মন্ত্রীর বক্তব্য সরকারের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক
- Update Time : ০৩:১৭:০৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / ৩০৫ Time View

রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সুশাসন, আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন ও দুর্নীতি দমনের অঙ্গীকারের কথা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একাধিকবার স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। এই প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম পরিবহন খাতে আদায়কৃত অর্থকে ‘সমঝোতার ভিত্তিতে লেনদেন’ বলে উল্লেখ করায় নীতিগত প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে যে অর্থ আদায়কে সাধারণ মানুষ ‘চাঁদাবাজি’ হিসেবে চিহ্নিত করে আসছেন, সেটিকে ভিন্ন ভাষায় ব্যাখ্যা করা হলে সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে।
এক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী দাবি করেন, পরিবহন খাতে যে অর্থ সংগ্রহ করা হয় তা জোরপূর্বক নয়; বরং পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে নেওয়া হয়। তাই এটিকে চাঁদা বলা ঠিক নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—যদি কোনো অর্থ নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর বাইরে, অস্বচ্ছ পদ্ধতিতে এবং নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে আদায় হয়, তবে সেটিকে কীভাবে বৈধ বলা যায়? বিশেষ করে যখন মন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেন যে শ্রমিক সংগঠনে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব থাকে, তখন ‘সমঝোতা’ শব্দটি প্রকৃত অর্থেই কতটা স্বেচ্ছাসম্মত—তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।
বাংলাদেশের সড়ক পরিবহনব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা ও প্রাণহানির জন্য আলোচিত। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে প্রতিদিন গড়ে দুই ডজনের বেশি মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান, যাঁদের বড় অংশই কর্মক্ষম তরুণ। এই বাস্তবতায় ২০২৪ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর এক গবেষণায় উঠে আসে, ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস ও মিনিবাস থেকে বছরে এক হাজার কোটিরও বেশি টাকা অনানুষ্ঠানিকভাবে আদায় হয়। এর বাইরে ট্রাক ও পণ্যবাহী যান থেকেও বিপুল অর্থ নেওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির ঘনিষ্ঠ পরিবহনমালিক ও শ্রমিক নেতাদের প্রভাব বিস্তার, কিছু অসাধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সদস্য এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এই ব্যবস্থা টিকে আছে। ফলে সড়কে বিশৃঙ্খলা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার ফল। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ যাত্রী, চালক-সহকারী এবং পুরো অর্থনীতি।
চাঁদা বা ‘কল্যাণ তহবিল’—যে নামেই ডাকা হোক, এই অতিরিক্ত অর্থের বোঝা শেষ পর্যন্ত জনগণের ঘাড়েই পড়ে। পরিবহন ভাড়া বাড়ে, পণ্যের দাম বাড়ে, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায়। অথচ প্রকৃত শ্রমিক কল্যাণ বলতে যা বোঝায়—নিয়মিত নিয়োগপত্র, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, মাসিক বেতন ও সামাজিক সুরক্ষা—তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অগ্রগতি সীমিত।
এ অবস্থায় সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—পরিবহন খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা এবং অনিয়মের শিকড় উপড়ে ফেলা। শুধু ভাষাগত ব্যাখ্যা বদলে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন কঠোর বার্তা, স্বচ্ছ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং জবাবদিহিমূলক কাঠামো। সড়ক নিরাপত্তা ও জনস্বার্থ রক্ষায় দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপই হতে পারে সরকারের প্রতি আস্থা পুনর্গঠনের প্রথম শর্ত।














