সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অর্ধ শাবানের রজনী:আমাদের করণীয়

বিল্লাল হোসেন
  • Update Time : ০৫:১৩:৪১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • / ১৫৯ Time View

পবিত্র লাইলাতুল বারাআত আমাদের সামনে উপস্থিত। অনেক দেশে এ রাতটি শবেবরাত নামেও পরিচিত। ‘শব’ শব্দটি ফারসি, যার অর্থ রাত; আর ‘বরাআত’ আরবি শব্দ, যার অর্থ মুক্তি, সৌভাগ্য, ক্ষমা ও বণ্টন। হাদিস ও দ্বীনি গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হয়েছে—এই রাতে আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের জন্য পরবর্তী বছরের রিজিক, হায়াত ও তাকদিরের নানা বিষয় নির্ধারণ করেন। তাই এ রাতের ফজিলত অপরিসীম।

হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে এসেছে—এক রাতে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে তাঁর শয্যায় না পেয়ে খুঁজতে থাকেন এবং দেখতে পান তিনি সিজদারত। পরে নবীজি (সা.) বলেন, “আজ হলো শাবান মাসের মধ্যরাত—লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান।” অর্থাৎ শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত ১৫ তারিখের রাতই হলো লাইলাতুল বারাআত। এ রাতকে ক্ষমা ও মাগফিরাতের রাত বলা হয়েছে। তবে হাদিসে সতর্ক করা হয়েছে—কিছু শ্রেণির মানুষ এই রাতেও ক্ষমা থেকে বঞ্চিত থাকে; যেমন নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি, মদ্যপায়ী, ব্যভিচারে লিপ্ত, পিতা-মাতার অবাধ্য, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী, হিংসা ও বিদ্বেষ পোষণকারী এবং দীর্ঘদিন কথা বন্ধ রাখা ব্যক্তি।

রাসুলুল্লাহ (সা.) শুধু এই রাত নয়, পুরো শাবান মাসকেই বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পালন করতেন। তিনি এ মাসে বেশি বেশি নফল রোজা রাখতেন, জিকির-আজকার ও নফল ইবাদতে মনোনিবেশ করতেন। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান—এই মাসে বান্দাদের আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়, আর তিনি চান তাঁর আমল রোজাদার অবস্থায় পেশ হোক। শাবানের রোজাকে তিনি রমজানের ফরজ সিয়ামের প্রস্তুতি হিসেবেও উল্লেখ করেছেন।

রোজা মানুষের সার্বক্ষণিক মন ও আচরণকে আল্লাহমুখী করে। সাহরি থেকে ইফতার পর্যন্ত একজন রোজাদার আল্লাহর স্মরণে থাকে। তাই শাবান মাস ও বিশেষ করে শবে বরাতে আমাদের উচিত কিয়ামুল লাইল, নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, দরুদ ও তাসবিহে সময় দেওয়া। কুরআনে নির্দেশ এসেছে—“ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করো।” কিন্তু আজ ইবাদতের আকার আছে, আত্মা নেই—এটাই আমাদের ব্যর্থতার মূল কারণ।

আল্লাহ তায়ালা কুরআনে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—“তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।” তবে হাদিসে এসেছে—হারাম উপার্জন ও হারাম ভোগে লিপ্ত থেকে করা দোয়া কবুল হয় না। সফলতা তারই, যে নিজেকে পবিত্র করে। আল্লাহ তিনটি কণ্ঠকে বিশেষভাবে পছন্দ করেন—প্রভাতে মোরগের ডাক, কুরআন তিলাওয়াতকারীর কণ্ঠ এবং শেষরাতে নির্জনে কান্নাভেজা দোয়াকারীর সুর।

শবে বরাত আমাদের সেই শেষরাতের ইবাদতের সুযোগ এনে দেয়। হাদিসে বর্ণিত—এই রাতে আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের ডাক দেন: “কেউ ক্ষমা চাইছ কি? আমি ক্ষমা করব। কেউ সাহায্য চাইছ কি? আমি সাহায্য করব।” এমন মহামূল্যবান রাত আমাদের আত্মশুদ্ধির ডাক দেয়।

