Advertisement
সময়: রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আল জাজিরা এক্সপ্লেইনার,সীমান্তে মানুষ মারতে কুমির ও বিষধর সাপ ছাড়ছে ভারত  

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৫:৪২:১৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
  • / ২২৪ Time View

কাঁটাতারের বেড়া দিয়েও শেষ রক্ষা হচ্ছে না দেখে এবার বাংলাদেশের সাথে সীমানায় মানুষ ঠেকাতে হিংস্র কুমির আর বিষধর সাপ ছাড়ার এক ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা মেতেছে ভারত। দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের এই অদ্ভুত কাপালিক ভাবনা নিয়ে ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক মহলে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়েছে।

ভারতের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদীমাতৃক সীমানাগুলোতে যেখানে ভৌগোলিক কারণে বেড়া দেয়া অসম্ভব, সেখানে প্রাকৃতিক ‘দেয়াল’ হিসেবে এসব সরীসৃপ মোতায়েন করার ছক কষছে নয়াদিল্লি।

গত ২৬ মার্চের এক অভ্যন্তরীণ বার্তায় বিএসএফ সদর দফতর থেকে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেন নদীপথের ‘দুর্বল’ পয়েন্টগুলোতে বিষধর সাপ ও কুমির ছেড়ে দেয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হয়। ভারতের এমন উদ্যোগকে বিশ্লেষক ও অধিকারকর্মীরা দেখছেন ভয়াবহ অমানবিক এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করার এক আত্মঘাতী প্রচেষ্টা হিসেবে।

তবে এই পরিকল্পনার শেকড় আরো গভীরে, যা মূলত ভারতের ভেতরের মুসলিম বিদ্বেষী রাজনীতি আর সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের সাথে সরাসরি যুক্ত।

বিএসএফের গোপন নির্দেশ ও বাস্তবতা

আল জাজিরার বিশ্লেষক ইয়াশরাজ শর্মা জানাচ্ছেন, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় ও মিজোরামজুড়ে বিস্তৃত প্রায় ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সীমান্তের অন্তত ১ হাজার কিলোমিটার এলাকা এখনো দুর্গম পাহাড় ও নদী হওয়ার কারণে অরক্ষিত।

বিএসএফের অভ্যন্তরীণ নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ‘রিভারাইন গ্যাপ’ বা নদীপথের ফাঁকফোকর দিয়ে চলাচল বন্ধ করতে সরীসৃপ ব্যবহারের সম্ভাব্যতা যাচাই করে দ্রুত রিপোর্ট দিতে হবে। আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যম ‘নর্থইস্ট নিউজ’ এই খবর প্রথম সামনে আনে। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্বীকার করেছে যে জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ আর স্থানীয়দের প্রতিবাদের কারণে অনেক জায়গায় বেড়া দেয়া যাচ্ছে না। আর সেই ব্যর্থতা ঢাকতেই এখন নিরীহ মানুষের বিরুদ্ধে বন্যপ্রাণী লেলিয়ে দেয়ার মতো নৃশংস পথ বেছে নিচ্ছে ভারতের সীমান্ত রক্ষীরা।

সাম্পদ্রায়িক অ্যাজেন্ডা ও নাগরিকত্ব সঙ্কট

ভারতের হিন্দুত্ববাদী সরকার দীর্ঘদিন ধরেই প্রচার করছে যে তথাকথিত ‘অবৈধ অভিবাসী’রা ভারতের জনতাত্ত্বিক কাঠামো বদলে দিচ্ছে।

মানবাধিকার কর্মী হর্ষ মন্দার আল জাজিরাকে বলেন, ভারত সরকার তাদের সাংবিধানিক নীতি ও আন্তর্জাতিক আইনকে তোয়াক্কা না করে অত্যন্ত নিষ্ঠুর পথ বেছে নিচ্ছে। তার মতে, কুমির বা সাপের এই হুমকি মূলত ভারতের বাঙালি মুসলিমদের মনে এক ধরনের চিরস্থায়ী আতঙ্ক বজায় রাখার কৌশল, যাতে তারা সব সময় নাগরিকত্ব হারানোর ভয়ে কুঁকড়ে থাকে। বিশেষ করে আসামের ‘ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল’ বা বিদেশী শনাক্তকরণ আদালতের মাধ্যমে নথিপত্র না থাকার অজুহাতে যেভাবে সাধারণ মানুষকে ‘বিদেশী’ বানানো হচ্ছে, এই নতুন পরিকল্পনা তারই এক ভয়ঙ্কর বিস্তার।

বিএসএফের বিরুদ্ধে মাঝেমধ্যেই বন্দুকের মুখে ভারতীয় মুসলিমদের জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার গুরুতর অভিযোগও উঠছে।

