অর্ধ শাবানের রজনী:আমাদের করণীয়
- Update Time : ০৫:১৩:৪১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / ১৫৯ Time View

পবিত্র লাইলাতুল বারাআত আমাদের সামনে উপস্থিত। অনেক দেশে এ রাতটি শবেবরাত নামেও পরিচিত। ‘শব’ শব্দটি ফারসি, যার অর্থ রাত; আর ‘বরাআত’ আরবি শব্দ, যার অর্থ মুক্তি, সৌভাগ্য, ক্ষমা ও বণ্টন। হাদিস ও দ্বীনি গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হয়েছে—এই রাতে আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের জন্য পরবর্তী বছরের রিজিক, হায়াত ও তাকদিরের নানা বিষয় নির্ধারণ করেন। তাই এ রাতের ফজিলত অপরিসীম।
হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে এসেছে—এক রাতে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে তাঁর শয্যায় না পেয়ে খুঁজতে থাকেন এবং দেখতে পান তিনি সিজদারত। পরে নবীজি (সা.) বলেন, “আজ হলো শাবান মাসের মধ্যরাত—লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান।” অর্থাৎ শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত ১৫ তারিখের রাতই হলো লাইলাতুল বারাআত। এ রাতকে ক্ষমা ও মাগফিরাতের রাত বলা হয়েছে। তবে হাদিসে সতর্ক করা হয়েছে—কিছু শ্রেণির মানুষ এই রাতেও ক্ষমা থেকে বঞ্চিত থাকে; যেমন নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি, মদ্যপায়ী, ব্যভিচারে লিপ্ত, পিতা-মাতার অবাধ্য, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী, হিংসা ও বিদ্বেষ পোষণকারী এবং দীর্ঘদিন কথা বন্ধ রাখা ব্যক্তি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) শুধু এই রাত নয়, পুরো শাবান মাসকেই বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পালন করতেন। তিনি এ মাসে বেশি বেশি নফল রোজা রাখতেন, জিকির-আজকার ও নফল ইবাদতে মনোনিবেশ করতেন। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান—এই মাসে বান্দাদের আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়, আর তিনি চান তাঁর আমল রোজাদার অবস্থায় পেশ হোক। শাবানের রোজাকে তিনি রমজানের ফরজ সিয়ামের প্রস্তুতি হিসেবেও উল্লেখ করেছেন।
রোজা মানুষের সার্বক্ষণিক মন ও আচরণকে আল্লাহমুখী করে। সাহরি থেকে ইফতার পর্যন্ত একজন রোজাদার আল্লাহর স্মরণে থাকে। তাই শাবান মাস ও বিশেষ করে শবে বরাতে আমাদের উচিত কিয়ামুল লাইল, নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, দরুদ ও তাসবিহে সময় দেওয়া। কুরআনে নির্দেশ এসেছে—“ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করো।” কিন্তু আজ ইবাদতের আকার আছে, আত্মা নেই—এটাই আমাদের ব্যর্থতার মূল কারণ।
আল্লাহ তায়ালা কুরআনে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—“তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।” তবে হাদিসে এসেছে—হারাম উপার্জন ও হারাম ভোগে লিপ্ত থেকে করা দোয়া কবুল হয় না। সফলতা তারই, যে নিজেকে পবিত্র করে। আল্লাহ তিনটি কণ্ঠকে বিশেষভাবে পছন্দ করেন—প্রভাতে মোরগের ডাক, কুরআন তিলাওয়াতকারীর কণ্ঠ এবং শেষরাতে নির্জনে কান্নাভেজা দোয়াকারীর সুর।
শবে বরাত আমাদের সেই শেষরাতের ইবাদতের সুযোগ এনে দেয়। হাদিসে বর্ণিত—এই রাতে আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের ডাক দেন: “কেউ ক্ষমা চাইছ কি? আমি ক্ষমা করব। কেউ সাহায্য চাইছ কি? আমি সাহায্য করব।” এমন মহামূল্যবান রাত আমাদের আত্মশুদ্ধির ডাক দেয়।
দুঃখজনকভাবে, শবে বরাতকে ঘিরে সমাজে অতিরিক্ত খানাপিনা, আতশবাজি ও কুসংস্কারের চর্চা দেখা যায়। এতে ইবাদতের পরিবেশ নষ্ট হয়। ভারী খাবারে যেমন ইবাদতে অলসতা আসে, তেমনি অযথা আয়োজনেও মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে যায়। এ রাতে প্রকৃত কল্যাণ হলো—গরিব-দুঃখীর মাঝে দান-সদকা করা এবং নিজেকে আল্লাহর নৈকট্যে সোপর্দ করা।
আসুন, আমরা শাবান ও শবে বরাতকে ধর্মীয় গাম্ভীর্য ও সংযমের সঙ্গে পালন করি। আবেগ বা কুসংস্কারে নয়, কুরআন-সুন্নাহর আলোকে ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করি। তাহলেই ইনশাআল্লাহ ইহকাল ও পরকালে প্রকৃত সৌভাগ্য লাভ করা সম্ভব হবে।
















