দ্য ইনডিপেনডেন্টের প্রতিবেদন বিশ্বে প্রথম ‘তেল-শূন্য’ দেশের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ
- Update Time : ১১:৫৫:৩৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬
- / ২১৩ Time View

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাব ধীরে ধীরে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। ইরানকে ঘিরে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সংঘাত টানা ৩৩ দিনে গড়ানোর পর পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। এই যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিশ্বব্যাপী তেলের সরবরাহে, যার ফলে দাম পৌঁছেছে রেকর্ড উচ্চতায়। আর এই সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার হতে পারে আমদানিনির্ভর দেশগুলো—যার মধ্যে বাংলাদেশ এখন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম “দ্য ইনডিপেনডেন্ট”-এর এক প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, চলমান এই যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম ‘তেল-শূন্য’ দেশে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রায় ১৭ কোটি মানুষের এই দেশে মোট জ্বালানির প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানির ওপর নির্ভরশীল—যা সংকটের সময় দেশটিকে অত্যন্ত দুর্বল অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে।
এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে জ্বালানির ঘাটতির বাস্তব চিত্র ফুটে উঠতে শুরু করেছে। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় মোটরসাইকেল চালক ও পরিবহন শ্রমিকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে সীমিত পরিমাণ তেল সংগ্রহ করতে দেখা যাচ্ছে। অনেকেই আবার খালি হাতে ফিরছেন, কারণ পাম্পেই জ্বালানি ফুরিয়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে সরা

সরি জনজীবনে—কমে গেছে যানবাহনের সংখ্যা, ব্যাহত হচ্ছে দৈনন্দিন কার্যক্রম।
এই সংকটের অন্যতম বড় কারণ হলো হরমুজ প্রণালি নিয়ে অনিশ্চয়তা। পারস্য উপসাগর থেকে ভারত মহাসাগরে সংযোগ স্থাপনকারী এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে এশিয়ার প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়। যুদ্ধের কারণে এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ পুরোপুরি বিপর্যস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার জ্বালানি রেশনিংয়ের মতো কঠোর পদক্ষেপ বিবেচনা করছে। ডিজেল বিক্রিতে নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের নির্দেশনা, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার চিন্তাও করা হচ্ছে। যদিও ঈদুল ফিতরের সময় সাময়িক শিথিলতা দেওয়া হয়েছিল, তবুও সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক রয়ে গেছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশের একমাত্র পূর্বাঞ্চলীয় শোধনাগার ‘ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড’-এ অপরিশোধিত তেলের মজুত মাত্র দুই সপ্তাহের চাহিদা মেটানোর মতো রয়েছে। অন্যদিকে ডিজেলের মজুত নেমে এসেছে বিপজ্জনক পর্যায়ে—মার্চের শুরুতে যা ছিল মাত্র ৯ দিনের চাহিদা পূরণের সমান। এই তথ্যই বর্তমান সংকটের গভীরতা স্পষ্ট করে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির চেষ্টা চালাচ্ছে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, আজারবাইজানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। পাশাপাশি রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনুরোধও জানানো হয়েছে।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো দাবি করা হচ্ছে—দেশে কোনো জ্বালানি সংকট নেই। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন বার্তাই দিচ্ছে। দীর্ঘ লাইন, খালি পাম্প এবং বিপর্যস্ত পরিবহন ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে সংকটের যে চিত্র ফুটে উঠছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
এই পরিস্থিতি শুধু একটি জ্বালানি সংকট নয়; এটি অর্থনীতি, শিক্ষা, পরিবহন ও সামগ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য এক বড় সতর্কবার্তা। এখন প্রয়োজন দ্রুত, কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ—নয়তো সামনে অপেক্ষা করছে আরও গভীর সংকট।