পরিবেশ ও সাধারণ মানুষের ঝুঁকি

এই অমানবিক কৌশলের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছেন বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা। ‘ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়া’র প্রধান রথীন বর্মন বলছেন, যেসব নদী বা জলাভূমিতে কুমির ছাড়ার কথা বলা হচ্ছে, সেখানে এসব প্রাণীর প্রাকৃতিক আবাস নেই। ফলে প্রতিকূল পরিবেশে এগুলো হয়তো দ্রুত মারা যাবে। উল্টা বর্ষার সময় বা বন্যার পানিতে এই বিষধর সাপ বা কুমির জনপদে ঢুকে পড়বে। এতে দু’দেশের সাধারণ মৎস্যজীবী বা সীমান্তবর্তী জনপদের মানুষের জীবন ভয়বহ ঝুঁকিতে পড়বে।

গবেষক অংশুমান চৌধুরী একে ‘উদ্ভট’ আখ্যা দিয়ে বলেন, একবার সাপ বা কুমির পানিতে ছেড়ে দিলে তারা তো আর পাসপোর্ট দেখে কামড়াবে না; তারা বুঝবে না কে ভারতীয় আর কে বাংলাদেশী। প্রকৃতিকে এভাবে মানুষের বিরুদ্ধে মারণাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করাকে আধুনিক বিশ্বের এক নজিরবিহীন বর্বরতা হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড়

সীমান্তে দেয়াল বা কাঁটাতারের বদলে হিংস্র প্রাণী ব্যবহারের এমন আধুনিক নজির বিশ্বে আর নেই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একসময় সীমান্তে কুমির ভর্তি খালের কথা বলে উপহাসের পাত্র হয়েছিলেন, তবে ভারত এখন সেই অমানবিক কল্পনাকেই বাস্তবে রূপ দিতে মরিয়া। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার দুর্গম পরিবেশের কারণে একটি ডিটেনশন সেন্টারকে ‘অ্যালগেটর অ্যালকাট্রাজ’ বলা হয়।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই ডিটেনশন সেন্টারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারতও এখন একই পথে হাঁটছে। মানুষের জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করে এমন সরীসৃপ মোতায়েন মূলত আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। এটি কেবল একটি সীমান্ত নীতি নয়, বরং সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে ভারতের রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুরতার এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।

সূত্র : আল জাজিরা

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আল জাজিরা এক্সপ্লেইনার,সীমান্তে মানুষ মারতে কুমির ও বিষধর সাপ ছাড়ছে ভারত  

Update Time : ০৫:৪২:১৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

কাঁটাতারের বেড়া দিয়েও শেষ রক্ষা হচ্ছে না দেখে এবার বাংলাদেশের সাথে সীমানায় মানুষ ঠেকাতে হিংস্র কুমির আর বিষধর সাপ ছাড়ার এক ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা মেতেছে ভারত। দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের এই অদ্ভুত কাপালিক ভাবনা নিয়ে ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক মহলে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়েছে।

ভারতের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদীমাতৃক সীমানাগুলোতে যেখানে ভৌগোলিক কারণে বেড়া দেয়া অসম্ভব, সেখানে প্রাকৃতিক ‘দেয়াল’ হিসেবে এসব সরীসৃপ মোতায়েন করার ছক কষছে নয়াদিল্লি।

গত ২৬ মার্চের এক অভ্যন্তরীণ বার্তায় বিএসএফ সদর দফতর থেকে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেন নদীপথের ‘দুর্বল’ পয়েন্টগুলোতে বিষধর সাপ ও কুমির ছেড়ে দেয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হয়। ভারতের এমন উদ্যোগকে বিশ্লেষক ও অধিকারকর্মীরা দেখছেন ভয়াবহ অমানবিক এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করার এক আত্মঘাতী প্রচেষ্টা হিসেবে।

তবে এই পরিকল্পনার শেকড় আরো গভীরে, যা মূলত ভারতের ভেতরের মুসলিম বিদ্বেষী রাজনীতি আর সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের সাথে সরাসরি যুক্ত।

বিএসএফের গোপন নির্দেশ ও বাস্তবতা

আল জাজিরার বিশ্লেষক ইয়াশরাজ শর্মা জানাচ্ছেন, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় ও মিজোরামজুড়ে বিস্তৃত প্রায় ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সীমান্তের অন্তত ১ হাজার কিলোমিটার এলাকা এখনো দুর্গম পাহাড় ও নদী হওয়ার কারণে অরক্ষিত।

