সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তেলের দোহাই, বাজারে আগুন—তবে দায় নেবে কে?

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১১:০৭:১৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬
  • / ১৫২ Time View

দেশের বাজার আজ এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের মধ্যে দাঁড়িয়ে। একদিকে সরকার বলছে—তেলের কোনো সংকট নেই, সরবরাহ স্বাভাবিক; অন্যদিকে বাস্তবতা হলো, বাজারে নিত্যপণ্যের দাম যেন লাগামহীনভাবে বেড়েই চলেছে। প্রশ্নটা তাই সরল—যদি তেলের সমস্যা না থাকে, তবে সবকিছুর দাম বাড়ছে কেন?

বর্তমান বাজার পরিস্থিতি দেখলে বোঝা যায়, সাধারণ মানুষের জীবন কতটা চাপে রয়েছে। অধিকাংশ সবজির দাম ৮০ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। যে সবজি ভরা মৌসুমে ৪০-৫০ টাকায় পাওয়ার কথা, তা এখন দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে। নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য সপ্তাহের বাজার করাই হয়ে উঠেছে এক ধরনের সংগ্রাম। ৩০০-৫০০ টাকায় যেখানে একসময় সপ্তাহের সবজি কেনা যেত, এখন তা দিয়ে দু-তিন দিনের চাহিদাও মেটানো কঠিন।

বাজারের বিক্রেতারা বলছেন, জ্বালানি খরচ বেড়েছে, পরিবহন ভাড়া বেড়েছে, ফলে পণ্যের দাম বাড়ছে। কিন্তু এখানেই মূল প্রশ্ন—যদি সরকার দাবি করে তেলের কোনো সমস্যা নেই, তাহলে পরিবহন ব্যয় বাড়ছে কেন? এই অসামঞ্জস্যই ইঙ্গিত দেয়, বাজারে কোথাও না কোথাও নিয়ন্ত্রণহীনতা রয়েছে।

বাস্তবতা হলো, আমাদের বাজার ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরেই একটি অদৃশ্য শক্তি কাজ করে—যাকে সাধারণভাবে বলা হয় ‘সিন্ডিকেট’। এই সিন্ডিকেটই পণ্যের সরবরাহ, মজুত এবং মূল্য নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করে। ফলে উৎপাদন পর্যায়ে দাম কম থাকলেও ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।

সরকারের পক্ষ থেকে প্রায়ই বলা হয়—বাজার মনিটরিং জোরদার করা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই মনিটরিং কি বাস্তবেই কার্যকর? দেশের প্রতিটি জেলা, প্রতিটি বাজার কি এর আওতায় আসছে? নাকি কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকছে এই তদারকি?

যদি বাজার মনিটরিং কার্যকর হতো, তাহলে ভরা মৌসুমে সবজির দাম এভাবে বাড়তে পারত না। যদি সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক থাকত, তাহলে কৃষক ন্যায্যমূল্য পেতেন এবং ভোক্তাও স্বস্তিতে কিনতে পারতেন। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি—কৃষক কম দামে বিক্রি করছে, আর ভোক্তা বেশি দামে কিনছে। মাঝখানে লাভ করছে একটি সীমিত গোষ্ঠী।

অন্যদিকে কিছু পণ্যের দাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল—যেমন ব্রয়লার মুরগি বা ডিম। এতে বোঝা যায়, সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকলে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই ব্যবস্থাপনা সব খাতে কেন নেই?

এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব শুধু অর্থনীতিতে নয়, সমাজেও পড়বে। মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়বে, আস্থা কমবে। কারণ, বাজারে গিয়ে যখন মানুষ প্রতিদিন নতুন করে ধাক্কা খায়, তখন তার কাছে কোনো সরকারি আশ্বাসই আর বিশ্বাসযোগ্য থাকে না।

অতএব, এখন সময় কথার নয়—কাজের। জরুরি ভিত্তিতে বাজার মনিটরিং জোরদার করতে হবে। শুধু রাজধানী নয়, দেশের প্রতিটি জেলায় প্রশাসনকে সক্রিয় হতে হবে। সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে, সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক করতে হবে, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—দোষীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে।

সরকার যদি সত্যিই মনে করে তেলের কোনো সমস্যা নেই, তাহলে সেই বক্তব্যের প্রতিফলন বাজারেও দেখতে হবে। অন্যথায় জনগণ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলবে—সমস্যা কোথায়? তেলে, নাকি ব্যবস্থাপনায়?

এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এখন সরকারের দায়িত্ব।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

তেলের দোহাই, বাজারে আগুন—তবে দায় নেবে কে?

Update Time : ১১:০৭:১৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬

দেশের বাজার আজ এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের মধ্যে দাঁড়িয়ে। একদিকে সরকার বলছে—তেলের কোনো সংকট নেই, সরবরাহ স্বাভাবিক; অন্যদিকে বাস্তবতা হলো, বাজারে নিত্যপণ্যের দাম যেন লাগামহীনভাবে বেড়েই চলেছে। প্রশ্নটা তাই সরল—যদি তেলের সমস্যা না থাকে, তবে সবকিছুর দাম বাড়ছে কেন?

বর্তমান বাজার পরিস্থিতি দেখলে বোঝা যায়, সাধারণ মানুষের জীবন কতটা চাপে রয়েছে। অধিকাংশ সবজির দাম ৮০ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। যে সবজি ভরা মৌসুমে ৪০-৫০ টাকায় পাওয়ার কথা, তা এখন দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে। নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য সপ্তাহের বাজার করাই হয়ে উঠেছে এক ধরনের সংগ্রাম। ৩০০-৫০০ টাকায় যেখানে একসময় সপ্তাহের সবজি কেনা যেত, এখন তা দিয়ে দু-তিন দিনের চাহিদাও মেটানো কঠিন।

বাজারের বিক্রেতারা বলছেন, জ্বালানি খরচ বেড়েছে, পরিবহন ভাড়া বেড়েছে, ফলে পণ্যের দাম বাড়ছে। কিন্তু এখানেই মূল প্রশ্ন—যদি সরকার দাবি করে তেলের কোনো সমস্যা নেই, তাহলে পরিবহন ব্যয় বাড়ছে কেন? এই অসামঞ্জস্যই ইঙ্গিত দেয়, বাজারে কোথাও না কোথাও নিয়ন্ত্রণহীনতা রয়েছে।

বাস্তবতা হলো, আমাদের বাজার ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরেই একটি অদৃশ্য শক্তি কাজ করে—যাকে সাধারণভাবে বলা হয় ‘সিন্ডিকেট’। এই সিন্ডিকেটই পণ্যের সরবরাহ, মজুত এবং মূল্য নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করে। ফলে উৎপাদন পর্যায়ে দাম কম থাকলেও ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।

সরকারের পক্ষ থেকে প্রায়ই বলা হয়—বাজার মনিটরিং জোরদার করা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই মনিটরিং কি বাস্তবেই কার্যকর? দেশের প্রতিটি জেলা, প্রতিটি বাজার কি এর আওতায় আসছে? নাকি কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকছে এই তদারকি?

যদি বাজার মনিটরিং কার্যকর হতো, তাহলে ভরা মৌসুমে সবজির দাম এভাবে বাড়তে পারত না। যদি সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক থাকত, তাহলে কৃষক ন্যায্যমূল্য পেতেন এবং ভোক্তাও স্বস্তিতে কিনতে পারতেন। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি—কৃষক কম দামে বিক্রি করছে, আর ভোক্তা বেশি দামে কিনছে। মাঝখানে লাভ করছে একটি সীমিত গোষ্ঠী।

অন্যদিকে কিছু পণ্যের দাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল—যেমন ব্রয়লার মুরগি বা ডিম। এতে বোঝা যায়, সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকলে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই ব্যবস্থাপনা সব খাতে কেন নেই?

এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব শুধু অর্থনীতিতে নয়, সমাজেও পড়বে। মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়বে, আস্থা কমবে। কারণ, বাজারে গিয়ে যখন মানুষ প্রতিদিন নতুন করে ধাক্কা খায়, তখন তার কাছে কোনো সরকারি আশ্বাসই আর বিশ্বাসযোগ্য থাকে না।

অতএব, এখন সময় কথার নয়—কাজের। জরুরি ভিত্তিতে বাজার মনিটরিং জোরদার করতে হবে। শুধু রাজধানী নয়, দেশের প্রতিটি জেলায় প্রশাসনকে সক্রিয় হতে হবে। সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে, সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক করতে হবে, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—দোষীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে।

সরকার যদি সত্যিই মনে করে তেলের কোনো সমস্যা নেই, তাহলে সেই বক্তব্যের প্রতিফলন বাজারেও দেখতে হবে। অন্যথায় জনগণ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলবে—সমস্যা কোথায়? তেলে, নাকি ব্যবস্থাপনায়?

এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এখন সরকারের দায়িত্ব।