নির্বাচনী প্রচারে কি সত্যিই উপেক্ষিত হচ্ছে দেশের মৌলিক ইস্যু?
- Update Time : ০৩:৩৫:৫৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / ১২৭ Time View

বাংলাদেশে নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক দলের প্রচার এখন তুঙ্গে। একে অপরকে আক্রমণ করা, সমালোচনা করা এবং অতীতের ঘটনার পুনরুক্তি করে প্রার্থীরা তাদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে। তবে নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রধান দুটি দলের নির্বাচনী প্রচারের অন্তত অর্ধেক সময় অতীত নিয়ে তর্কে ব্যয় হচ্ছে। এক দল অন্য দলকে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করছে, ‘৭১ এর ভূমিকাকে সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু বানাচ্ছে। অন্য দল দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও অনিয়মের অভিযোগ তুলে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করছে। ফলে নির্বাচনী প্রচার পুরনো বৃত্তে বন্দি, যেখানে নতুন বাস্তবতা এবং দেশের ভবিষ্যত পরিকল্পনার কোনো জায়গা নেই।
নারীর অধিকার, বেকারত্ব, অবকাঠামো উন্নয়ন, দুর্নীতিমুক্ত দেশ গঠনের প্রতিশ্রুতি—এসব ইস্যুও নির্বাচনী প্রচারে আলোচিত হচ্ছে। তবে এসব প্রতিশ্রুতি আগের নির্বাচনগুলোতেও প্রায় একইভাবে শুনেছি। নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের আকাঙ্ক্ষা থাকলেও নির্বাচনী প্রচারে নতুনত্ব নেই। জনগণ জানতে চায় দেশের মৌলিক সমস্যা সমাধানের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা কী, কিন্তু তা এখনও রাজনৈতিক দলের আশ্বাসে নেই।
অর্থনীতি এবং কর্মসংস্থান
নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলা। প্রধান দুটি দলই কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। বিএনপি বাড়তি ফ্যামিলি কার্ডের ওপর জোর দিচ্ছে, আর জামায়াত তা সমালোচনা করছে। কিন্তু কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন অর্থনৈতিক শক্ত ভিত্তি। বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রায় ৯৪% কর্মসংস্থান আসে বেসরকারি খাত থেকে। বর্তমানে বেসরকারি খাত সংকটাপন্ন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্প কারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিরাপত্তাহীনতায়, মিথ্যা মামলা, চাঁদাবাজি ও দোসর বানানোর আতঙ্কে বন্ধ হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা ‘অপেক্ষা করো-দেখো’ নীতি অনুসরণ করছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ছাড়া এই সংকট দূর করা সম্ভব নয়।
বৈদেশিক নীতি
বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতি নির্বাচনের পর নতুন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। গত ১৮ মাসে ভিসা সীমাবদ্ধতা, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ব্যর্থতা ও অর্থনৈতিক কূটনীতির পরিকল্পনার অভাব দেশের কূটনৈতিক মর্যাদাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। নতুন সরকার কিভাবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখবে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কী পদক্ষেপ নেবে, বিদেশি ভিসা নীতিতে পরিবর্তন আনবে, জনশক্তি রপ্তানির কৌশল কী—এসব মৌলিক প্রশ্ন নির্বাচনী প্রচারে উপেক্ষিত।
সামাজিক ও নিরাপত্তা বিষয়ক চ্যালেঞ্জ
নতুন সরকারকে মব সন্ত্রাস বন্ধ করা, শিক্ষাঙ্গনে শান্তি ফেরানো, বিদেশি কোম্পানির হাতে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর না হস্তান্তর করা, অন্তর্বর্তী সরকারের গোপন ও প্রকাশ্য চুক্তি পুনঃমূল্যায়ন করা—এসব বিষয়ে জনগণ সুস্পষ্ট পরিকল্পনা জানতে চায়। কিন্তু এই মৌলিক ইস্যুগুলোও নির্বাচনী প্রচারে রাজনৈতিক দলের আলোচনার বাইরে।
নির্বাচনী প্রচার এখন মূলত অতীতের বিতর্ক ও অপ্রচলিত ইস্যুর ঘেরাটোপে বন্দি। তবে বাংলাদেশের জনগণ নতুন রাজনীতি, নতুন দিকনির্দেশনা এবং দেশের মৌলিক সমস্যা সমাধানের স্পষ্ট পরিকল্পনা চাইছে। অর্থনীতি, বৈদেশিক নীতি, নিরাপত্তা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার—এই মৌলিক ইস্যুগুলোকে এভাবে উপেক্ষা করা দেশের ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতিকর। রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সময় এসেছে প্রতিশ্রুতির সীমা ছাড়িয়ে বাস্তব, সুস্পষ্ট এবং ফলপ্রসূ পরিকল্পনা উপস্থাপনের।