বিএসএফের অভ্যন্তরীণ নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ‘রিভারাইন গ্যাপ’ বা নদীপথের ফাঁকফোকর দিয়ে চলাচল বন্ধ করতে সরীসৃপ ব্যবহারের সম্ভাব্যতা যাচাই করে দ্রুত রিপোর্ট দিতে হবে। আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যম ‘নর্থইস্ট নিউজ’ এই খবর প্রথম সামনে আনে। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্বীকার করেছে যে জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ আর স্থানীয়দের প্রতিবাদের কারণে অনেক জায়গায় বেড়া দেয়া যাচ্ছে না। আর সেই ব্যর্থতা ঢাকতেই এখন নিরীহ মানুষের বিরুদ্ধে বন্যপ্রাণী লেলিয়ে দেয়ার মতো নৃশংস পথ বেছে নিচ্ছে ভারতের সীমান্ত রক্ষীরা।

সাম্পদ্রায়িক অ্যাজেন্ডা ও নাগরিকত্ব সঙ্কট

ভারতের হিন্দুত্ববাদী সরকার দীর্ঘদিন ধরেই প্রচার করছে যে তথাকথিত ‘অবৈধ অভিবাসী’রা ভারতের জনতাত্ত্বিক কাঠামো বদলে দিচ্ছে।

মানবাধিকার কর্মী হর্ষ মন্দার আল জাজিরাকে বলেন, ভারত সরকার তাদের সাংবিধানিক নীতি ও আন্তর্জাতিক আইনকে তোয়াক্কা না করে অত্যন্ত নিষ্ঠুর পথ বেছে নিচ্ছে। তার মতে, কুমির বা সাপের এই হুমকি মূলত ভারতের বাঙালি মুসলিমদের মনে এক ধরনের চিরস্থায়ী আতঙ্ক বজায় রাখার কৌশল, যাতে তারা সব সময় নাগরিকত্ব হারানোর ভয়ে কুঁকড়ে থাকে। বিশেষ করে আসামের ‘ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল’ বা বিদেশী শনাক্তকরণ আদালতের মাধ্যমে নথিপত্র না থাকার অজুহাতে যেভাবে সাধারণ মানুষকে ‘বিদেশী’ বানানো হচ্ছে, এই নতুন পরিকল্পনা তারই এক ভয়ঙ্কর বিস্তার।

বিএসএফের বিরুদ্ধে মাঝেমধ্যেই বন্দুকের মুখে ভারতীয় মুসলিমদের জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার গুরুতর অভিযোগও উঠছে।

পরিবেশ ও সাধারণ মানুষের ঝুঁকি

এই অমানবিক কৌশলের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছেন বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা। ‘ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়া’র প্রধান রথীন বর্মন বলছেন, যেসব নদী বা জলাভূমিতে কুমির ছাড়ার কথা বলা হচ্ছে, সেখানে এসব প্রাণীর প্রাকৃতিক আবাস নেই। ফলে প্রতিকূল পরিবেশে এগুলো হয়তো দ্রুত মারা যাবে। উল্টা বর্ষার সময় বা বন্যার পানিতে এই বিষধর সাপ বা কুমির জনপদে ঢুকে পড়বে। এতে দু’দেশের সাধারণ মৎস্যজীবী বা সীমান্তবর্তী জনপদের মানুষের জীবন ভয়বহ ঝুঁকিতে পড়বে।

গবেষক অংশুমান চৌধুরী একে ‘উদ্ভট’ আখ্যা দিয়ে বলেন, একবার সাপ বা কুমির পানিতে ছেড়ে দিলে তারা তো আর পাসপোর্ট দেখে কামড়াবে না; তারা বুঝবে না কে ভারতীয় আর কে বাংলাদেশী। প্রকৃতিকে এভাবে মানুষের বিরুদ্ধে মারণাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করাকে আধুনিক বিশ্বের এক নজিরবিহীন বর্বরতা হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড়

সীমান্তে দেয়াল বা কাঁটাতারের বদলে হিংস্র প্রাণী ব্যবহারের এমন আধুনিক নজির বিশ্বে আর নেই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একসময় সীমান্তে কুমির ভর্তি খালের কথা বলে উপহাসের পাত্র হয়েছিলেন, তবে ভারত এখন সেই অমানবিক কল্পনাকেই বাস্তবে রূপ দিতে মরিয়া। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার দুর্গম পরিবেশের কারণে একটি ডিটেনশন সেন্টারকে ‘অ্যালগেটর অ্যালকাট্রাজ’ বলা হয়।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই ডিটেনশন সেন্টারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারতও এখন একই পথে হাঁটছে। মানুষের জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করে এমন সরীসৃপ মোতায়েন মূলত আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। এটি কেবল একটি সীমান্ত নীতি নয়, বরং সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে ভারতের রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুরতার এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।

সূত্র : আল জাজিরা