দুঃখজনকভাবে, শবে বরাতকে ঘিরে সমাজে অতিরিক্ত খানাপিনা, আতশবাজি ও কুসংস্কারের চর্চা দেখা যায়। এতে ইবাদতের পরিবেশ নষ্ট হয়। ভারী খাবারে যেমন ইবাদতে অলসতা আসে, তেমনি অযথা আয়োজনেও মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে যায়। এ রাতে প্রকৃত কল্যাণ হলো—গরিব-দুঃখীর মাঝে দান-সদকা করা এবং নিজেকে আল্লাহর নৈকট্যে সোপর্দ করা।

আসুন, আমরা শাবান ও শবে বরাতকে ধর্মীয় গাম্ভীর্য ও সংযমের সঙ্গে পালন করি। আবেগ বা কুসংস্কারে নয়, কুরআন-সুন্নাহর আলোকে ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করি। তাহলেই ইনশাআল্লাহ ইহকাল ও পরকালে প্রকৃত সৌভাগ্য লাভ করা সম্ভব হবে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

বিল্লাল হোসেন

বিল্লাল হোসেন, একজন প্রজ্ঞাবান পেশাজীবী, যিনি গণিতের ওপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ, ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ হিসেবে একটি সমৃদ্ধ ও বহুমুখী ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন। তার আর্থিক খাতে যাত্রা তাকে নেতৃত্বের ভূমিকায় নিয়ে গেছে, বিশেষ করে সৌদি আরবের আল-রাজি ব্যাংকিং Inc. এবং ব্যাংক-আল-বিলাদে বিদেশী সম্পর্ক ও করেসপন্ডেন্ট মেইন্টেনেন্স অফিসার হিসেবে। প্রথাগত অর্থনীতির গণ্ডির বাইরে, বিল্লাল একজন প্রখ্যাত লেখক ও বিশ্লেষক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালে মননশীল কলাম ও গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করে। তার দক্ষতা বিস্তৃত বিষয় জুড়ে রয়েছে, যেমন অর্থনীতির জটিলতা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, প্রবাসী শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্ট, রেমিটেন্স, রিজার্ভ এবং অন্যান্য সম্পর্কিত দিক। বিল্লাল তার লেখায় একটি অনন্য বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসেন, যা ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে অর্জিত বাস্তব জ্ঞানকে একত্রিত করে একাডেমিক কঠোরতার সাথে। তার প্রবন্ধগুলো শুধুমাত্র জটিল বিষয়গুলির উপর গভীর বোঝাপড়ার প্রতিফলন নয়, বরং পাঠকদের জন্য জ্ঞানপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা তত্ত্ব ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। বিল্লাল হোসেনের অবদান তার প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করে যে, তিনি আমাদের আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বের জটিলতাগুলি উন্মোচন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের একটি বিস্তৃত এবং আরও সূক্ষ্ম বোঝাপড়ার দিকে মূল্যবান অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।

অর্ধ শাবানের রজনী:আমাদের করণীয়

Update Time : ০৫:১৩:৪১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

পবিত্র লাইলাতুল বারাআত আমাদের সামনে উপস্থিত। অনেক দেশে এ রাতটি শবেবরাত নামেও পরিচিত। ‘শব’ শব্দটি ফারসি, যার অর্থ রাত; আর ‘বরাআত’ আরবি শব্দ, যার অর্থ মুক্তি, সৌভাগ্য, ক্ষমা ও বণ্টন। হাদিস ও দ্বীনি গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হয়েছে—এই রাতে আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের জন্য পরবর্তী বছরের রিজিক, হায়াত ও তাকদিরের নানা বিষয় নির্ধারণ করেন। তাই এ রাতের ফজিলত অপরিসীম।

হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে এসেছে—এক রাতে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে তাঁর শয্যায় না পেয়ে খুঁজতে থাকেন এবং দেখতে পান তিনি সিজদারত। পরে নবীজি (সা.) বলেন, “আজ হলো শাবান মাসের মধ্যরাত—লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান।” অর্থাৎ শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত ১৫ তারিখের রাতই হলো লাইলাতুল বারাআত। এ রাতকে ক্ষমা ও মাগফিরাতের রাত বলা হয়েছে। তবে হাদিসে সতর্ক করা হয়েছে—কিছু শ্রেণির মানুষ এই রাতেও ক্ষমা থেকে বঞ্চিত থাকে; যেমন নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি, মদ্যপায়ী, ব্যভিচারে লিপ্ত, পিতা-মাতার অবাধ্য, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী, হিংসা ও বিদ্বেষ পোষণকারী এবং দীর্ঘদিন কথা বন্ধ রাখা ব্যক্তি।

রাসুলুল্লাহ (সা.) শুধু এই রাত নয়, পুরো শাবান মাসকেই বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পালন করতেন। তিনি এ মাসে বেশি বেশি নফল রোজা রাখতেন, জিকির-আজকার ও নফল ইবাদতে মনোনিবেশ করতেন। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান—এই মাসে বান্দাদের আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়, আর তিনি চান তাঁর আমল রোজাদার অবস্থায় পেশ হোক। শাবানের রোজাকে তিনি রমজানের ফরজ সিয়ামের প্রস্তুতি হিসেবেও উল্লেখ করেছেন।

রোজা মানুষের সার্বক্ষণিক মন ও আচরণকে আল্লাহমুখী করে। সাহরি থেকে ইফতার পর্যন্ত একজন রোজাদার আল্লাহর স্মরণে থাকে। তাই শাবান মাস ও বিশেষ করে শবে বরাতে আমাদের উচিত কিয়ামুল লাইল, নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, দরুদ ও তাসবিহে সময় দেওয়া। কুরআনে নির্দেশ এসেছে—“ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করো।” কিন্তু আজ ইবাদতের আকার আছে, আত্মা নেই—এটাই আমাদের ব্যর্থতার মূল কারণ।

আল্লাহ তায়ালা কুরআনে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—“তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।” তবে হাদিসে এসেছে—হারাম উপার্জন ও হারাম ভোগে লিপ্ত থেকে করা দোয়া কবুল হয় না। সফলতা তারই, যে নিজেকে পবিত্র করে। আল্লাহ তিনটি কণ্ঠকে বিশেষভাবে পছন্দ করেন—প্রভাতে মোরগের ডাক, কুরআন তিলাওয়াতকারীর কণ্ঠ এবং শেষরাতে নির্জনে কান্নাভেজা দোয়াকারীর সুর।

শবে বরাত আমাদের সেই শেষরাতের ইবাদতের সুযোগ এনে দেয়। হাদিসে বর্ণিত—এই রাতে আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের ডাক দেন: “কেউ ক্ষমা চাইছ কি? আমি ক্ষমা করব। কেউ সাহায্য চাইছ কি? আমি সাহায্য করব।” এমন মহামূল্যবান রাত আমাদের আত্মশুদ্ধির ডাক দেয়।

দুঃখজনকভাবে, শবে বরাতকে ঘিরে সমাজে অতিরিক্ত খানাপিনা, আতশবাজি ও কুসংস্কারের চর্চা দেখা যায়। এতে ইবাদতের পরিবেশ নষ্ট হয়। ভারী খাবারে যেমন ইবাদতে অলসতা আসে, তেমনি অযথা আয়োজনেও মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে যায়। এ রাতে প্রকৃত কল্যাণ হলো—গরিব-দুঃখীর মাঝে দান-সদকা করা এবং নিজেকে আল্লাহর নৈকট্যে সোপর্দ করা।

আসুন, আমরা শাবান ও শবে বরাতকে ধর্মীয় গাম্ভীর্য ও সংযমের সঙ্গে পালন করি। আবেগ বা কুসংস্কারে নয়, কুরআন-সুন্নাহর আলোকে ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করি। তাহলেই ইনশাআল্লাহ ইহকাল ও পরকালে প্রকৃত সৌভাগ্য লাভ করা সম্ভব হবে।