটি পুরো রাষ্ট্রের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।

রাজধানীর মিরপুরে ছোট্ট রামিসার নির্মম হত্যাকাণ্ড আবারও আমাদের সামনে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে—বাংলাদেশে শিশু, বিশেষ করে মেয়ে শিশুরা কতটা নিরাপদ? কতদিন আমরা এভাবে একের পর এক লাশ দেখব? কতদিন সংবাদ শিরোনামে ছোট্ট শিশুদের ধর্ষণ, হত্যা, নির্যাতন আর নিখোঁজ হওয়ার খবর পড়তে হবে?

সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, এসব ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়। বরং নিয়মিত ঘটতে থাকা এক সামাজিক মহামারিতে পরিণত হয়েছে। কিছুদিন আগেই শিশু ফাহিমাকে প্রতিবেশী একজন মানুষ সিগারেট আনতে পাঠিয়ে একা পেয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করে। পরে হত্যার পর লাশ ব্রিফকেসে লুকিয়ে রাখে। আবার কোথাও দেখা যাচ্ছে, ৯-১০ বছরের শিশুরা এমন সব আচরণ করছে, যা তাদের বয়সের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

এগুলো শুধু অপরাধ নয়; এগুলো সমাজের নৈতিক ভাঙনের ভয়াবহ সংকেত।

আমাদের সমাজে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে এক গভীর সংকট তৈরি হয়েছে। পরিবার, প্রতিবেশী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এমনকি আত্মীয়স্বজন—যেখানে শিশুরা সবচেয়ে বেশি নিরাপদ থাকার কথা, সেখানেই তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছে। বাস্তবতা এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, অনেক বাবা-মা এখন সন্তানকে এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল করতে ভয় পান।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন এই ভয়?

কারণ অপরাধীরা জানে, এই দেশে বিচার দীর্ঘ, দুর্বল এবং অনেক ক্ষেত্রে অনিশ্চিত। বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলেছে। যখন একটি শিশুহত্যার বিচার বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, যখন ধর্ষক রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব খাটিয়ে পার পেয়ে যায়, তখন অপরাধীরা ভয় পাবে কেন?

রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আর শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি সভ্য রাষ্ট্রের মৌলিক কর্তব্য। কিন্তু আমরা কি সেই দায়িত্ব পালন করতে পেরেছি? যদি পারতাম, তাহলে প্রতিনিয়ত এত শিশু কেন নির্মমতার শিকার হতো?

আজ বাংলাদেশের অসংখ্য পরিবার আতঙ্কে বাস করছে। মেয়ে সন্তান স্কুলে গেলে মা উদ্বিগ্ন থাকেন। বাইরে খেলতে গেলে বাবা উৎকণ্ঠায় থাকেন। শিশুরা কার সঙ্গে মিশছে, কী দেখছে, কোথায় যাচ্ছে—সবকিছু নিয়ে পরিবারগুলোকে এখন যুদ্ধ করতে হচ্ছে।

এখানে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বের কথা বললে হবে না। পরিবারকেও সচেতন হতে হবে। সন্তানদের “গুড টাচ” ও “ব্যাড টাচ” সম্পর্কে শেখাতে হবে। এমন সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যাতে শিশু ভয় না পেয়ে সব কথা বাবা-মাকে বলতে পারে। কারণ অনেক শিশু বছরের পর বছর নির্যাতন সহ্য করেও মুখ খুলতে পারে না।

কিন্তু কেবল পরিবার দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রকে আরও কঠোর হতে হবে। শিশু নির্যাতন ও হত্যার মামলাগুলোর দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধীদের রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় নয়, অপরাধকে গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আবাসিক ভবন, কোচিং সেন্টার, মাদ্রাসা—সব জায়গায় শিশু সুরক্ষা নীতিমালা বাধ্যতামূলক করতে হবে।

একটি রাষ্ট্র তখনই ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়, যখন মানুষ নিজের ঘরেও নিরাপত্তা অনুভব করে না। আজ বাংলাদেশের বহু বাবা-মা সেই ভয় নিয়েই বেঁচে আছেন।

লামিসা, ফাহিমা কিংবা নাম না জানা অসংখ্য শিশুর মৃত্যু শুধু পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি মৃত্যু একটি পরিবারের স্বপ্ন হত্যা করে, সমাজের বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং রাষ্ট্রের সক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ জানায়।

আমরা যদি এখনো না জাগি, তাহলে আগামী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। কারণ একটি সমাজের সভ্যতা পরিমাপ করা হয় সে সমাজ তার শিশুদের কতটা নিরাপত্তা দিতে পারে, তার ওপর। আর সেই পরীক্ষায় আমরা বারবার ব্যর্থ হচ্ছি।